
বাংলাদেশে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার অল্প সময়ের মধ্যেই বৈশ্বিক পরিস্থিতি অস্থির হয়ে ওঠে, বিশেষ করে ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে। এই পরিস্থিতির প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে—বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে। এর মধ্যেই সরকার কূটনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা, প্রবাসী শ্রমিকদের খোঁজ নেওয়া, এবং একই সঙ্গে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা—সব মিলিয়ে এক ধরনের ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘদিন একটি নির্দিষ্ট দেশের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত থাকার পর এখন নতুন সরকার ঘোষণা দিচ্ছে যে তারা কোনো এক দেশের দিকে ঝুঁকতে চায় না। বরং তাদের লক্ষ্য হচ্ছে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে সবার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা। অর্থাৎ, “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়”—এই নীতির বাস্তব প্রয়োগই এখন পরীক্ষা দিচ্ছে।
তবে বাস্তব পরিস্থিতি এত সহজ নয়। ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের প্রথম প্রতিক্রিয়া কিছুটা বিতর্ক তৈরি করে। একদিকে ইরানের হামলার সমালোচনা করা হলেও, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। পরে সরকার নতুন বিবৃতি দিয়ে কিছুটা ভারসাম্য আনার চেষ্টা করে। তবুও সমালোচনা থামেনি, বিশেষ করে ইরানের পক্ষ থেকে আরও স্পষ্ট অবস্থানের প্রত্যাশা ছিল।
এই ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন উঠেছে—বাংলাদেশ কি যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকছে? সরকার অবশ্য তা অস্বীকার করে বলছে, তাদের নীতি একমাত্র জাতীয় স্বার্থকে ঘিরে। বিশ্লেষকরাও মনে করছেন, এত দ্রুত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়, কারণ নতুন সরকার এখনও নিজেদের অবস্থান সুসংহত করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি সবসময়ই একটি জটিল সমীকরণ। কারণ দেশটি একই সঙ্গে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র—এই তিন শক্তিধর দেশের স্বার্থের মধ্যে অবস্থান করছে। একদিকে ভারতের সঙ্গে ভৌগোলিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক, অন্যদিকে চীনের বিনিয়োগ ও অবকাঠামো সহযোগিতা, এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও কৌশলগত সম্পর্ক—সবকিছু মিলিয়ে একটি ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
তিস্তা প্রকল্পের মতো ইস্যু এই জটিলতাকে আরও স্পষ্ট করে। এখানে ভারত ও চীনের স্বার্থ একে অপরের বিপরীতে অবস্থান করছে, ফলে বাংলাদেশ সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় ঐকমত্য তৈরি করা জরুরি, যাতে কোনো সিদ্ধান্তকে পক্ষপাতদুষ্ট মনে না হয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কূটনীতি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। দেশের রপ্তানি প্রধানত ইউরোপ ও আমেরিকায় হলেও, সেই পণ্যের কাঁচামাল আসে চীন ও ভারত থেকে। তাই কোনো একটি দেশকে বাদ দিয়ে অন্যটির দিকে ঝুঁকে পড়া বাস্তবসম্মত নয়। বরং সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখাই এখানে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কোন দেশ খুশি বা অসন্তুষ্ট হলো সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়; গুরুত্বপূর্ণ হলো বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষা করা। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থই হবে মূল ভিত্তি।
তবে বাস্তব চ্যালেঞ্জ এখানেই। কারণ শক্তিধর দেশগুলো নিজেদের স্বার্থে বিভিন্ন ধরনের চাপ সৃষ্টি করে, যা ছোট ও উন্নয়নশীল দেশের জন্য সামলানো কঠিন। ফলে বাংলাদেশকে খুব সতর্কভাবে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশ এখন এমন এক পররাষ্ট্রনীতির পথে হাঁটছে যেখানে নির্দিষ্ট কোনো শক্তির ওপর নির্ভর না করে, বরং সবার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। কিন্তু এই পথ সহজ নয়—কারণ বৈশ্বিক রাজনীতির টানাপোড়েনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আপনার মতামত জানানঃ