ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার ঘটনাটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বহু দশক ধরে বিশ্ব রাজনীতিতে শত্রু রাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা বা সশস্ত্র গোষ্ঠীর নেতাদের ওপর হামলার নজির থাকলেও কোনো সার্বভৌম দেশের কার্যরত সর্বোচ্চ নেতাকে লক্ষ্য করে এমন প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ড অত্যন্ত বিরল। ফলে এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক আইন, যুদ্ধনীতি, রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব আইনি কাঠামো—সবকিছু নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে দুই দেশ ইরানের নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে আকস্মিক হামলা চালায়। এই হামলায় প্রায় চার দশক ধরে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ধরে রাখা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। কর্মকর্তাদের ভাষ্য বলছে, সিআইএ তাঁর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য ইসরায়েলকে সরবরাহ করেছিল এবং ইসরায়েল সরাসরি হামলা পরিচালনা করে। পরিকল্পনাটি সুযোগ বুঝে আগাম বাস্তবায়ন করা হয় বলেও জানা গেছে। ঘটনাটি শুধু সামরিক নয়, আইনি ও নৈতিক দিক থেকেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আইনি জটিলতার মূল জায়গা হলো খামেনির ‘দ্বৈত’ অবস্থান। তিনি ছিলেন বেসামরিক ব্যক্তি—কোনো সামরিক ইউনিফর্মধারী কর্মকর্তা নন। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়কও ছিলেন, ঠিক যেমন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বেসামরিক হয়েও সামরিক বাহিনীর প্রধান কমান্ডার। আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে সাধারণ নীতি হলো—যুদ্ধে সক্রিয় সামরিক কমান্ডাররা বৈধ লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন, কিন্তু যারা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিচ্ছেন না এমন বেসামরিক কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করা অবৈধ। খামেনির ক্ষেত্রে এই দুই পরিচয় একসঙ্গে থাকায় বিষয়টি জটিল হয়ে ওঠে।
আইন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের মতে, সক্রিয় সশস্ত্র সংঘাত চলাকালে কোনো রাষ্ট্রপ্রধান যদি কার্যত সামরিক কমান্ড পরিচালনা করেন, তাহলে তিনি বৈধ সামরিক লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন। তবে এখানে বড় প্রশ্ন হলো—হামলার মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কি ইরানের সঙ্গে এমন এক অবস্থায় ছিল, যাকে আন্তর্জাতিক আইনে পূর্ণাঙ্গ সশস্ত্র সংঘাত বলা যায়? যদি যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু না হয়ে থাকে, তাহলে এই হত্যাকাণ্ড শান্তিকালীন টার্গেটেড কিলিং হিসেবে গণ্য হতে পারে, যা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ঝুঁকি রাখে।
সমালোচকেরা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন—এই সামরিক পদক্ষেপের আগে যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের অনুমোদন নেয়নি এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদেরও কোনো অনুমোদন ছিল না। জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী, একটি দেশ অন্য দেশের ভূখণ্ডে বলপ্রয়োগ করতে পারে কেবল আত্মরক্ষার যুক্তিতে বা নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, যুক্তরাষ্ট্র যে ‘আত্মরক্ষা’ যুক্তি দিচ্ছে, তা কতটা আইনসম্মত।
হোয়াইট হাউসের বক্তব্যে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রধান সেনাপতি হিসেবে তাঁর ক্ষমতা প্রয়োগ করে অঞ্চলটিতে মার্কিন সেনা ও ঘাঁটি রক্ষায় পদক্ষেপ নিয়েছেন। প্রশাসন ইরানের দীর্ঘদিনের বিভিন্ন ‘অপরাধের’ কথা উল্লেখ করলেও খামেনিকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করার নির্দিষ্ট আইনি ব্যাখ্যা স্পষ্টভাবে দেয়নি। এই অস্পষ্টতাই বিতর্ককে আরও ঘনীভূত করেছে।
আত্মরক্ষার প্রশ্নটি এখানে কেন্দ্রীয় হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক আইনে আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করতে হলে সাধারণত একটি সশস্ত্র হামলা সংঘটিত হওয়া প্রয়োজন। তবে ‘আসন্ন হুমকি’ থাকলেও আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ বৈধ হতে পারে—এমন ব্যাখ্যাও প্রচলিত আছে। কিন্তু ‘আসন্ন’ বলতে কী বোঝায়, সেটিই সবচেয়ে বিতর্কিত জায়গা। ট্রাম্প এক ভিডিও বার্তায় বলেন, লক্ষ্য ছিল ‘ইরানি শাসনের আসন্ন হুমকি দূর করা’, কিন্তু তিনি এমন কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ দেননি যে ইরান তাৎক্ষণিক হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কো রুবিও দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করেছিল ইসরায়েল ইরানে হামলা চালাবে এবং তার প্রতিক্রিয়ায় ইরান মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্র ‘প্রতিরক্ষামূলকভাবে আগে থেকেই’ অভিযানে যোগ দেয়। সমালোচকদের মতে, এই যুক্তি কিছুটা অনুমাননির্ভর এবং ‘প্রি-এম্পটিভ’ হামলার আইনি সীমা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তোলে।
আইনবিদ রেবেকা ইনগবারের মতো বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধের আইনে কেউ বৈধ লক্ষ্য হলেও যদি পুরো সামরিক অভিযানই জাতিসংঘ সনদ লঙ্ঘন করে শুরু হয়, তাহলে সেই হত্যাকাণ্ড বৈধতা পায় না। অর্থাৎ যুদ্ধ শুরুর বৈধতা নিজেই যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে তার ভেতরে করা টার্গেটেড কিলিংও আইনি সুরক্ষা হারাতে পারে।
এই ঘটনার আরেকটি দিক হলো রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা। যদি প্রমাণ হয় যে যুক্তরাষ্ট্র জেনেবুঝে ইসরায়েলকে খামেনির অবস্থান জানিয়ে হামলায় সহায়তা করেছে এবং হামলাটি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে, তাহলে উভয় দেশই আইনি দায় বহন করতে পারে। আন্তর্জাতিক আইনে সহযোগিতার মাধ্যমেও দায়বদ্ধতা তৈরি হয়—এই নীতিটি এখানে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ আইনের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিতর্ক কম নয়। মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বহু প্রেসিডেন্ট সীমিত সামরিক অভিযান একক সিদ্ধান্তে পরিচালনা করেছেন। নির্বাহী শাখার আইনজীবীরা সাধারণত যুক্তি দেন, যদি অভিযানটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের পর্যায়ে না যায়, তাহলে প্রেসিডেন্টের একক পদক্ষেপ সাংবিধানিক হতে পারে। তবুও ১৯৭৩ সালের ওয়ার পাওয়ারস রেজোল্যুশনের পর বড় ধরনের সংঘাতে প্রেসিডেন্টরা সাধারণত কংগ্রেসের অনুমোদন নিয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে ইরানে সাম্প্রতিক হামলাকে অনেকে সবচেয়ে বড় একতরফা সামরিক পদক্ষেপগুলোর একটি হিসেবে দেখছেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রের ‘হত্যা নিষেধাজ্ঞা’। ১৯৭০-এর দশকে সিআইএর বিদেশি নেতাদের হত্যাচক্রান্ত ফাঁস হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড একটি নির্বাহী আদেশ জারি করে সরকারি কর্মীদের হত্যায় জড়িত হওয়া নিষিদ্ধ করেন। বর্তমানে নির্বাহী আদেশ ১২৩৩৩–এ বলা আছে, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পক্ষে কর্মরত কেউ হত্যাকাণ্ডে অংশ নিতে পারবে না। তবে এখানে ‘হত্যা’ শব্দটির স্পষ্ট সংজ্ঞা নেই। অতীতে যুক্তরাষ্ট্র যুক্তি দিয়েছে, আত্মরক্ষা বা সশস্ত্র সংঘাতের অংশ হিসেবে উচ্চপর্যায়ের সন্ত্রাসী নেতাদের লক্ষ্য করে হামলা এই নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে না। কিন্তু খামেনি কোনো অরাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী নেতা নন; তিনি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতা—এই পার্থক্য বিতর্ককে আরও গভীর করেছে।
এই ঘটনার ঐতিহাসিক নজির খুব সীমিত। কাছাকাছি উদাহরণ হিসেবে ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের প্রাক্কালে সাদ্দাম হোসেনকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থ বিমান হামলার কথা উল্লেখ করা হয়। তবে সেই ক্ষেত্রে কংগ্রেসের অনুমোদিত যুদ্ধ চলছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই আইনি ভিত্তি কতটা প্রযোজ্য—তা নিয়েও মতভেদ রয়েছে।
ঘটনার ভূরাজনৈতিক প্রভাবও গভীর হতে পারে। কোনো রাষ্ট্র যদি প্রকাশ্যে অন্য দেশের কার্যরত নেতাকে লক্ষ্যবস্তু করে, তাহলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কা বিশ্লেষকদের। এতে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রপ্রধানদের নিরাপত্তা, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং যুদ্ধের অনানুষ্ঠানিক সীমারেখা সবই নতুন করে সংজ্ঞায়িত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
সব মিলিয়ে খামেনিকে লক্ষ্য করে চালানো এই হামলা কেবল একটি সামরিক অভিযান নয়; এটি আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, আত্মরক্ষার সীমা এবং আধুনিক যুদ্ধনীতির বহু অমীমাংসিত প্রশ্নকে সামনে এনে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন এটিকে প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরলেও সমালোচকেরা বলছেন, আইনি ভিত্তি স্পষ্ট না হলে এমন পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে আরও অস্থির করে তুলতে পারে। বিতর্ক এখনো থামেনি, এবং সম্ভবত নিকট ভবিষ্যতেও থামবে না। কারণ প্রশ্নটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের নয়—বরং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় শক্তি, আইন ও নৈতিকতার ভারসাম্য কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, সেটিরও পরীক্ষা।
আপনার মতামত জানানঃ