
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক শুল্ক চুক্তি (Agreement on Reciprocal Tariff বা ART) নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ১,৩২৭ কোটি টাকার আমদানি শুল্ক রাজস্ব হারাতে পারে। গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, চুক্তিটির আর্থিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নতুন করে পর্যালোচনা করা জরুরি।
ঢাকায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সিপিডি জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চুক্তির অধীনে বাংলাদেশকে ৬,৭০০টিরও বেশি মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক সুবিধা দিতে হবে। এর ফলে বাংলাদেশ সরকার যে পরিমাণ আমদানি শুল্ক পেত, তার একটি বড় অংশ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। গবেষণা সংস্থাটি মনে করে, আসন্ন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রণয়নের আগে এই চুক্তির সম্ভাব্য প্রভাব গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
সিপিডির মতে, এই চুক্তি শুধু রাজস্ব আয়ের ওপর প্রভাব ফেলবে না, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক নীতিমালা ও বাজেট কাঠামোর ওপরও বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে। চুক্তিতে এমন কিছু ধারা রয়েছে, যা তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বা পণ্যের উৎস নিয়ে বিধিনিষেধ আরোপের মতো বিষয়কে স্পর্শ করে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব শর্ত ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা বৈশ্বিক শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করেছে। এর ফলে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ চাইলে এখন এই চুক্তিটি পুনরায় পর্যালোচনা করতে পারে।”
পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের এই বাণিজ্য চুক্তির বিষয়টি শুরু থেকেই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছর ২ এপ্রিল একটি জাতীয় জরুরি আইন ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর পারস্পরিক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। তখন বাংলাদেশি পণ্যের ওপর প্রস্তাবিত শুল্ক হার ছিল ৩৭ শতাংশ। পরবর্তীতে আলোচনার মাধ্যমে এই হার কমিয়ে প্রথমে ৩৫ শতাংশ, তারপর ২০ শতাংশে আনা হয়। শেষ পর্যন্ত গত ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের তিন দিন আগে অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং শুল্ক হার ১৯ শতাংশে নির্ধারণ করা হয়।
এই চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই অনেক অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারক এর সমালোচনা করেন। তাদের মতে, চুক্তির অনেক ধারা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে আমদানি শুল্ক কমিয়ে দেওয়ার ফলে রাজস্ব আয়ের ওপর যে চাপ সৃষ্টি হবে, তা দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের আরোপ করা বৈশ্বিক শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করে। এর পরপরই ট্রাম্প প্রশাসন নতুন করে ১৫ শতাংশের একটি সার্বজনীন শুল্ক চালু করে। ফলে বর্তমানে বাংলাদেশের ওপর কার্যকর পারস্পরিক শুল্ক দাঁড়িয়েছে ১৫ শতাংশ। বাংলাদেশের নিজস্ব গড় শুল্ক হার প্রায় ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এই দুইটি একত্রে বিবেচনা করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিকৃত বাংলাদেশি পণ্যের ওপর মোট কার্যকর শুল্কের চাপ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ।
সিপিডির উপস্থাপিত গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে অবিলম্বে প্রায় ৪,৫০০টি মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিতে হবে। এছাড়া আরও ২,২১০টি পণ্যের ক্ষেত্রে আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে হবে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে মার্কিন পণ্যের জন্য বাংলাদেশের বাজার আরও বেশি উন্মুক্ত হয়ে যাবে।
সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে সিপিডি জানিয়েছে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক থেকে বাংলাদেশ সরকার প্রায় ১০৮ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার রাজস্ব পেয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১,৩২৭ কোটি টাকার সমান। যদি যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানির কাঠামো একই থাকে এবং শুল্ক সুবিধা পুরোপুরি কার্যকর হয়, তাহলে ভবিষ্যতে প্রতি বছর অন্তত এই পরিমাণ রাজস্ব হারানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, সরাসরি রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি এই চুক্তি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতিমালার ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি করতে পারে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশ যদি একটি দেশের জন্য বিশেষ শুল্ক সুবিধা দেয়, তাহলে সাধারণত সেটি একটি আনুষ্ঠানিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (FTA) আওতায় হতে হয়। কারণ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ‘মোস্ট ফেভার্ড নেশন’ (MFN) নীতির অধীনে সব সদস্য দেশকে সমান সুবিধা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে একতরফাভাবে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু এটি কোনো পূর্ণাঙ্গ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নয়। ফলে অন্য সদস্য দেশগুলো চাইলে এই সিদ্ধান্তকে এমএফএন নীতির পরিপন্থী বলে অভিযোগ করতে পারে এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থায় বিষয়টি উত্থাপন করতে পারে। এতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিরোধের মুখে পড়তে পারে।
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সরকারি ক্রয়নীতি বা পাবলিক প্রোকিউরমেন্টের সম্ভাব্য পরিবর্তন। ফাহমিদা খাতুন বলেন, যদি এই চুক্তির অধীনে বাংলাদেশকে নির্দিষ্ট কিছু পণ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিনতে বাধ্য করা হয়, তাহলে সরকারের ক্রয়নীতিতে পরিবর্তন আনতে হতে পারে। এতে সরকারি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, বিশেষ করে যদি যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত পণ্যের দাম অন্য দেশের তুলনায় বেশি হয়।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের বাধ্যবাধকতা দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ সরকারকে তখন বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে পণ্য কিনতে হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের ব্যয় বাড়াবে এবং বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
ড. মুস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ক্রমেই ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার একটি হাতিয়ার হয়ে উঠছে। বিভিন্ন শক্তিশালী দেশ নিজেদের রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থে বাণিজ্য নীতিকে ব্যবহার করছে। এর ফলে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মতো বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, এই চুক্তির অনেক শর্ত বাস্তবায়ন অনেকটাই বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভর করবে। কিন্তু বেসরকারি উদ্যোক্তারা সাধারণত তাদের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নেন খরচ, লাভ ও বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করে। যদি যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানি করা অন্য দেশের তুলনায় বেশি ব্যয়বহুল হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবে ব্যবসায়ীরা সেই পথে আগ্রহী হবেন না।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে তিনি বলেন, সরকার যদি বেসরকারি খাতকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করতে উৎসাহিত করতে চায়, তাহলে হয়তো বিভিন্ন ধরনের ভর্তুকি বা প্রণোদনা দিতে হতে পারে। কিন্তু এতে সরকারের ব্যয় আরও বাড়বে এবং অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য বাণিজ্য চুক্তি করার সময় অত্যন্ত সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ এসব চুক্তি শুধু আমদানি-রপ্তানির বিষয় নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িত থাকে রাজস্ব আয়, শিল্পনীতির ভবিষ্যৎ, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্বাধীনতা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার হলেও চুক্তির শর্তগুলো যদি দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই চুক্তির প্রতিটি ধারা বিশ্লেষণ করে দেখা দরকার, কোন কোন ক্ষেত্রে সংশোধন বা পুনর্বিবেচনার সুযোগ রয়েছে।
সিপিডি মনে করে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে চুক্তিটি পুনর্মূল্যায়ন করা। বিশেষ করে রাজস্ব ক্ষতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্য এবং সরকারি ব্যয়ের সম্ভাব্য বৃদ্ধি—এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ আগামী কয়েক বছরের মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) মর্যাদা থেকে উত্তরণ ঘটাতে যাচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে দেশের বাণিজ্য নীতি, শুল্ক কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো আরও বেশি কৌশলগত গুরুত্ব বহন করছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সময়ে নেওয়া প্রতিটি সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক শুল্ক চুক্তিটি নিয়ে নতুন করে আলোচনার দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থকে সামনে রেখে বিষয়টি পুনরায় মূল্যায়ন করা উচিত। কারণ একটি বাণিজ্য চুক্তির প্রভাব শুধু কয়েক বছরের জন্য নয়, বরং বহু বছর ধরে একটি দেশের অর্থনীতি ও নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ