পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তন শুধু রাজনৈতিক সমীকরণই বদলায়নি, বরং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অবস্থান নিয়েও তৈরি করেছে নানা উদ্বেগ। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, সামাজিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিধিনিষেধ, ধর্মীয় স্থাপনা ও পোশাক নিয়ে বিতর্ক এবং বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’–এর অভিযোগ—সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সমাজের একটি অংশ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা বলছে। একই সময়ে রাজ্যের রাজনৈতিক ময়দানে মুসলমানপ্রধান একাধিক দলের উত্থান নতুন এক সমীকরণ তৈরি করেছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই দলগুলোর উত্থান শেষ পর্যন্ত বিজেপির জন্যই রাজনৈতিক সুবিধা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
পশ্চিমবঙ্গ ভারতের এমন একটি রাজ্য, যেখানে মুসলমান জনগোষ্ঠীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলমান হওয়ায় বিধানসভা নির্বাচনে এই জনগোষ্ঠীর ভোট বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় ধরে তৃণমূল কংগ্রেস, বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেস মুসলিম ভোটের বড় অংশ নিজেদের দিকে ধরে রেখেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে সেই পুরোনো ভোটব্যাংকে এখন দেখা যাচ্ছে নতুন বিভাজন। একদিকে বিজেপির উত্থান, অন্যদিকে মুসলমানপ্রধান নতুন রাজনৈতিক দলের আবির্ভাব—দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাব পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিকে নতুন পথে নিয়ে যেতে পারে।
প্রথম আলোর প্রকাশিত বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ ও হামলার অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে মুসলিম মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ঘরবাড়ি ভাঙচুর, ধর্মীয় স্থাপনায় আক্রমণ, হিজাব পরা শিক্ষার্থীদের বাধা দেওয়া, হকার ও ছোট ব্যবসায়ীদের হয়রানি এবং গবাদিপশুর হাট ও মাংসের ব্যবসার ওপর বিধিনিষেধ।
নাগরিক অধিকার সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রটেকশন অব সিভিল রাইটস বা এপিসিআরের তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের পর মে মাসের প্রথম সপ্তাহেই পশ্চিমবঙ্গের অন্তত আটটি জেলায় ৩৪টি আক্রমণের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় অন্তত ৫৪টি সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ৫০ জনের বেশি মুসলিম নাগরিক শারীরিক বা অন্যান্য আক্রমণের শিকার হন বলে সংগঠনটি জানিয়েছে। কোচবিহার, উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা, কলকাতা, হাওড়া ও মুর্শিদাবাদসহ বিভিন্ন এলাকায় এসব ঘটনার কথা উঠে এসেছে।
তবে এই ঘটনাগুলোর সবকিছুকেই কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে সংঘটিত হামলা হিসেবে দেখার বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ, রাজনৈতিক সংঘাত, দলীয় পরিচয় এবং স্থানীয় বিরোধও অনেক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। প্রথম আলোর বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, আক্রান্তদের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের মুসলিম সমর্থকেরাও ছিলেন। অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতিকে বুঝতে হলে ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
তারপরও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগকে একেবারে উপেক্ষা করা যায় না। কোচবিহারে মসজিদে হামলার অভিযোগ, উত্তর চব্বিশ পরগনার কয়েকটি গ্রামে মুসলিম পরিবারের ঘরবাড়ি ভাঙচুর, হাওড়ায় ইমামকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ এবং হিজাব পরা ছাত্রীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো সামাজিক পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মুসলমানদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা বিধিনিষেধের অভিযোগ। গবাদিপশু জবাই ও মাংস বিক্রির ক্ষেত্রে নিয়মকানুনের প্রয়োগের কারণে ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের ওপর প্রভাব পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কোথাও কোথাও গবাদিপশুর হাট বন্ধ করে দেওয়া এবং ছোট ব্যবসায়ী ও হকারদের ওপর অভিযান চালানোর অভিযোগও সামনে এসেছে। একটি সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের জীবিকা যখন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে সংকুচিত হয়, তখন তার প্রভাব শুধু অর্থনীতিতে নয়, সামাজিক নিরাপত্তার অনুভূতির ওপরও পড়ে।
শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। রাজ্যের সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরের উদ্যোগে পরিচালিত এক সমীক্ষার পর ২৫২টি অনুমোদন ও অনুদানহীন মাদ্রাসা বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং আরও ১০০টি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারের দৃষ্টিতে এসব পদক্ষেপের পেছনে প্রশাসনিক ও অনুমোদনসংক্রান্ত কারণ থাকতে পারে। কিন্তু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।
পুলিশ বাহিনীর মুসলিম সদস্যদের দাড়ি রাখার অনুমতি নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কও পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কলকাতা পুলিশের সদর দপ্তরের এক নির্দেশিকায় ৪৭ জন মুসলিম পুলিশ সদস্যের দাড়ি রাখার আবেদন নাকচ করা হয় এবং শৃঙ্খলা, পরিচ্ছন্নতা ও পোশাকের সমতার যুক্তি দেওয়া হয়। এ ধরনের সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক বিধির অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হলেও ধর্মীয় স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তিগত ধর্মীয় অনুশীলনের অধিকারের প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গে এই ইস্যু স্বাভাবিকভাবেই অত্যন্ত সংবেদনশীল। অভিযোগ উঠেছে, বাংলাদেশি নাগরিক সন্দেহে পশ্চিমবঙ্গের কিছু মুসলিম বাসিন্দাকে আটক করে সীমান্তের ওপারে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ নিজেদের ভারতীয় নাগরিক বলে দাবি করেছেন। কয়েকটি ঘটনায় ভারতের আদালতের হস্তক্ষেপের কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এই অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নাগরিকত্ব নির্ধারণের প্রক্রিয়া। কোনো ব্যক্তি সত্যিই বিদেশি নাগরিক কি না, সেটি নির্ধারণের আগে তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকা প্রয়োজন—এটাই আইনের শাসনের মৌলিক ধারণা। নাগরিকত্বের প্রশ্নে ভুল সিদ্ধান্ত হলে একজন প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকও নিজ দেশের বাইরে চলে যেতে পারেন। তাই সীমান্তবর্তী রাজ্যে অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানোর প্রয়োজন থাকলেও নাগরিকের অধিকার রক্ষা এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ একই সঙ্গে নিশ্চিত করা জরুরি।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আরেকটি পরিবর্তন লক্ষণীয়। মুসলমানপ্রধান নতুন রাজনৈতিক দলগুলো ধীরে ধীরে নিজেদের জায়গা তৈরি করছে। এর মধ্যে ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট বা আইএসএফ ইতিমধ্যেই নির্বাচনী রাজনীতিতে পরিচিত নাম। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের নির্বাচনে আইএসএফের ভোট প্রায় দেড় শতাংশে পৌঁছেছে। সংখ্যাটি রাজ্যব্যাপী খুব বড় মনে না হলেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দলটি মাত্র ২৯টি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল। এসব আসনের মধ্যে ১৫টিতে তাদের প্রাপ্ত ভোট জয়-পরাজয়ের ব্যবধানের চেয়েও বেশি ছিল।
এই পরিসংখ্যানই পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ রাজনীতির একটি সম্ভাব্য চিত্র তুলে ধরে। কোনো একটি আসনে তৃতীয় কোনো দল যদি এমন ভোট পায়, যা প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর ব্যবধানের চেয়ে বেশি, তাহলে সেই দল সরাসরি জয়ী না হয়েও নির্বাচনের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। মুসলমান ভোট যদি তৃণমূল কংগ্রেস বা বাম-কংগ্রেস জোট থেকে আইএসএফের মতো দলে চলে যায়, তাহলে বিরোধী ভোট বিভক্ত হতে পারে। আর সেই বিভক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা পেতে পারে বিজেপি।
মুর্শিদাবাদসহ উত্তরবঙ্গের কিছু এলাকায় আমজনতা উন্নয়ন পার্টির মতো মুসলমানপ্রধান দলের উপস্থিতিও নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। দলটির নেতা হুমায়ুন কবিরের কিছু বক্তব্যকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বাবরি মসজিদ নির্মাণের মতো বিষয় সামনে এনে আন্দোলনের চেষ্টা হিন্দু ভোটারদের একটি অংশের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি করতে পারে। রাজনৈতিক বিজ্ঞানের ভাষায় এটি ‘পোলারাইজেশন’ বা মেরুকরণকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। মুসলমান ভোট একাধিক দলে ভাগ হলে এবং তার বিপরীতে হিন্দু ভোট একটি দলের দিকে বেশি কেন্দ্রীভূত হলে নির্বাচনী ফলাফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
এই জায়গাতেই মুসলমানপ্রধান দলগুলোর উত্থান বিজেপির জন্য একটি অপ্রত্যাশিত রাজনৈতিক সুবিধা তৈরি করতে পারে। বিজেপি যদি মুসলমান ভোট না-ও পায়, তবু তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মুসলিম ভোট ভাগ হয়ে গেলে বিজেপির জয়ের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। অর্থাৎ একটি দলকে জেতানোর জন্য সরাসরি তার ভোট বাড়তেই হবে—এমন নয়; প্রতিপক্ষের ভোট ভাগ হয়ে গেলেও নির্বাচনী সুবিধা তৈরি হতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নির্বাচনী কৌশলও এই বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৯৪ আসনের বিধানসভায় বিজেপি কোনো মুসলমান প্রার্থী দেয়নি। জাতীয় রাজনীতিতেও লোকসভার ৫৪৩ আসনের মধ্যে বিজেপির মুসলমান প্রার্থী না দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দলটি মূলত সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু ভোটের ওপর নির্ভর করে রাজনৈতিক শক্তি বাড়ানোর কৌশল অনুসরণ করছে—এমন বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
তবে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান সমাজের রাজনৈতিক আচরণকে শুধু একটি দল বা একটি মতাদর্শ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য রয়েছে, যেমন রয়েছে অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যেও। কেউ তৃণমূলের সমর্থক, কেউ বামপন্থী, কেউ কংগ্রেসের সঙ্গে, আবার কেউ নতুন মুসলমানপ্রধান দলের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে মুসলিম ভোটকে একক রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে দেখার প্রবণতাও বাস্তবতার পুরো চিত্র তুলে ধরে না।
ইতিহাসও এই পরিস্থিতিকে বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পিছিয়ে থাকার বিষয়টি নতুন নয়। ২০০৬ সালের সাচার কমিটির প্রতিবেদনেও ভারতের মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকার বিষয়টি উঠে এসেছিল। তখন পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় ছিল বামফ্রন্ট। অর্থাৎ মুসলমানদের আর্থসামাজিক দুর্বলতা কেবল সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফল নয়। তবে বর্তমান সময়ে নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, ধর্মীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নগুলো নতুন মাত্রা পেয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতি আগামী পাঁচ বছরে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। মুসলমানপ্রধান রাজনৈতিক দলগুলো যদি আরও বেশি আসনে প্রার্থী দেয়, তাহলে বিরোধী ভোটের বিভাজন বাড়তে পারে। অন্যদিকে বিজেপি যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের মেরুকরণ ধরে রাখতে পারে, তাহলে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে। একই সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস, বাম ও কংগ্রেসকে মুসলিম ভোটের পাশাপাশি বৃহত্তর সামাজিক জোট ধরে রাখার নতুন কৌশল তৈরি করতে হবে।
পশ্চিমবঙ্গের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যেও নাগরিক অধিকার ও আইনের শাসন অক্ষুণ্ন রাখা। কোনো সম্প্রদায়কে তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়তে হলে তা শুধু ওই সম্প্রদায়ের সমস্যা থাকে না; পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য তা সতর্কবার্তা হয়ে ওঠে। আবার ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ভোটের অতিরিক্ত মেরুকরণও সমাজে দীর্ঘমেয়াদি বিভাজন তৈরি করতে পারে।
অতএব পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনীতি শুধু বিজেপি বনাম তৃণমূলের লড়াই নয়। এর ভেতরে রয়েছে মুসলমান ভোটের পুনর্বিন্যাস, নতুন দলগুলোর উত্থান, হিন্দু ভোটের সম্ভাব্য মেরুকরণ, নাগরিকত্বের প্রশ্ন, সীমান্তনীতি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার বিতর্ক। এই সবকিছুর সমন্বিত ফলই আগামী দিনের পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক চিত্র নির্ধারণ করবে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠা দলগুলো যদি নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় মুসলিম ভোটকে একাধিক ভাগে বিভক্ত করে ফেলে, তাহলে তার ফল উল্টো হতে পারে। তারা হয়তো সরাসরি বিজেপির সঙ্গে লড়াই করছে, কিন্তু নির্বাচনী অঙ্কে তাদের উপস্থিতিই বিজেপির জয়কে সহজ করে দিতে পারে। ফলে পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সমাজের সামনে এখন শুধু নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার প্রশ্ন নয়, রাজনৈতিক কৌশলের প্রশ্নও বড় হয়ে উঠেছে। আর আগামী নির্বাচনে এই ভোটের বিভাজন কতটা গভীর হয়, তার ওপর নির্ভর করতে পারে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির পরবর্তী অধ্যায়।
আপনার মতামত জানানঃ