
ঈদ—বাংলাদেশের মানুষের জীবনে সবচেয়ে আনন্দের, সবচেয়ে আবেগের একটি সময়। এই সময়টায় শহর ছেড়ে গ্রামে ফেরা, পরিবারের সঙ্গে মিলিত হওয়া, প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদের নামাজ, সেমাই-পোলাও, হাসি আর ভালোবাসায় ভরে ওঠে চারপাশ। কিন্তু সেই আনন্দমুখর যাত্রাপথই যখন মৃত্যুর মিছিলে পরিণত হয়, তখন ঈদের সুখ মুহূর্তেই বদলে যায় শোকের ভারে। এবারের ঈদযাত্রা যেন সেই নির্মম বাস্তবতারই এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিসংখ্যানই বলে দেয় পরিস্থিতির ভয়াবহতা কতটা গভীর। ঈদের আগে ও পরে সড়ক, রেল ও নৌপথ মিলিয়ে শত শত দুর্ঘটনা ঘটেছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ৩৪২টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৭৪ জন। আহত হয়েছেন হাজারের বেশি মানুষ। এই সংখ্যাগুলো কেবল সংখ্যা নয়—প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি ভবিষ্যৎ। কেউ হয়তো নতুন জামা নিয়ে বাড়ি ফিরছিল, কেউ হয়তো সন্তানদের জন্য ঈদের উপহার নিয়ে রওনা হয়েছিল, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।
গত কয়েক বছরের তথ্য দেখলেও বোঝা যায়, এই সমস্যা নতুন নয়, বরং প্রতি বছরই পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। ২০২২ সালে ৪৪৩ জন, ২০২৩ সালে ৩২৮ জন, ২০২৪ সালে ৪৩৭ জন এবং ২০২৫ সালে ৩২২ জন প্রাণ হারিয়েছেন ঈদযাত্রায় বিভিন্ন দুর্ঘটনায়। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাব অনুযায়ী, গত চার বছরে আটটি ঈদে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩ হাজার ৬৭ জন এবং আহত হয়েছেন প্রায় ৭ হাজার মানুষ। এত বড় ক্ষয়ক্ষতির পরও কেন আমরা কার্যকর সমাধানে পৌঁছাতে পারছি না—এই প্রশ্নটাই এখন সবচেয়ে বড়।
এবারের ঈদযাত্রায় ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা যেন হৃদয় বিদারক চিত্র তুলে ধরে। কুমিল্লায় লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেন ও বাসের সংঘর্ষে একসঙ্গে ১২ জন মানুষের মৃত্যু—এক মুহূর্তে কতগুলো পরিবারকে নিঃস্ব করে দিয়েছে তা কল্পনা করাও কঠিন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সময়মতো গেট বন্ধ না হওয়াই ছিল এই দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। অর্থাৎ একটি ছোট অবহেলা, একটি দায়িত্বহীনতা, কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, সেটার বাস্তব উদাহরণ এটি।
বগুড়ার সান্তাহারে ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনাও কম ভয়াবহ নয়। ঈদে ঘরমুখো যাত্রীতে ভরা ট্রেন হঠাৎ করেই দুর্ঘটনার শিকার হয়, আহত হন অন্তত ৬৫ জন। রেললাইনের মেরামতের কাজ চলছিল, কিন্তু সেটি যথাযথভাবে নিরাপদ করা হয়নি—এই অভিযোগও উঠেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে, যখন যাত্রীর চাপ সর্বোচ্চ, তখনই এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করা হয়?
নৌপথেও নিরাপত্তাহীনতার চিত্র একই রকম। সদরঘাটে দুই লঞ্চের ধাক্কায় এক ব্যক্তি পিষ্ট হয়ে মারা যান এবং আরেকজন নিখোঁজ হন, যার মরদেহ পরে উদ্ধার করা হয়। একটি পরিবারের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনা শুধু একটি সংবাদ নয়, এটি একটি জীবন্ত ট্র্যাজেডি। একইভাবে দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায়, যাতে ২৬ জনের প্রাণহানি ঘটে। ভিডিওতে দেখা যায়, মুহূর্তের মধ্যে বাসটি পানিতে ডুবে যায়, আর মানুষের চিৎকার-আর্তনাদ চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। এই দৃশ্যগুলো শুধু ভয়াবহই নয়, বরং আমাদের ব্যবস্থাপনার ভয়ানক দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে আসে।
এই দুর্ঘটনাগুলোর পেছনে মূল কারণগুলো খুব একটা অজানা নয়। সড়কের অব্যবস্থাপনা, যানবাহনের ফিটনেসের অভাব, চালকদের ক্লান্তি ও অদক্ষতা, ট্রাফিক ব্যবস্থার দুর্বলতা—সবকিছু মিলিয়েই এই মৃত্যুমিছিল তৈরি হচ্ছে। অনেক চালক নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছাতে গিয়ে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালান, দীর্ঘ সময় বিশ্রাম ছাড়া ড্রাইভ করেন, যার ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। আবার অনেক গাড়ি ঠিকমতো পরীক্ষা না করেই রাস্তায় নামানো হয়, যার ফলে ব্রেক ফেল বা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে।
বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন, সমস্যার মূল জায়গাটি হচ্ছে আমাদের সামগ্রিক পরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতা। শুধু ছুটি বাড়ানো বা কিছু সাময়িক ব্যবস্থা নিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, যেখানে সড়ক নিরাপত্তা, চালকদের প্রশিক্ষণ, যানবাহনের ফিটনেস, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা—সবকিছু সমন্বিতভাবে উন্নত করা হবে। রেলের ক্ষেত্রে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, লেভেল ক্রসিংয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নৌপথে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করাও জরুরি।
সবচেয়ে বড় কথা, এই সমস্যাটিকে শুধুমাত্র একটি মৌসুমি ইস্যু হিসেবে দেখলে চলবে না। ঈদের সময় দুর্ঘটনা বেশি হয় ঠিকই, কিন্তু এর পেছনে যে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা রয়েছে, সেটিকে সমাধান করতে হবে সারা বছরের পরিকল্পনার মাধ্যমে। না হলে প্রতি বছরই আমরা একই গল্প শুনবো—ঈদ আসবে, মানুষ বাড়ি ফিরবে, আর কেউ কেউ আর কখনো ফিরতে পারবে না।
ঈদ মানে শুধু আনন্দ নয়, এটি আমাদের সামাজিক বন্ধনের প্রতীক। কিন্তু যখন সেই ঈদই মানুষের জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন আমাদের থেমে ভাবতেই হয়—আমরা কোথায় ভুল করছি? একটি নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করা কি এতটাই কঠিন? প্রতিটি মানুষের জীবনের মূল্য কি আমরা সত্যিই উপলব্ধি করতে পারছি?
আজ প্রয়োজন সচেতনতা, দায়িত্ববোধ এবং কঠোর পদক্ষেপ। সরকার, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, পরিবহন মালিক-শ্রমিক—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে যাত্রীদেরও সচেতন হতে হবে, ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন এড়িয়ে চলতে হবে, অতিরিক্ত ভিড় বা অবৈধভাবে যাতায়াত না করতে হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।
ঈদের আনন্দ যেন আর কারও জীবনে শোকের কারণ না হয়—এই প্রত্যাশাই এখন সবচেয়ে বড়। প্রতিটি যাত্রা যেন নিরাপদ হয়, প্রতিটি মানুষ যেন সুস্থভাবে নিজের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে—এই লক্ষ্য নিয়েই আমাদের এগোতে হবে। নইলে এই “মৃত্যুর মিছিল” থামবে না, বরং প্রতি বছরই নতুন করে আমাদের সামনে ফিরে আসবে, আরও ভয়াবহ রূপে।
আপনার মতামত জানানঃ