রাজধানীর মিরপুর-১-এর একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র মধ্যরাতে হামলা, লুটপাট ও ভারী যন্ত্র দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা শুধু একটি স্থাপনা ধ্বংসের খবর নয়; এটি নতুন সরকারের সামনে আইনশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে একাধিক কঠিন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারটি প্রায় পাঁচ দশক ধরে মিরপুরের নিম্নআয়ের ও সুবিধাবঞ্চিত নারী-শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছিল। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের মধ্যে ছিল প্রাথমিক চিকিৎসা, মাতৃস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা এবং শিশুদের টিকাদান। ১৯৭৪ সালে কার্যক্রম শুরু করা এই কেন্দ্রটি সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতেও বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করত।
কিন্তু বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে সেখানে যা ঘটেছে, তা পুরো ব্যবস্থাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। প্রথম আলো ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই শতাধিক মুখোশধারী ব্যক্তি সেখানে প্রবেশ করে নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে। এরপর চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, টিকা ও অন্যান্য সামগ্রী লুট করা হয়। পরে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে একটি পাকা ও তিনটি আধাপাকা স্থাপনাসহ পুরো কেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
ঘটনার পর সেখানে একটি সাইনবোর্ডও টাঙানো হয়। তাতে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর নাম উল্লেখ করা হয়। কেন্দ্রটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে ওই জমি দখলের চেষ্টা চলছিল এবং হামলাটি জমি দখলের উদ্দেশ্যেই করা হয়েছে। তবে জমি নিয়ে বিরোধ এবং কারা হামলার নেপথ্যে ছিল—এসব বিষয়ে তদন্ত এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
এখানেই রাজনৈতিক প্রশ্নটি সামনে আসে।
সংবাদ প্রতিবেদনে স্থানীয় বিএনপির দুটি পক্ষের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে জমিটি দখলের চেষ্টা করার অভিযোগের কথা এসেছে। মামলায় হানিফ মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে, যাঁকে প্রতিবেদনে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদকে ঘিরেও অভিযোগের কথা এসেছে। তবে তিনি ভাঙচুরে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন, পুলিশ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নিক।
অর্থাৎ রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আছে, কিন্তু অভিযোগ আর আদালতে প্রমাণিত দায় এক বিষয় নয়। এই পার্থক্যটিই তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তবে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নাম যখন এমন একটি ঘটনায় আসে, তখন সরকারের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়—কারণ সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্ন দাঁড়ায়, ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউ অভিযোগের মুখে পড়লে তদন্ত কি একইভাবে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ থাকবে?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।
আরেকটি বড় প্রশ্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ঘিরে। একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে শত শত মানুষ প্রবেশ করল, নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করা হলো, লুটপাট হলো এবং এরপর ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে ভবন ভেঙে ফেলা হলো। এত বড় একটি কর্মকাণ্ড রাজধানীর একটি এলাকায় কীভাবে ঘটল—এটি তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের অভিযোগ, হামলার সময় পুলিশকে খবর দেওয়া হয়েছিল। পুলিশের পক্ষ থেকেও মামলা ও তদন্তের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু একটি স্থাপনা যখন ধাপে ধাপে লুট, ভাঙচুর এবং শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ ধ্বংসের শিকার হয়, তখন শুধু ঘটনার পর মামলা করা যথেষ্ট কি না—সেটিও এখন জনআলোচনার বিষয়।
রাষ্ট্রের সক্ষমতা সাধারণত বোঝা যায় নাগরিকের বিপদে রাষ্ট্র কত দ্রুত সাড়া দেয়, তা দিয়ে। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর আসামি গ্রেপ্তার করা গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই রাষ্ট্র তার প্রতিরোধমূলক দায়িত্ব পালন করতে পারছে কি না।
মিরপুরের ঘটনাটি সেই জায়গাতেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
কারণ জমিটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ থাকার কথা সংবাদ প্রতিবেদনে এসেছে। কেন্দ্রটির কর্মকর্তারাও বলেছেন, এর আগে জমি দখলের চেষ্টা হয়েছিল। তাহলে প্রশাসনের কাছে বিষয়টি অজানা ছিল কি না, স্থানীয় পর্যায়ে কোনো সতর্কতা ছিল কি না, জমি নিয়ে চলমান বিরোধের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবগত ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।
এ ঘটনার আরেকটি নির্মম দিক হলো স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়া।
যে কেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরে নারী ও শিশুদের চিকিৎসা ও টিকাদান কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল, সেটিই এখন ধ্বংসস্তূপ। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, ঘটনার পরদিনও সেখানে শিশুদের টিকাদান কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করতে হয়েছে। অর্থাৎ স্থাপনা ধ্বংসের ক্ষতি শুধু ভবন বা যন্ত্রপাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর প্রভাব পড়েছে সরাসরি জনস্বাস্থ্যের ওপর।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে কেন্দ্রটির পক্ষ থেকে এক কোটি টাকার বেশি ক্ষয়ক্ষতির দাবি করা হয়েছে। লুট হওয়া বা নষ্ট হওয়া সামগ্রীর মধ্যে সরকারি টিকা, টিকা দেওয়ার রেজিস্টার, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, কম্পিউটার, জেনারেটর, ফ্রিজ ও অন্যান্য সামগ্রীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এই ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব হলেও একটি প্রতিষ্ঠানের বহু বছরের সেবা অবকাঠামো রাতারাতি ফিরিয়ে আনা সহজ নয়।
তবে ঘটনার পর সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়াও এসেছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, সরকার এ ধরনের ঘটনা চায় না এবং ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও তিনি জানিয়েছেন।
এরই মধ্যে তদন্তে কিছু অগ্রগতিও দেখা গেছে। ২৬ সেপ্টেম্বর শাহ আলী থানার পুলিশ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁরা অর্থের বিনিময়ে হামলায় অংশ নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন এবং তাঁদের আদালতে পাঠানো হয়েছে। আরও জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের অভিযান চলছে।
কিন্তু এখানেও প্রশ্ন থেকে যায়—যারা মাঠপর্যায়ে হামলায় অংশ নিয়েছে, তাদের গ্রেপ্তার করাই কি যথেষ্ট? নাকি এর সঙ্গে যারা পরিকল্পনা করেছে, অর্থ দিয়েছে, রাজনৈতিক বা সাংগঠনিকভাবে সহায়তা করেছে কিংবা জমি দখলের উদ্দেশ্যে ঘটনাটি ঘটিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, তাদের ভূমিকাও তদন্তে খতিয়ে দেখা হবে?
আইনের শাসনের প্রকৃত পরীক্ষা এখানেই।
কারণ কোনো অপরাধের ক্ষেত্রে শুধু দৃশ্যমান অংশগ্রহণকারীদের বিচারের আওতায় এনে পেছনের কাঠামো অদৃশ্য রেখে দিলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা ঠেকানো কঠিন হতে পারে। আবার কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে শুধু অভিযোগ ওঠার ভিত্তিতে তাকে অপরাধী হিসেবে ঘোষণা করাও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। ফলে প্রয়োজন এমন একটি তদন্ত, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, প্রমাণই হবে মূল ভিত্তি।
এখানে বিএনপি সরকারের রাজনৈতিক দায়ের প্রশ্নও স্বাভাবিকভাবেই উঠছে। একটি সরকার ক্ষমতায় থাকার অর্থ শুধু প্রশাসন পরিচালনা করা নয়; তার সঙ্গে যুক্ত থাকে আইনশৃঙ্খলা, নাগরিক নিরাপত্তা এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতা বা কর্মীদের বিরুদ্ধে যখন কোনো অপরাধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে, তখন সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা।
বিএনপির জন্যও ঘটনাটি সাংগঠনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষা। দলের কোনো স্থানীয় নেতা বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে দলীয় পরিচয় তাকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখতে পারে না—এমন বার্তা শুধু বক্তব্যে নয়, বাস্তব পদক্ষেপেও দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন। একইভাবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী ঘোষণা না করাও রাজনৈতিক ও আইনি দায়িত্বের অংশ।
এই দুইয়ের ভারসাম্যই এখন প্রয়োজন।
মিরপুরের ঘটনা তাই কেবল একটি জমি বা একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনা নয়। এটি প্রশ্ন তুলেছে—ক্ষমতার পরিবর্তনের পর প্রশাসনিক সংস্কৃতি কতটা বদলেছে? রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব থেকে স্থানীয় প্রশাসন কতটা মুক্ত? আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কি রাজনৈতিক চাপের বাইরে থেকে কাজ করতে পারছে? আর নাগরিকেরা কি নিশ্চিত হতে পারছেন যে তাঁদের প্রতিষ্ঠান, সম্পত্তি ও নিরাপত্তা রাজনৈতিক প্রভাবশালী কোনো গোষ্ঠীর ইচ্ছার ওপর নির্ভর করবে না?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সরকারের কাছ থেকেই আসতে হবে।
বিশেষ করে নতুন বিএনপি সরকারের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মানুষ সাধারণত শুধু সরকার পরিবর্তন দেখতে চায় না; তারা রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতিতেও পরিবর্তন দেখতে চায়। পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির জায়গায় যদি একই ধরনের দখল, প্রভাব, সংঘবদ্ধ হামলা কিংবা প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ ফিরে আসে, তাহলে সরকারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে পারে।
তবে এই একটি ঘটনার ভিত্তিতে পুরো সরকার বা একটি রাজনৈতিক দলের সামগ্রিক চরিত্র সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও যথাযথ হবে না। তদন্ত এখনো চলছে। চারজন গ্রেপ্তার হয়েছে। আরও গ্রেপ্তার হতে পারে। কারা পরিকল্পনাকারী, কারা অর্থ দিয়েছে, জমির প্রকৃত মালিকানা কী, হামলার পেছনে উদ্দেশ্য কী এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ কতটা সত্য—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে।
কিন্তু একটি বিষয় ইতিমধ্যেই স্পষ্ট: রাজধানীর একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র যদি রাতের আঁধারে শত শত মানুষের হামলার শিকার হয়ে ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে ঘটনাটি কোনোভাবেই সাধারণ ভাঙচুর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, স্থানীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
সরকারের সামনে এখন দুটি কাজ—প্রথমত, ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনের আওতায় আনা; দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব যেন এমন ঘটনার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পথে বাধা না হয়, তা নিশ্চিত করা।
মিরপুরের ধ্বংসস্তূপ থেকে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠে এসেছে—সরকার বদলেছে, কিন্তু রাষ্ট্রের ভেতরের ক্ষমতার সংস্কৃতি কি সত্যিই বদলেছে?
এই প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়, তদন্তের ফলাফল, দায়ীদের বিচার এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধের সক্ষমতার মধ্যেই পাওয়া যাবে।
আপনার মতামত জানানঃ