পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সীমান্তজুড়ে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার খবর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্রের দাবি অনুযায়ী, চলমান সংঘাতে ২২৮ জন তালেবান যোদ্ধা নিহত হয়েছেন এবং আরও ৩১৪ জন আহত হয়েছেন। একই সঙ্গে পাকিস্তান জানিয়েছে, তারা তালেবানের ৭৪টি সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করেছে এবং ১৮টি ঘাঁটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। তবে তালেবান প্রশাসনের বক্তব্য ভিন্ন—তাদের দাবি, নিহতের সংখ্যা অনেক কম এবং উল্টো পাকিস্তানি বাহিনীরও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দুই পক্ষের পরস্পরবিরোধী এই তথ্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এই সংঘাতকে শুধু একটি সীমান্ত সংঘর্ষ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি বহুদিনের অবিশ্বাস, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের ধারাবাহিকতা। ডুরান্ড লাইন ঘিরে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা নতুন কিছু নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে ড্রোন হামলার অভিযোগ, সীমান্তে গোলাবর্ষণ এবং পাল্টাপাল্টি সামরিক বিবৃতি পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার জানিয়েছেন, অ্যাবোটাবাদ, সোয়াবি ও নওশেরা অঞ্চলে ছোট ড্রোন দিয়ে হামলার চেষ্টা করা হয়েছিল, যা তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভূপাতিত করেছে বলে দাবি করা হয়। যদিও এসব হামলায় হতাহতের কোনো খবর পাকিস্তান দেয়নি।
অন্যদিকে তালেবান সরকার পাল্টা বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা পাকিস্তানের ‘আগ্রাসনের’ জবাব দিয়েছে এবং তাদের হামলায় ৫৫ পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছে বলে দাবি করেছে। পাশাপাশি কিছু সেনাকে আটক এবং অস্ত্র দখলের কথাও বলা হয়েছে। আফগান গণমাধ্যমের বরাতে এই তথ্য সামনে এসেছে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষের দাবি যাচাই করা কঠিন—এটি আন্তর্জাতিক সংঘাত প্রতিবেদনের একটি পরিচিত বাস্তবতা। সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে স্বাধীন পর্যবেক্ষণ ছাড়া প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা নিশ্চিত করা যায় না।
এই উত্তেজনার পেছনে মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সীমান্ত নিরাপত্তা ও জঙ্গি তৎপরতা নিয়ে পারস্পরিক অভিযোগ। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে আফগান ভূখণ্ডে থাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো পাকিস্তানের ভেতরে হামলা চালাচ্ছে। অন্যদিকে তালেবান প্রশাসন প্রায়ই পাকিস্তানের সীমান্ত অভিযানকে নিজেদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে তুলে ধরে। ফলে সীমান্ত এলাকায় সামান্য উত্তেজনাও দ্রুত বড় সংঘাতে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক শক্তিগুলোও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। চীন, রাশিয়া ও ইরান—তিন দেশই কাবুল ও ইসলামাবাদকে সংযম দেখানোর এবং আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মেটানোর আহ্বান জানিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তা শুধু দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বৃহত্তর অঞ্চলের নিরাপত্তা ও বাণিজ্য প্রবাহেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা।
মানবিক দিক থেকেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী সাধারণ মানুষ প্রায়ই গোলাগুলি, ড্রোন উড্ডয়ন ও সামরিক তৎপরতার মধ্যে পড়ে ঝুঁকির মুখে থাকেন। সংঘাত বাড়লে বাস্তুচ্যুতি, বাণিজ্য ব্যাহত হওয়া এবং সীমান্ত অর্থনীতিতে ধাক্কার সম্ভাবনা থাকে। ইতোমধ্যে করাচিতে নিরাপত্তা জোরদারের খবর এসেছে, যেখানে জুমার নামাজও অতিরিক্ত পুলিশি প্রহরায় অনুষ্ঠিত হয়েছে—যা অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের সংঘাতের স্থায়ী সমাধান সামরিক পদক্ষেপে নয়; বরং কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে সম্ভব। দুই দেশের মধ্যে বিশ্বাসের ঘাটতি কমানো না গেলে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও সীমান্ত উত্তেজনা বারবার ফিরে আসবে। বিশেষ করে আফগানিস্তানে তালেবান শাসন প্রতিষ্ঠার পর পাকিস্তান-আফগান সম্পর্ক নতুন এক অনিশ্চয়তার পর্যায়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক স্পষ্ট।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখনো পরিবর্তনশীল এবং উত্তেজনাপূর্ণ। হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি থাকলেও একটি বিষয় পরিষ্কার—সীমান্তে অস্থিতিশীলতা বাড়ছে এবং আঞ্চলিক কূটনীতি দ্রুত সক্রিয় না হলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি এখন কাবুল ও ইসলামাবাদের দিকে—তারা কি সংলাপের পথে ফিরবে, নাকি পাল্টাপাল্টি সামরিক অবস্থানই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
আপনার মতামত জানানঃ