মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির রাজনীতিতে নতুন করে বিস্ফোরণ ঘটেছে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শনিবার ভোরে। ইরানের রাজধানী তেহরানসহ একাধিক শহরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত সামরিক হামলার খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, পাল্টা প্রতিক্রিয়ার হুমকি আসে তেহরান থেকে, আর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এটি সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অঞ্চলটির সবচেয়ে গুরুতর সামরিক উত্তেজনাগুলোর একটি।
প্রাথমিক প্রতিবেদনে জানা যায়, হামলাগুলো ছিল পরিকল্পিত এবং সমন্বিত। ইসরায়েল এটিকে “প্রি-এম্পটিভ” বা আগাম প্রতিরোধমূলক আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছে। মার্কিন কর্মকর্তারাও নিশ্চিত করেছেন যে অভিযানটি ইরানের সামরিক সক্ষমতা—বিশেষ করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি—দুর্বল করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়েছে। হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার, সামরিক ঘাঁটি এবং কমান্ড সেন্টারের কথা বলা হয়েছে।
শনিবার ভোরে তেহরানে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে উঠতে দেখা যায়। একই সময়ে ইসফাহান, কোম, কারাজ ও কারমানশাহসহ আরও কয়েকটি শহরে হামলার খবর আসে। বিভিন্ন সূত্র বলছে, এসব হামলা ছিল বিস্তৃত সামরিক অবকাঠামোর ওপর কেন্দ্রীভূত, যদিও তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের পূর্ণ চিত্র প্রকাশ পায়নি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক ভিডিও বার্তায় ঘোষণা দেন যে “মেজর কমব্যাট অপারেশন” শুরু হয়েছে এবং তিনি দাবি করেন, ইরানের সামরিক হুমকি মোকাবেলায় এই পদক্ষেপ জরুরি ছিল। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও একই সুরে বলেন, ইরান তাদের জন্য “অস্তিত্বগত হুমকি” তৈরি করছিল, তাই আগাম ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, এই যৌথ অভিযান ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে “গভীর আঘাত” দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছে এবং প্রয়োজনে তা চলতে পারে। এতে বোঝা যায়, এটি একদিনের সীমিত হামলা নাও হতে পারে; বরং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক চাপের সূচনা হতে পারে।
হামলার পেছনে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা কাজ করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন প্রক্সি গোষ্ঠীকে সমর্থনের অভিযোগ নিয়ে বহু বছর ধরে তেহরান ও তেল আবিবের মধ্যে বিরোধ চলছে। কূটনৈতিক আলোচনার একাধিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর পরিস্থিতি ক্রমেই সংঘাতমুখী হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পারমাণবিক আলোচনা অচলাবস্থায় পড়ার পর উত্তেজনা দ্রুত বাড়তে থাকে। পশ্চিমা দেশগুলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখে, যদিও তেহরান বরাবরই দাবি করে এসেছে যে তাদের কর্মসূচি প্রতিরক্ষামূলক।
হামলার পরপরই ইরান কঠোর প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি দেয়। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান ইতোমধ্যে ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। এতে সংঘাত আরও বিস্তৃত আকার নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথে দ্রুত প্রভাব পড়েছে। ইসরায়েল, ইরানসহ কয়েকটি দেশ আকাশসীমা বন্ধ করে দেয় এবং বহু আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল বা ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। নিরাপত্তাজনিত কারণে বিভিন্ন দেশে মার্কিন দূতাবাস নাগরিকদের সতর্ক থাকতে বলেছে। অঞ্চলজুড়ে সামরিক সতর্কতা জারি হয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যা পরিস্থিতির গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে। একই সঙ্গে তেহরান জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক আহ্বানের কথাও জানিয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে বলা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত শুধু দুই বা তিন দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ—হরমুজ প্রণালী—ঝুঁকিতে পড়লে বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও বড় ধাক্কা লাগতে পারে। ইতোমধ্যে বাজারে অস্থিরতার আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও দ্রুত আসতে শুরু করেছে। কিছু দেশ উভয় পক্ষকে সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে এবং কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়েছে। আবার কিছু পশ্চিমা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হামলাকে ইরানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে সমর্থন করেছেন। পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
মাঠ পর্যায়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে বিস্ফোরণের শব্দ, সাইরেন এবং নিরাপত্তা টহল বেড়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়েছে। ইসরায়েলেও মানুষকে বোমা আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি পাল্টা হামলা ও পাল্টা প্রতিশোধের চক্র শুরু হয়, তাহলে এটি দ্রুত পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি, ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তু এবং ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় হয়ে উঠলে সংঘাতের ভৌগোলিক পরিধি বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এটি কি সীমিত সামরিক বার্তা, নাকি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সূচনা? যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বলছে তারা ইরানের সামরিক হুমকি কমাতে চায়। কিন্তু তেহরান যদি পূর্ণমাত্রায় পাল্টা জবাব দেয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য আবারও বড় ধরনের যুদ্ধের মুখে পড়তে পারে।
বিশ্ব সম্প্রদায় এখন নজর রাখছে পরবর্তী কয়েক দিনের দিকে। কারণ ইতিহাস বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে একবার বড় সামরিক উত্তেজনা শুরু হলে তা দ্রুত সীমান্ত ছাড়িয়ে যায়। কূটনীতি কি পরিস্থিতি ঠান্ডা করতে পারবে, নাকি অঞ্চল নতুন এক অস্থির যুগে প্রবেশ করছে—এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
আপনার মতামত জানানঃ