
ঢাকার ভবিষ্যৎ নিয়ে যখনই আলোচনা হয়, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশাল সব অবকাঠামো প্রকল্প—মেট্রোরেল, ফ্লাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে এগুলোকে তুলে ধরা হয়, আর নাগরিকদের সামনে একটি আধুনিক নগরীর স্বপ্ন দেখানো হয়। কিন্তু এই চমকপ্রদ প্রকল্পগুলোর আড়ালে চাপা পড়ে গেছে এক গুরুত্বপূর্ণ সত্য—ঢাকার প্রকৃত শক্তি হয়তো আকাশে নয়, মাটির নিচে লুকিয়ে আছে। সেই শক্তি হলো এই শহরের হারিয়ে যাওয়া জলপথ।
রমজানের এক সকালে হাতিরঝিলের রামপুরা প্রান্তে দাঁড়িয়ে সেই সত্যটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি ছোট ওয়াটার ট্যাক্সি ঘাটে অপেক্ষা করছে, যাত্রীদের ভিড় ধীরে ধীরে সেটিতে উঠছে। অফিসগামী মানুষ, হাতে ব্যাগ, চোখে তাড়াহুড়া—সব মিলিয়ে পরিচিত শহুরে দৃশ্য। ইঞ্জিন চালু হতেই নৌকাটি ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। চারপাশের যানজটের শব্দ মিলিয়ে গিয়ে শোনা যায় শুধু পানির ওপর ভেসে চলার শব্দ। হালকা বাতাস গায়ে লাগে, যদিও পানির গন্ধে কিছুটা অস্বস্তি থাকে। কিন্তু তারপরও যাত্রাটি অদ্ভুতভাবে স্বস্তিদায়ক।
মাত্র পাঁচ মিনিটেই পৌঁছে যাওয়া যায় গুলশান পুলিশ প্লাজায়। পুরো যাওয়া-আসার পথ ধরলে সময় লাগে প্রায় ১৫ মিনিট। একই দূরত্ব যদি সড়কপথে পাড়ি দিতে হয়, তাহলে অভিজ্ঞতাটা একেবারেই ভিন্ন। বাসে উঠতে হয় ঠাসাঠাসি ভিড়ের মধ্যে, কন্ডাক্টরের চিৎকার, চারপাশে হর্নের শব্দ, ধীরে ধীরে এগোনো, হঠাৎ থেমে যাওয়া—সব মিলিয়ে এক ধরনের মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তি তৈরি হয়। এই একই পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে কমপক্ষে আধাঘণ্টা, তাও যদি ভাগ্য ভালো থাকে।
এই দুই অভিজ্ঞতার মধ্যে পার্থক্য শুধু সময়ের নয়; এটি একটি শহরের হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনার গল্প। যে ঢাকা একসময় নদী ও খালনির্ভর একটি শহর ছিল, সেই শহর আজ কংক্রিটের নিচে তার নিজস্ব পরিচয় হারিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিত অব্যবস্থাপনা, লোভ এবং দুর্নীতির ফল।
শহর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব মনে করেন, ঢাকার জলপথ ধ্বংস হওয়া ছিল একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। ১৯৯৬ সালে ধানমন্ডি লেক পুনরুদ্ধারের একটি পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে একটি প্রাকৃতিক খাল পুনরুদ্ধারের প্রস্তাব ছিল। কিন্তু সেই জায়গায় তৈরি করা হয় একটি শপিং সেন্টার। এরপর ধীরে ধীরে আরও অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়, যা সেই জলপথকে সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করে। ফলে একসময় যে খালটি শহরের জলপ্রবাহের অংশ ছিল, তা স্থায়ীভাবে হারিয়ে যায়।
এই ধরনের সিদ্ধান্ত শুধু একটি খাল ধ্বংস করেনি, বরং পুরো জলপ্রবাহ ব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়েছে। একটি খাল যদি নদীর সঙ্গে সংযুক্ত না থাকে, তাহলে সেটি ধীরে ধীরে স্থির পানিতে পরিণত হয়। সেখানে জমতে থাকে বর্জ্য, তৈরি হয় দূষণ, এবং একসময় তা শহরের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
পান্থপথের নিচে লুকিয়ে থাকা বেগুনবাড়ী খালের গল্প এই বাস্তবতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। একসময় এটি ছিল একটি সক্রিয় খাল, কিন্তু ১৯৮০-এর দশকে সেটির ওপর বসানো হয় কংক্রিটের বক্স কালভার্ট। তার ওপর তৈরি করা হয় সড়ক। প্রথমদিকে এটি উন্নয়নের একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হলেও, পরে প্রমাণিত হয়েছে যে এই ধরনের কাঠামো প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের জন্য সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত।
বক্স কালভার্টের ভেতরে জমে থাকে ময়লা, পলি এবং বর্জ্য। পানি স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হতে পারে না। বর্ষার সময় পানি জমে গিয়ে তৈরি করে জলাবদ্ধতা। ২০২১ সালে একটি কাঠামো থেকেই ৭৪ টন বর্জ্য অপসারণ করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে হাতিরঝিল ও পান্থপথ এলাকা থেকে প্রায় দুই লাখ টন কাদা ও বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান শুধু দূষণের মাত্রা নয়, বরং পরিকল্পনার ব্যর্থতাও তুলে ধরে।
ঢাকায় একসময় অসংখ্য খাল ছিল, যা শহরের চারপাশের নদীগুলোর সঙ্গে যুক্ত ছিল। এই নেটওয়ার্ক শুধু পানি নিষ্কাশনের জন্য নয়, বরং পরিবহন ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব খাল ভরাট করা হয়েছে, দখল হয়েছে, অথবা কংক্রিটের নিচে চাপা পড়েছে।
বর্তমানে শহরের যানজট ও জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানে বড় বড় প্রকল্প নেওয়া হলেও, এই মৌলিক সমস্যাগুলোর দিকে তেমন নজর দেওয়া হয়নি। ২০১৬ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সিদ্ধান্ত নেয় যে বক্স কালভার্ট সরিয়ে খালগুলো পুনরুদ্ধার করা হবে। কিন্তু এক দশক পেরিয়ে গেলেও এই প্রকল্প বাস্তবায়নে তেমন অগ্রগতি হয়নি। বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, প্রশাসনিক জটিলতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি এই উদ্যোগকে থামিয়ে রেখেছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের একজন প্রকল্প পরিচালক স্বীকার করেছেন যে এই কাজ করতে হলে বিদ্যমান অবকাঠামো ভেঙে নতুনভাবে পরিকল্পনা করতে হবে, যা সহজ নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই কঠিন কাজটি এড়িয়ে গিয়ে কি সমস্যার সমাধান সম্ভব?
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার চারপাশে প্রায় ১১০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের একটি নদীবেষ্টিত অঞ্চল রয়েছে। যদি এই অঞ্চলের সব খালকে পুনরায় সংযুক্ত করা যায়, তাহলে প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি জলপথ নেটওয়ার্ক তৈরি করা সম্ভব। এটি শুধু একটি পরিবহন ব্যবস্থা নয়, বরং একটি বিকল্প নগর জীবনধারা তৈরি করতে পারে।
এই নেটওয়ার্ক চালু হলে সড়কের ওপর চাপ প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। অর্থাৎ, প্রতিদিনের যানজট, সময় অপচয় এবং মানসিক চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে। একই সঙ্গে শহরের জলাবদ্ধতা সমস্যারও সমাধান হতে পারে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার ১৪টি প্রধান খাল পুনরুদ্ধার করা গেলে শহরের ৮০ শতাংশ জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই সম্ভাবনা এখনো কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। শহরের মানুষ প্রতিদিন যানজটে আটকে থাকে, বর্ষায় পানিতে ডুবে যায়, অথচ তাদের পায়ের নিচেই লুকিয়ে আছে একটি সম্ভাব্য সমাধান।
ইকবাল হাবিব একটি বিকল্প পরিকল্পনার কথা বলেন—যেখানে খাল পুনরুদ্ধার করা হবে, তার দুই পাশে সরু রাস্তা রাখা হবে এবং মাঝখানে খালের ওপর দিয়ে উঁচু সড়ক তৈরি করা হবে। এতে করে পানি তার স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে পারবে, আবার যানবাহনও চলাচল করতে পারবে। এটি একটি সমন্বিত পরিকল্পনার উদাহরণ, যেখানে প্রকৃতি ও উন্নয়ন একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
ঢাকার বর্তমান অবস্থা একটি সতর্কবার্তা। শুধু কংক্রিটের ওপর নির্ভর করে একটি শহর টেকসই হতে পারে না। প্রকৃতির সঙ্গে সমন্বয় না করলে উন্নয়ন একসময় নিজেই সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আজকের ঢাকা একদিকে আধুনিকতার প্রতীক, অন্যদিকে একটি হারানো পরিচয়ের শহর। এই শহর একসময় পানির ওপর ভাসত, আর এখন সেই পানি থেকেই পালানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু হয়তো সময় এসেছে আবার সেই পানির দিকেই ফিরে তাকানোর।
কারণ সমাধান সবসময় নতুন কিছু তৈরি করার মধ্যে নয়; অনেক সময় তা লুকিয়ে থাকে পুরনো, ভুলে যাওয়া কাঠামোর মধ্যে। ঢাকার ক্ষেত্রেও সেটিই সত্য। এই শহরের ভবিষ্যৎ হয়তো আরও ফ্লাইওভার বা এক্সপ্রেসওয়ে নয়, বরং তার হারিয়ে যাওয়া জলপথ পুনরুদ্ধারের মধ্যেই নিহিত।
এখন প্রশ্ন একটাই—এই সত্যকে আমরা কত দ্রুত উপলব্ধি করতে পারি, এবং সেই অনুযায়ী কাজ করতে পারি। কারণ প্রতিদিন যে সময় আমরা যানজটে হারাচ্ছি, তা শুধু সময়ের অপচয় নয়; এটি একটি শহরের সম্ভাবনার অপচয়ও বটে।
আপনার মতামত জানানঃ