
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই “অটুট মিত্রতা” হিসেবে পরিচিত। সামরিক, কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতার ক্ষেত্রে এই দুই দেশের ঘনিষ্ঠতা প্রায় নজিরবিহীন। কিন্তু ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনা, বিশেষ করে সাম্প্রতিক গ্যাসক্ষেত্র ও জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টাপাল্টি হামলার প্রেক্ষাপটে, এই সম্পর্কের ভেতরে সূক্ষ্ম এক দূরত্ব তৈরি হয়েছে কি না—সেই প্রশ্ন এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এই প্রশ্নের উত্তর সরল নয়, বরং এটি বহুস্তরীয় রাজনৈতিক সংকেত, কৌশলগত হিসাব-নিকাশ এবং ব্যক্তিগত নেতৃত্বের ধরণ মিলিয়ে তৈরি এক জটিল বাস্তবতা।
ঘটনার সূচনা ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলের হামলা দিয়ে। এই গ্যাসক্ষেত্র শুধু ইরানের নয়, কাতারের সাথেও যৌথ মালিকানাধীন এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান কাতারের একটি জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালায়। ফলে সংঘাতটি দ্রুত আঞ্চলিক সীমা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক প্রভাব ফেলতে শুরু করে। জ্বালানির দাম বেড়ে যায়, বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, আর একই সাথে রাজনৈতিক উত্তেজনাও চরমে ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি দাবি করেন, ইসরায়েলের এই হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকে কিছুই জানত না। এই বক্তব্যই মূলত বিতর্কের জন্ম দেয়। কারণ, দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সামরিক মিত্রের এমন একটি বড় অপারেশনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র অবগত ছিল না—এটি বিশ্বাস করা অনেকের কাছেই কঠিন। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের কিছু প্রতিবেদনে আবার দাবি করা হয়েছে, এই হামলা নাকি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সমন্বয় করেই করা হয়েছিল। ফলে সত্যতা নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে, যা কূটনৈতিক সম্পর্কের ভেতরের বাস্তব চিত্রকে আরও অস্পষ্ট করে তোলে।
ট্রাম্পের বক্তব্যের ভাষা বিশ্লেষণ করলেও কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তিনি ইসরায়েলের হামলাকে “ক্রোধের বশবর্তী হয়ে” পরিচালিত বলে উল্লেখ করেছেন, যা সাধারণত প্রতিপক্ষের কর্মকাণ্ড বর্ণনার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। একজন মিত্রের পরিকল্পিত সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে এমন শব্দচয়ন অস্বাভাবিক। এর মাধ্যমে অনেকে ধারণা করছেন, ট্রাম্প হয়তো ইসরায়েলের সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট নন, কিংবা অন্তত এটিকে কৌশলগতভাবে অপ্রয়োজনীয় মনে করছেন। আবার এটি এমনও হতে পারে যে, তিনি প্রকাশ্যে দূরত্ব দেখিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ কমানোর চেষ্টা করছেন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্য একই হলেও পদ্ধতি ও অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত ইরানের সামরিক সক্ষমতা—যেমন ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও নৌবাহিনী—দুর্বল করার দিকে মনোযোগ দেয়। অন্যদিকে ইসরায়েল অনেক বেশি আগ্রাসী কৌশল গ্রহণ করে, যেখানে ইরানের নেতৃত্ব কাঠামো ধ্বংস করা বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের মতো লক্ষ্যও অন্তর্ভুক্ত থাকে। এই পার্থক্যই অনেক সময় দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত দূরত্ব তৈরি করে।
নেতানিয়াহুর বক্তব্য থেকেও এই জটিল সম্পর্কের একটি চিত্র পাওয়া যায়। তিনি একদিকে দাবি করেন যে, ইসরায়েল একাই হামলা চালিয়েছে, অন্যদিকে ট্রাম্পের সাথে তার ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের কথাও তুলে ধরেন। তিনি ট্রাম্পকে “নেতা” এবং নিজেকে “মিত্র” হিসেবে উল্লেখ করেন, যা সম্পর্কের একধরনের শ্রেণিবিন্যাস নির্দেশ করে। এতে বোঝা যায়, ইসরায়েল এখনও যুক্তরাষ্ট্রকে প্রধান শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে, কিন্তু একই সাথে নিজেদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও বজায় রাখতে চায়।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হলো—ইসরায়েল যেন গ্যাসক্ষেত্রে আর হামলা না করে। এটি একধরনের সতর্কবার্তা হিসেবেও দেখা যেতে পারে। কারণ, জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী। ট্রাম্প নিজেকে “শান্তির প্রেসিডেন্ট” হিসেবে তুলে ধরতে চান, এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ তার রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে—বিশেষ করে যখন দেশের ভেতরে এই যুদ্ধের প্রতি সমর্থন কমে আসছে।
অন্যদিকে, ট্রাম্পের হুমকিমূলক বক্তব্যও এই সমীকরণকে জটিল করে তোলে। তিনি বলেছেন, ইরান যদি আবার কাতারের স্থাপনায় হামলা চালায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সাহায্য বা সম্মতি নিয়ে কিংবা ছাড়াই ইরানের গ্যাসক্ষেত্র ধ্বংস করে দেবে। এখানে “ইসরায়েলের সম্মতি” প্রসঙ্গটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এটি যেন ইঙ্গিত দেয়, যুক্তরাষ্ট্র তার পদক্ষেপের ক্ষেত্রে ইসরায়েলের অবস্থান বিবেচনা করতে বাধ্য—যা অনেকের কাছে অস্বস্তিকর বা অপ্রত্যাশিত মনে হতে পারে।
এই পুরো পরিস্থিতিতে একটি মনস্তাত্ত্বিক দিকও রয়েছে। ট্রাম্পের রাজনৈতিক ঘাঁটি “মাগা” আন্দোলনের কিছু সমর্থক বিশ্বাস করেন, যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে নিজের স্বার্থের চেয়ে ইসরায়েলের স্বার্থে বেশি কাজ করছে। ফলে ট্রাম্পের জন্য একটি ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি—একদিকে মিত্রতা বজায় রাখা, অন্যদিকে নিজের সমর্থকদের সন্তুষ্ট রাখা। তার বক্তব্যে মাঝে মাঝে যে অসঙ্গতি বা দ্বৈততা দেখা যায়, তা এই রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলনও হতে পারে।
এছাড়া, এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবও সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলছে। জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বব্যাপী চাপ তৈরি হয়েছে, এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও এর প্রভাব পড়ছে। নির্বাচনের আগে এমন পরিস্থিতি ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে, ইসরায়েলে যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থন এখনও বেশ উচ্চ, যা নেতানিয়াহুকে আরও দৃঢ় অবস্থানে থাকতে উৎসাহিত করছে। ফলে দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতাও তাদের কৌশলগত সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে মৌলিক সম্পর্ক বা মিত্রতা এখনও অটুট রয়েছে। তারা এখনও ইরানের সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা দুর্বল করতে চায়, এবং এই লক্ষ্য অর্জনে সহযোগিতা করছে। তবে এই সহযোগিতার ভেতরে মতপার্থক্য, কৌশলগত ভিন্নতা এবং রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের কারণে কিছুটা দূরত্ব বা টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে—যা প্রকাশ্যে মাঝে মাঝে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
এই দূরত্বকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্নতা বলা যাবে না, বরং এটি একটি “ক্যালিব্রেটেড টেনশন”—যেখানে দুই দেশই নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে কিছুটা আলাদা অবস্থান নিচ্ছে, কিন্তু একই সাথে সম্পর্ক ভাঙার ঝুঁকিও নিচ্ছে না। ভবিষ্যতে এই সম্পর্ক কোন দিকে যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি, আন্তর্জাতিক চাপ এবং দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। তবে এটুকু নিশ্চিত, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতির ভারসাম্যকেও নতুনভাবে গড়ে দিচ্ছে, যেখানে মিত্রতার ভেতরেও দ্বিধা ও দ্বন্দ্বের বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
আপনার মতামত জানানঃ