মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ধোঁয়া যখন আকাশ ঢেকে দেয়, তখন শুধু বোমা আর রাজনীতির শব্দই শোনা যায় না, বরং নীরবে বদলে যেতে থাকে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য। এই পরিবর্তনের মাঝেই একটি প্রশ্ন ধীরে ধীরে সামনে আসে—চীন কি এই সংকটের জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল? নাকি এটি কেবল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার এক নিখুঁত উদাহরণ? বাস্তবতা বলছে, বিষয়টি হঠাৎ করে ঘটেনি। বরং কয়েক বছর ধরে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা একটি কৌশলের ফল আজ দৃশ্যমান।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে চীনের জন্য জ্বালানি সবসময়ই একটি সংবেদনশীল বিষয়। মধ্যপ্রাচ্যের উপর নির্ভরশীলতা তাদের অর্থনীতিকে দীর্ঘদিন ধরে একটি ঝুঁকির মধ্যে রেখেছিল। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো সংকীর্ণ জলপথ, যেখান দিয়ে এশিয়ার বেশিরভাগ তেল পরিবাহিত হয়, সেটি যদি কোনো কারণে অচল হয়ে যায়, তাহলে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারে। এই বাস্তবতা চীনের নীতিনির্ধারকদের বহু আগেই ভাবতে বাধ্য করেছিল। তারা বুঝেছিল, কেবল আমদানি নির্ভরতা দিয়ে একটি সুপারপাওয়ার হওয়া সম্ভব নয়।
এই উপলব্ধি থেকেই শুরু হয় দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি। চীন বিপুল পরিমাণ তেল মজুত করতে শুরু করে, যা জরুরি সময়ে ব্যবহার করা যাবে। কিন্তু তারা শুধু মজুত করেই থেমে থাকেনি। তারা ধীরে ধীরে তাদের জ্বালানি কাঠামো পরিবর্তন করতে শুরু করে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকতে থাকে দেশটি। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং জলবিদ্যুৎ—এই তিনটি খাতে তারা বিপুল বিনিয়োগ করে। এর ফলে তাদের জ্বালানি ব্যবহারের ধরণ বদলাতে শুরু করে। তেলের উপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে।
একই সময়ে তারা পরিবহন খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। একসময় যেখানে চীন ছিল জ্বালানিচালিত গাড়ির সবচেয়ে বড় বাজার, সেখানে এখন বৈদ্যুতিক গাড়ির বিস্ফোরণ ঘটেছে। এই পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত কারণে নয়, বরং কৌশলগত কারণেও গুরুত্বপূর্ণ। বৈদ্যুতিক যানবাহন ব্যবহারের মাধ্যমে তারা তেলের চাহিদা কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। ফলে বৈশ্বিক তেলবাজারে অস্থিরতা তাদের উপর তুলনামূলক কম প্রভাব ফেলছে।
শুধু জ্বালানি খাতেই নয়, শিল্প খাতেও চীন নিজেদের নতুনভাবে গড়ে তুলেছে। তারা বুঝেছিল, কাঁচামালের জন্য বিদেশের উপর নির্ভরশীলতা একটি বড় দুর্বলতা। তাই তারা নিজস্ব প্রযুক্তি উন্নয়নে জোর দেয়। পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পে তারা এমন একটি পথ বেছে নেয়, যেখানে তেলের পরিবর্তে কয়লা ব্যবহার করে রাসায়নিক উৎপাদন করা যায়। এই প্রযুক্তি নতুন নয়, তবে চীন এটিকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। এর ফলে তারা তেলের বিকল্প একটি শক্তিশালী উৎস তৈরি করতে পেরেছে।
এই সবকিছুর পেছনে ছিল সরকারের সুস্পষ্ট নীতি এবং পরিকল্পনা। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি শিল্প খাতকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে তারা শুধু অর্থনৈতিক লাভের কথা ভাবেনি, বরং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার কথা মাথায় রেখে বিনিয়োগ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহজ ঋণ দেওয়া হয়েছে। এই সমন্বিত প্রচেষ্টা চীনকে এমন একটি অবস্থানে নিয়ে গেছে, যেখানে তারা বৈশ্বিক সরবরাহশৃঙ্খলের উপর বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে।
চীনের এই প্রস্তুতির পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতি। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যযুদ্ধ এবং প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা তাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। তারা বুঝতে পারে, যে কোনো সময় বৈশ্বিক পরিস্থিতি তাদের বিরুদ্ধে যেতে পারে। তাই আত্মনির্ভরশীল হওয়া ছাড়া তাদের সামনে অন্য কোনো পথ নেই। এই চিন্তা থেকেই তারা একটি দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ তৈরি করে, যেখানে লক্ষ্য ছিল নিজেদের শিল্প এবং জ্বালানি খাতকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে বাইরের চাপেও তা স্থিতিশীল থাকে।
করোনা মহামারি এই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করে। বিশ্বব্যাপী সরবরাহশৃঙ্খল ভেঙে পড়ার সময় চীন দেখেছে, কীভাবে আন্তর্জাতিক নির্ভরতা একটি দেশের অর্থনীতিকে বিপদে ফেলতে পারে। সেই অভিজ্ঞতা তাদের কৌশলকে আরও দৃঢ় করে। তারা দ্রুত নিজেদের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ায় এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে থাকে।
আজ যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানিসংকট তৈরি হয়েছে, তখন চীন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে। অন্যান্য অনেক দেশ যেখানে তেলের অভাবে বিপাকে পড়েছে, সেখানে চীন তাদের মজুত এবং বিকল্প ব্যবস্থার কারণে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে। এমনকি কিছু দেশ তাদের কাছে সাহায্যও চেয়েছে। এটি শুধু একটি অর্থনৈতিক সাফল্য নয়, বরং একটি কৌশলগত জয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে চীন সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত। তারা এখনও বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক দেশ এবং তাদের ব্যবহৃত তেলের বড় একটি অংশ বিদেশ থেকে আসে। কিন্তু পার্থক্যটি হলো, তারা এখন সেই নির্ভরতা কমানোর পথে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। তারা জানে, ভবিষ্যতের বিশ্বে জ্বালানি এবং প্রযুক্তি—এই দুই ক্ষেত্রেই নেতৃত্ব ধরে রাখতে পারলে তবেই তারা প্রকৃত অর্থে একটি বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকতে পারবে।
চীনের এই যাত্রা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। একটি দেশ যদি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যায়, তাহলে সে শুধু বর্তমান সংকট মোকাবিলা করতে পারে না, বরং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জের জন্যও নিজেকে প্রস্তুত করতে পারে। চীন ঠিক সেটাই করেছে। তারা সংকট আসার অপেক্ষা করেনি। বরং সংকটের আগেই নিজেদের প্রস্তুত করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ হয়তো একদিন শেষ হবে, তেলের বাজার আবার স্বাভাবিক হবে, কিন্তু এই সময়ে যে পরিবর্তনগুলো ঘটছে, সেগুলো দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে। চীন ইতিমধ্যেই সেই পরিবর্তনের সাথে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, অন্য দেশগুলো কি এই অভিজ্ঞতা থেকে কিছু শিখবে, নাকি তারা পরবর্তী সংকটের জন্য আবারও অপ্রস্তুত থাকবে।
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—বিশ্ব রাজনীতি শুধু তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে না, বরং দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতির উপর দাঁড়িয়ে থাকে। চীন সেই পরিকল্পনার একটি শক্তিশালী উদাহরণ তৈরি করেছে। তাদের এই পথচলা হয়তো অনেক বিতর্কের জন্ম দেবে, কিন্তু এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক আগেই ভাবতে শুরু করেছিল এবং সেই ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পেরেছে।
আপনার মতামত জানানঃ