ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে কূটনৈতিক অবস্থান নেওয়া ভারত আজ ইসরায়েলের অন্যতম ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদার। একসময় উপনিবেশবিরোধী রাজনীতি, আরব বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক এবং ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রশ্নে নয়াদিল্লির অবস্থান ছিল স্পষ্ট। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, অস্ত্র কেনাবেচা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, প্রযুক্তি এবং রাজনৈতিক যোগাযোগের বিস্তারের মধ্য দিয়ে ভারত-ইসরায়েল সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এই সম্পর্কের রাজনৈতিক তাৎপর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। যে সময়ে ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনা তীব্র হয়েছে, সেই সময়ে ভারতের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও মানবাধিকারের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভারতের এই পরিবর্তন বুঝতে হলে দেশটির ঐতিহাসিক অবস্থানের দিকে ফিরে তাকাতে হয়। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে ভারত বিরোধিতা করেছিল। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রামের অভিজ্ঞতা এবং ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি সমর্থন ছিল ভারতের প্রাথমিক অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে জায়নবাদকে বর্ণবাদের সঙ্গে যুক্ত করে যে প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল, ভারত সেটির পক্ষে ভোট দিয়েছিল। ভারত ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থাকেও স্বীকৃতি দেয় এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের অধিকারের পক্ষে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। আরব বিশ্বের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখাও ছিল ভারতের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ কখনোই পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ছিল না। নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে যোগাযোগ চলেছে। ১৯৯২ সালে ভারত ও ইসরায়েল পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। এরপর থেকে বিভিন্ন ভারতীয় সরকার ধীরে ধীরে সহযোগিতা বাড়িয়েছে। ফলে মোদি ক্ষমতায় আসার পরই সম্পর্কের সূচনা হয়েছে—এমন ধারণা সঠিক নয়। বরং তাঁর আমলে আগে থেকে গড়ে ওঠা সম্পর্ক আরও প্রকাশ্য, রাজনৈতিকভাবে দৃশ্যমান এবং বহুমাত্রিক হয়ে উঠেছে।
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতায় আসার পর ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে বাস্তববাদী কৌশলগত স্বার্থের পাশাপাশি আদর্শিক রাজনীতির ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। ২০১৬ সালে মোদি প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইসরায়েল সফর করেন। পরের বছর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ভারত সফরে এলে দুই দেশের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা আরও প্রকাশ্যে আসে। প্রতিরক্ষা, কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা, সাইবার নিরাপত্তা, প্রযুক্তি এবং বাণিজ্যিক সহযোগিতায় দুই দেশ নতুন উদ্যোগ নেয়। এর ফলে ইসরায়েল ভারতের কাছে শুধু একটি বাণিজ্যিক অংশীদার নয়, বরং নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই সম্পর্কের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা। ভারত বিশ্বের বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক দেশগুলোর একটি। দেশটির সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য উন্নত প্রযুক্তি ও অস্ত্রের প্রয়োজন রয়েছে। ইসরায়েল ড্রোন, নজরদারি ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, রাডার এবং বিভিন্ন ধরনের সামরিক প্রযুক্তি সরবরাহ করে আসছে। অন্যদিকে ভারতের বিশাল প্রতিরক্ষা বাজার ইসরায়েলি অস্ত্র ও প্রযুক্তি নির্মাতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এই পারস্পরিক নির্ভরতা দুই দেশের সম্পর্ককে রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরেও বাস্তব স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই প্রতিরক্ষা সম্পর্কের নৈতিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য আরও বেশি আলোচনায় আসে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় ইসরায়েলে বহু মানুষ নিহত হন এবং অনেকে জিম্মি হন। মোদি হামলার পরপরই হামলার নিন্দা জানান এবং ইসরায়েলের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার নিন্দা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের আলোকে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, পরবর্তী সময়ে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি নিহত হওয়া, ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি এবং আবাসিক অবকাঠামো ধ্বংসের ঘটনায় ভারতের প্রতিক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গাজায় সামরিক অভিযান দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা, মানবিক সহায়তা প্রবেশ, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলার দাবি বিশ্বজুড়ে জোরালো হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠন ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গাজায় গণহত্যা কনভেনশনের অধীনে আনা অভিযোগ নিয়ে বিচারিক কার্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বিশ্বরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। এসব আইনি প্রক্রিয়ার অর্থ এই নয় যে সংশ্লিষ্ট অভিযোগের সবকিছু চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে; বরং এগুলো আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার চলমান প্রচেষ্টার অংশ।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের অবস্থান একটি জটিল বৈপরীত্য সামনে এনেছে। একদিকে নয়াদিল্লি আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে এবং দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানকে সমর্থন করে। অন্যদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে এবং গাজা নিয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণে তুলনামূলকভাবে সতর্ক থেকেছে। ভারতের এই নীতি নিয়ে সমালোচকদের প্রশ্ন, ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি সমর্থন যদি ভারতের ঘোষিত অবস্থান হয়, তাহলে গাজায় বেসামরিক মানুষের বিপর্যয় এবং পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে নয়াদিল্লি আরও দৃঢ় পদক্ষেপ নিচ্ছে না কেন?
ভারতের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিশ্লেষকেরা অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয়টিও সামনে আনছেন। মোদির বিজেপির আদর্শিক ভিত্তি হিন্দুত্ববাদ। এই রাজনৈতিক দর্শনে ভারতের জাতীয় পরিচয় ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে হিন্দু ঐতিহ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করে দেখার প্রবণতা রয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বিজেপির কিছু সমর্থক ইসরায়েলের নিরাপত্তানীতি, সামরিক শক্তি এবং কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপকে আদর্শ হিসেবে দেখেন। তাঁদের চোখে ইসরায়েল এমন একটি রাষ্ট্র, যা নিরাপত্তার প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নেয় এবং প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগে দ্বিধা করে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক রশীদ কিদওয়াইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, বিজেপির রাজনৈতিক ভাষ্যে ইসলামি চরমপন্থা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা দলটির কিছু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বয়ানের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে ভারত-ইসরায়েল সম্পর্ককে কেবল ধর্মীয় বা আদর্শিক মিল দিয়ে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। সামরিক প্রযুক্তি, গোয়েন্দা সহযোগিতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক কৌশলগত অবস্থানের মতো বিষয়ও এই সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়েছে।
ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে আলোচনার আরেকটি সংবেদনশীল দিক হলো দেশটির মুসলিম জনগোষ্ঠী এবং কাশ্মীর প্রশ্ন। বিজেপির কিছু নেতা ও সমর্থক ইসরায়েলের নিরাপত্তানীতির প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়েছেন এবং ভারতের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একই ধরনের কঠোরতা গ্রহণের পক্ষে মত দিয়েছেন। সমালোচকদের মতে, এ ধরনের তুলনা কখনো কখনো ফিলিস্তিনিদের অধিকার এবং ভারতীয় মুসলিমদের অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও তীব্র করে। তবে কোনো দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি অন্য দেশের পরিস্থিতির সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখা যায় না। ইতিহাস, আইন, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং সংঘাতের ধরন আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আদর্শিক ঘনিষ্ঠতার পাশাপাশি ভারতের বাস্তব কৌশলগত হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েলের উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ভারতের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং সাইবার নিরাপত্তা দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে ভারতের জ্বালানি, বাণিজ্য ও প্রবাসী শ্রমিকদের সম্পর্ক রয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় নাগরিক কাজ করেন এবং সেখান থেকে ভারত উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করে। ফলে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার পাশাপাশি আরব বিশ্বের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাও নয়াদিল্লির জন্য জরুরি। এই ভারসাম্য রক্ষা করাই ভারতের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
গাজা যুদ্ধের মধ্যেও ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে আলোচনায় এসেছে অস্ত্র রপ্তানির বিষয়টি। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে যুদ্ধ চলাকালে ভারত থেকে ইসরায়েলে সামরিক সরঞ্জাম ও সম্ভাব্য অস্ত্রসংশ্লিষ্ট পণ্য পাঠানোর বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদন দুই দেশের প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে প্রতিটি চালানের প্রকৃতি, ব্যবহারকারী, অনুমোদন এবং সামরিক অভিযানে তার নির্দিষ্ট ভূমিকা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো পণ্য ইসরায়েলে পাঠানো হয়েছে বলেই সেটি সরাসরি গাজায় ব্যবহৃত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন।
ভারতের নীতির সমালোচনা শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং গাজায় মানবিক বিপর্যয়ের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। কিছু দেশ অবৈধ বসতিতে উৎপাদিত পণ্যের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, আবার কিছু দেশ নির্দিষ্ট ইসরায়েলি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা বা ভ্রমণসংক্রান্ত পদক্ষেপ নিয়েছে। এসব পদক্ষেপের পেছনে দেশভেদে আইনি ও রাজনৈতিক যুক্তি রয়েছে। অন্যদিকে ভারত মূলত কূটনৈতিক বিবৃতি, মানবিক সহায়তা এবং দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের সমর্থনের মধ্যেই তার প্রকাশ্য অবস্থান সীমিত রেখেছে বলে সমালোচকেরা মনে করেন।
সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক নবদীপ সুরির মতে, ভারতের উচিত আন্তর্জাতিক আইন, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা এবং পশ্চিম তীরে সহিংসতার প্রশ্নে আরও স্পষ্ট নীতিগত অবস্থান নেওয়া। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, দুই দেশের সরকারের মধ্যে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা ভারতের সমালোচনামূলক অবস্থান গ্রহণের ক্ষেত্রে দ্বিধা তৈরি করতে পারে। এই দ্বিধা ভারতের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহ্যের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিও আলোচনার বিষয়। কারণ ভারত ঐতিহাসিকভাবে ঔপনিবেশিকতাবিরোধী আন্দোলন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর সহযোগিতা এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
তবে ভারতের কূটনৈতিক অবস্থানকে একমাত্রিকভাবে বিচার করাও ঠিক হবে না। নয়াদিল্লি হামাসের হামলার নিন্দা জানিয়েছে, আবার ফিলিস্তিনিদের জন্য মানবিক সহায়তার কথাও বলেছে এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে আনুষ্ঠানিক সমর্থন বজায় রেখেছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাষ্ট্রগুলো প্রায়ই নিরাপত্তা, অর্থনীতি, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিবেচনার মধ্যে ভারসাম্য খোঁজে। কিন্তু এই বাস্তববাদী হিসাবের মধ্যেও আন্তর্জাতিক মানবিক আইন, বেসামরিক মানুষের জীবন রক্ষা এবং দখলদারিত্বের অবসানের মতো নীতিগত বিষয়গুলো উপেক্ষা করা যায় না।
মোদির ইসরায়েল নীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারতের বৃহত্তর আকাঙ্ক্ষা। ভারত নিজেকে একটি প্রভাবশালী বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, রাশিয়া, ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নয়াদিল্লি নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা ধরে রাখতে আগ্রহী। ফলে ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা একদিকে প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সুবিধা এনে দেয়, অন্যদিকে ফিলিস্তিন প্রশ্নে ভারতের ঐতিহাসিক অবস্থান এবং আরব বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সব মিলিয়ে গাজায় যুদ্ধ ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কের সূচনা করেনি; বরং আগে থেকে গড়ে ওঠা সম্পর্কের রাজনৈতিক চরিত্র আরও স্পষ্ট করেছে। মোদি সরকারের আমলে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, প্রযুক্তিগত অংশীদারত্ব এবং উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগের বিস্তার এই ঘনিষ্ঠতার ভিত্তি শক্ত করেছে। গাজায় বিপুল প্রাণহানি ও মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যেও সম্পর্ক অটুট থাকায় ভারতের নৈতিক অবস্থান, আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে প্রতিশ্রুতি এবং পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ভারতের সামনে এখন গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো, কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে যেন মানবিক ও নীতিগত দায়বদ্ধতা দুর্বল না হয়ে পড়ে। ইসরায়েলের সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রাখা এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার সমর্থন করা—দুটিকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। বরং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, মানবিক সহায়তার অবাধ প্রবেশের পক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং একটি কার্যকর রাজনৈতিক সমাধানের জন্য চাপ সৃষ্টি করা ভারতের কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে পারে। শেষ পর্যন্ত ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কের ভবিষ্যৎ শুধু অস্ত্র, প্রযুক্তি ও কৌশলগত অংশীদারত্বের হিসাবেই নির্ধারিত হবে না; ফিলিস্তিনের প্রশ্নে ন্যায়বিচার, মানবিক দায়িত্ব এবং আন্তর্জাতিক নীতির প্রতি ভারতের অঙ্গীকারও তার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হবে।
আপনার মতামত জানানঃ