ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ক বরাবরই শুধু দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগের বিষয় নয়, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের একটি জটিল প্রতিফলন। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই সম্পর্ক আবার নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, তা হলো—বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কি আবার উষ্ণতার পথে ফিরবে, নাকি পুরনো সংশয় ও দূরত্বই নতুন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়াবে?
গত দেড় বছর দুই দেশের সম্পর্ক এক ধরনের স্থবিরতার মধ্যে দিয়ে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দিল্লির অবস্থান ছিল অপেক্ষাকৃত দূরত্ব বজায় রাখার দিকে, কারণ তারা একটি নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে আগ্রহী ছিল। এই অবস্থান শুধু রাজনৈতিক ছিল না, বরং এর সঙ্গে যুক্ত ছিল কৌশলগত ও অর্থনৈতিক বিবেচনাও। ফলে উচ্চপর্যায়ের সফর বন্ধ হয়ে যায়, গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা স্থগিত থাকে এবং এমনকি বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও কিছু সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। এই প্রেক্ষাপটে নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক সরকার গঠিত হওয়া দিল্লির কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা দিয়েছে।
নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অভিনন্দন বার্তা এবং তারেক রহমানের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ এই পরিবর্তনের প্রথম ইঙ্গিত দেয়। এটি শুধু কূটনৈতিক সৌজন্য ছিল না, বরং একটি স্পষ্ট বার্তা—দিল্লি আবার ঢাকার সঙ্গে সক্রিয় সম্পর্ক চায়। তবে এই সম্পর্ক কতটা গভীর ও স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে কিছু বাস্তব পদক্ষেপের ওপর।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো ভিসা কার্যক্রম। একসময় বাংলাদেশ ছিল ভারতের সবচেয়ে বড় পর্যটক উৎস দেশ। চিকিৎসা, ব্যবসা, শিক্ষা বা কেনাকাটার জন্য বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি প্রতি বছর ভারতে যেতেন। কিন্তু ২০২৪ সালের পর ভিসা কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই প্রবাহ হঠাৎ কমে যায়। এর প্রভাব শুধু মানুষের যাতায়াতেই নয়, বরং দুই দেশের অর্থনীতিতেও পড়ে। এখন যদি ভারত ধীরে ধীরে ভিসা চালু করে এবং পর্যটন ভিসা আবার দেওয়া শুরু করে, তাহলে এটি সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার একটি শক্তিশালী সংকেত হিসেবে দেখা হবে। কারণ মানুষে মানুষে যোগাযোগই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নতুন প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এটি একটি প্রতীকী কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত। যদি তারেক রহমান তার প্রথম সফরের জন্য দিল্লিকে বেছে নেন, তাহলে তা স্পষ্টভাবে বোঝাবে যে তিনি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। অন্যদিকে, যদি তিনি অন্য কোনো দেশকে প্রাধান্য দেন, তাহলে সেটিও একটি বার্তা বহন করবে—বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন ভারসাম্য খুঁজছে। আবার এমনও হতে পারে, তিনি নিজে আগে না গিয়ে নরেন্দ্র মোদীকেই বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান, যা দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।
খেলাধুলা, বিশেষ করে ক্রিকেট, দুই দেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। অতীতে রাজনৈতিক কারণে ভারতীয় দলের বাংলাদেশ সফর বাতিল হওয়া এবং তার ফলে তৈরি হওয়া তিক্ততা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ক্রিকেট শুধু খেলা নয়, এটি দুই দেশের মানুষের আবেগের সঙ্গে জড়িত। তাই ভারত যদি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাংলাদেশ সফর পুনর্নির্ধারণ করে এবং তা বাস্তবায়ন করে, তাহলে তা শুধু ক্রীড়াক্ষেত্রেই নয়, বরং সামগ্রিক সম্পর্কের উন্নতির একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত হবে।
যোগাযোগ বা কানেক্টিভিটি প্রকল্পগুলোর বিষয়টি আরও গভীরভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। ট্রেন, বাস এবং রেল সংযোগ শুধু যাতায়াত সহজ করে না, বরং এটি অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের পথ খুলে দেয়। গত কিছু সময় ধরে এই সংযোগগুলো বন্ধ বা স্থগিত থাকার ফলে দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব বেড়েছে। আগরতলা-আখাউড়া রেল সংযোগের মতো প্রকল্পগুলো ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ সহজ করবে। বাংলাদেশও এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো, নতুন সরকার এই প্রকল্পগুলো কত দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
সবশেষে, গঙ্গা জল চুক্তির নবায়ন একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হচ্ছে। এটি শুধু একটি পানি বণ্টন চুক্তি নয়, বরং দুই দেশের মধ্যে বিশ্বাস ও সহযোগিতার প্রতীক। যদি সময়মতো এই চুক্তি নবায়ন না হয়, তাহলে তা বড় ধরনের কূটনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে। এই চুক্তি নবায়নের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং উচ্চপর্যায়ের আলোচনার প্রয়োজন, যা এখনো পুরোপুরি শুরু হয়নি। তবে যদি দ্রুত এই আলোচনা শুরু হয়, তাহলে তা সম্পর্কের উন্নতির একটি বড় ইঙ্গিত হবে।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক সবসময়ই বহুস্তরীয়। একদিকে রয়েছে অর্থনৈতিক বাস্তবতা—দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা। অন্যদিকে রয়েছে রাজনৈতিক বাস্তবতা—দেশীয় রাজনীতিতে একে অপরের প্রভাব এবং জনমতের প্রতিক্রিয়া। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার যদি বাস্তববাদী কূটনীতি অনুসরণ করে এবং ভারতের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলে, তাহলে দুই দেশের সম্পর্ক আবারও শক্তিশালী হতে পারে। তবে যদি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ বা অতীতের অবিশ্বাস সামনে চলে আসে, তাহলে সেই পথ সহজ হবে না।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ক এখন একটি নতুন মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। এটি একদিকে সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে, অন্যদিকে চ্যালেঞ্জও সামনে এনেছে। আগামী কয়েক মাসের পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে এই সম্পর্ক উষ্ণতার দিকে এগোবে, নাকি আবারও দূরত্বের পথে হাঁটবে।
আপনার মতামত জানানঃ