
১৯৬১ সালের ১২ আগস্ট, শনিবার রাত। বার্লিনের রেস্তোরাঁগুলো তখনো খোলা, ট্রাম ও পাতালরেল চলছিল, মানুষ সপ্তাহান্তের অবসর কাটিয়ে বাড়ি ফিরছিল। পূর্ব ও পশ্চিম বার্লিনের মধ্যকার রাজনৈতিক বিভাজন সবার জানা থাকলেও শহরের মানুষ তখনো এক অংশ থেকে অন্য অংশে যাতায়াত করতে পারতেন। কেউ পশ্চিমে কাজ করে পূর্বে ফিরতেন, কেউ আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা করতে সীমান্ত পার হতেন। একই রাস্তা, একই ট্রেনলাইন এবং একই পাড়ার মধ্য দিয়ে চলত দুই ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থার জীবন।
কয়েক ঘণ্টা পর সেই স্বাভাবিকতা আর থাকল না।
মধ্যরাতের পর পূর্ব জার্মানির পুলিশ, সীমান্তরক্ষী, সেনাসদস্য ও শ্রমিকেরা রাস্তায় নেমে পড়েন। তারা পাথর তুলে ফেলেন, ট্রামলাইন বিচ্ছিন্ন করেন, রেল যোগাযোগ বন্ধ করেন এবং পূর্ব ও পশ্চিম বার্লিনের সীমানাজুড়ে কাঁটাতার টানতে শুরু করেন। ভোর হওয়ার আগেই শহরের অসংখ্য রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়।
ঘুম থেকে উঠে বার্লিনবাসী দেখলেন—যে রাস্তা দিয়ে আগের দিনও যাতায়াত করেছেন, সেখানে সশস্ত্র প্রহরা ও কাঁটাতারের প্রতিবন্ধকতা। একই পরিবারের সদস্যরা কয়েক শ মিটার দূরে থেকেও পরস্পরের কাছে যেতে পারছেন না। কর্মস্থল, বিদ্যালয়, হাসপাতাল, গির্জা, কবরস্থান এবং আত্মীয়ের বাড়ি—সবকিছু হঠাৎ সীমান্তের অন্য পাশে চলে গেছে।
ইতিহাসে দিনটি পরিচিত বার্লিন প্রাচীর নির্মাণের দিন হিসেবে। তবে ১৩ আগস্টের সেই প্রথম রাতে পরিচিত উঁচু কংক্রিটের প্রাচীর তৈরি হয়নি। প্রথমে বসানো হয়েছিল কাঁটাতার, ব্যারিকেড ও সশস্ত্র প্রহরা। পরবর্তী দিন, মাস ও বছরে সেই অস্থায়ী প্রতিবন্ধকতাই ধাপে ধাপে রূপ নেয় কংক্রিটের দেয়াল, প্রহরী টাওয়ার, বাংকার, কুকুরের টহল এবং বিস্তৃত ‘ডেথ স্ট্রিপে’।
এক রাতেই বার্লিনের মানচিত্র বদলে গিয়েছিল। কিন্তু সেই রাতের পেছনে জমা হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী প্রায় দেড় দশকের অবিশ্বাস, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও মানুষের পশ্চিমমুখী অভিবাসনের চাপ।
পরাজিত জার্মানির ভেতরে দুই পৃথিবী
১৯৪৫ সালে নাৎসি জার্মানির পরাজয়ের পর দেশটি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও সোভিয়েত ইউনিয়নের চারটি দখল অঞ্চলে ভাগ হয়ে যায়। রাজধানী বার্লিন সোভিয়েত নিয়ন্ত্রিত এলাকার গভীরে অবস্থিত হলেও শহরটিকেও চার শক্তির মধ্যে ভাগ করা হয়েছিল।
খুব দ্রুতই সাবেক মিত্রদের সম্পর্ক শত্রুতায় পরিণত হয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল নিয়ে ১৯৪৯ সালে গঠিত হয় পশ্চিম জার্মানি বা ফেডারেল রিপাবলিক অব জার্মানি। সোভিয়েত অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয় পূর্ব জার্মানি বা জার্মান ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক—জিডিআর।
বার্লিনও কার্যত দুই অংশে বিভক্ত হয়। পশ্চিম বার্লিন পুঁজিবাদী পশ্চিমা বিশ্বের একটি দ্বীপের মতো পূর্ব জার্মানির ভেতরে অবস্থান করছিল। অন্যদিকে পূর্ব বার্লিন ছিল জিডিআরের রাজধানী ও ক্ষমতার কেন্দ্র।
দুই অংশে রাজনৈতিক ব্যবস্থা, সংবাদমাধ্যম, অর্থনীতি ও ব্যক্তিস্বাধীনতার পার্থক্য ক্রমেই স্পষ্ট হতে থাকে। পশ্চিম জার্মানি তুলনামূলক দ্রুত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার অর্জন করে। পূর্ব জার্মানিতে ক্ষমতাসীন সোশ্যালিস্ট ইউনিটি পার্টি বা এসইডি একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করে; রাষ্ট্রীয় নজরদারি, রাজনৈতিক দমন এবং যাতায়াতের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়তে থাকে।
কিন্তু বার্লিনের সীমানা তখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। পূর্ব জার্মানির অন্য সীমান্তগুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হলেও পূর্ব বার্লিন থেকে পশ্চিম বার্লিনে পৌঁছানো তুলনামূলক সহজ ছিল। পশ্চিম বার্লিনে গিয়ে সেখান থেকে পশ্চিম জার্মানিতে চলে যাওয়া যেত। শহরটি হয়ে ওঠে পূর্ব জার্মানি ত্যাগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ।
মানুষ কেন পূর্ব জার্মানি ছেড়ে যাচ্ছিল?
১৯৪৯ থেকে ১৯৬১ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ২৭ থেকে ৩০ লাখ মানুষ পূর্ব জার্মানি ছেড়ে পশ্চিমে চলে যান। তাদের বড় অংশই ছিলেন তরুণ, দক্ষ শ্রমিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক ও অন্যান্য প্রশিক্ষিত পেশাজীবী। জার্মান ফেডারেল এজেন্সি ফর সিভিক এডুকেশনের হিসাবে, এই জনস্রোত পূর্ব জার্মানির অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার জন্য অস্তিত্বগত সংকট তৈরি করেছিল।
অনেকে রাজনৈতিক নিপীড়ন ও রাষ্ট্রীয় নজরদারি থেকে মুক্তি চাইছিলেন। কারও কাছে পশ্চিম জার্মানির বেশি মজুরি ও উন্নত জীবন ছিল আকর্ষণের কারণ। তরুণদের অনেকে ব্যক্তিগত ও পেশাগত স্বাধীনতা খুঁজছিলেন। আবার কেউ পরিবার বা বন্ধুর কাছে চলে যাচ্ছিলেন।
পূর্ব জার্মান সরকার এই অভিবাসনকে পশ্চিমা ষড়যন্ত্র ও দক্ষ জনশক্তি চুরির ফল হিসেবে তুলে ধরত। কিন্তু পশ্চিমে চলে যাওয়া মানুষের সংখ্যা প্রমাণ করছিল, রাষ্ট্রটি নিজের নাগরিকদের ধরে রাখতে পারছে না। শীতল যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় এটি ছিল পূর্ব জার্মানি ও সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্য বিব্রতকর পরাজয়।
১৯৬১ সালের গ্রীষ্মে পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়ে ওঠে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ পূর্ব থেকে পশ্চিমে চলে যাচ্ছিলেন। অনেকেই বুঝতে পারছিলেন, এই পথ যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফলে সীমান্ত বন্ধ হওয়ার আশঙ্কাই অভিবাসনের গতি আরও বাড়িয়ে দেয়।
পূর্ব জার্মান নেতৃত্বের সামনে দুটি পথ ছিল—এমন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার করা, যাতে মানুষ দেশ ছাড়তে না চায়; অথবা বলপ্রয়োগ করে চলে যাওয়ার পথ বন্ধ করা। তারা দ্বিতীয় পথটি বেছে নেয়।
‘কেউ দেয়াল নির্মাণ করতে চায় না’
১৯৬১ সালের ১৫ জুন এক সংবাদ সম্মেলনে পূর্ব জার্মান নেতা ওয়াল্টার উলব্রিখট ঘোষণা করেছিলেন, “কেউ দেয়াল নির্মাণ করতে চায় না।” তখন কোনো সাংবাদিক সরাসরি দেয়াল নির্মাণের প্রশ্ন না করলেও তাঁর উত্তরে ‘দেয়াল’ শব্দটির ব্যবহার সন্দেহ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
দুই মাসেরও কম সময় পর সেই ঘোষণার বিপরীত ঘটনা ঘটে।
সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভের সম্মতি নিয়ে পূর্ব জার্মান নেতৃত্ব অত্যন্ত গোপনে সীমান্ত বন্ধের প্রস্তুতি নেয়। পরিকল্পনার কথা জানতেন হাতে গোনা কয়েকজন কর্মকর্তা। প্রয়োজনীয় কাঁটাতার, খুঁটি ও নির্মাণসামগ্রী আগে থেকেই বিভিন্ন স্থানে মজুত করা হয়। বাহিনীকে এমনভাবে প্রস্তুত রাখা হয়েছিল, যাতে সাধারণ মানুষ কিংবা পশ্চিমা গোয়েন্দারা আগাম পুরো পরিকল্পনা বুঝতে না পারে।
অভিযানের সময় হিসেবে বেছে নেওয়া হয় শনিবার গভীর রাত ও রোববারের ভোর। তখন শহরে যানবাহন ও মানুষের চলাচল কম থাকবে, সরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে এবং তাৎক্ষণিক সংগঠিত প্রতিরোধের সম্ভাবনাও কম হবে।
যে রাত শহরটিকে থামিয়ে দিয়েছিল
১২ আগস্ট মধ্যরাত পেরিয়ে ১৩ আগস্ট শুরু হওয়ার পর পূর্ব জার্মান বাহিনী সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো দখল করে। রাস্তা ও রেলপথ বন্ধ হতে থাকে। ব্রান্ডেনবুর্গ গেটের চারপাশেও সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করা হয়।
রাস্তার পাথর ও পিচ তুলে খুঁটি বসিয়ে কাঁটাতার টানা হয়। যেসব পাতাল ও নগর রেললাইন পূর্ব-পশ্চিম সীমান্ত অতিক্রম করত, সেগুলোর অনেকটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিছু পশ্চিম বার্লিনের ট্রেন পূর্ব অংশের স্টেশনে না থেমে অন্ধকার প্ল্যাটফর্ম অতিক্রম করত। এসব স্টেশন পরে ‘ভূতুড়ে স্টেশন’ নামে পরিচিত হয়।
সকালে কাজে বেরিয়ে অনেকে বুঝতে পারেন, তাঁদের কর্মস্থল এখন সীমান্তের ওপারে। কোনো চিকিৎসক তাঁর হাসপাতাল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন, কোনো শিশু স্কুল থেকে, কেউ মা-বাবা কিংবা জীবনসঙ্গীর কাছ থেকে।
অনেক বাড়ির সামনের দরজা পূর্ব বার্লিনে হলেও জানালা খুলত পশ্চিম বার্লিনের দিকে। বিশেষ করে বার্নাউয়ার স্ট্রাসেতে বিভাজনের নাটকীয়তা ছিল ভয়াবহ। বাড়িগুলো পূর্ব অংশে, কিন্তু সামনের ফুটপাত ছিল পশ্চিমে। প্রথম কয়েক দিনে মানুষ জানালা দিয়ে লাফিয়ে পশ্চিমে পালানোর চেষ্টা করেন। নিচে পশ্চিম বার্লিনের দমকলকর্মীরা জাল ধরে তাঁদের উদ্ধারের চেষ্টা করতেন। পরে পূর্ব জার্মান কর্তৃপক্ষ জানালা ইট দিয়ে বন্ধ করে দেয় এবং সীমান্তসংলগ্ন অনেক বাড়ি খালি করে ভেঙে ফেলে।
বার্লিন ওয়াল ফাউন্ডেশনের বিবরণে, বার্নাউয়ার স্ট্রাসে এমন একটি স্থান, যেখানে প্রাচীর শুধু ভূখণ্ড নয়—পরিবার, বন্ধুত্ব ও দৈনন্দিন জীবনকে কীভাবে ধ্বংস করেছিল, তা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
পশ্চিমারা কেন বাধা দিল না?
পশ্চিম বার্লিনবাসীর অনেকে আশা করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স হয়তো কাঁটাতার সরাতে ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু পশ্চিমা শক্তিগুলো সামরিক হস্তক্ষেপ করেনি।
এর কারণ ছিল পরমাণু যুদ্ধের ভয়। পশ্চিমা মিত্ররা পশ্চিম বার্লিনে নিজেদের উপস্থিতি ও প্রবেশাধিকারকে রক্ষা করতে প্রস্তুত ছিল, কিন্তু পূর্ব জার্মান নাগরিকদের পশ্চিমে যাওয়ার পথ খোলা রাখার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ শুরু করতে রাজি ছিল না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির প্রশাসন দেয়ালকে মানবিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয় হিসেবে দেখলেও হিসাব করেছিল—একটি প্রাচীর যুদ্ধের চেয়ে ভালো। সীমান্ত বন্ধ হওয়া সোভিয়েত ও পূর্ব জার্মান দুর্বলতারই প্রমাণ; কারণ যে রাষ্ট্রকে নাগরিকদের ভেতরে রাখতে দেয়াল নির্মাণ করতে হয়, সে নৈতিক প্রতিযোগিতায় ইতিমধ্যেই পিছিয়ে আছে।
পশ্চিমা নিষ্ক্রিয়তা পশ্চিম বার্লিনে হতাশা সৃষ্টি করেছিল। শহরের মেয়র উইলি ব্রান্ট আরও কঠোর প্রতিক্রিয়া চেয়েছিলেন। তবু পশ্চিমা শক্তি প্রতিবাদ ও সামরিক উপস্থিতি জোরদার করার মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখে।
অক্টোবর ১৯৬১ সালে চেকপয়েন্ট চার্লিতে মার্কিন ও সোভিয়েত ট্যাংক মুখোমুখি অবস্থান নেয়। কয়েক ঘণ্টার জন্য পৃথিবী আরেকটি বড় যুদ্ধের কাছাকাছি চলে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষ ধীরে ধীরে ট্যাংক সরিয়ে নেয়। প্রাচীর থেকে যায়।
কাঁটাতার থেকে ‘ডেথ স্ট্রিপ’
প্রথম রাতের কাঁটাতার দ্রুত কংক্রিটের প্রতিবন্ধকে রূপান্তরিত হয়। বছরের পর বছর ধরে সীমান্তব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হয়। শেষ পর্যায়ের বার্লিন প্রাচীর শুধু একটি দেয়াল ছিল না; এটি ছিল বহুস্তরীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা।
পশ্চিমের দিকে দৃশ্যমান কংক্রিটের দেয়ালের পেছনে ছিল খালি বালুময় এলাকা, যানবাহন প্রতিরোধক, আলো, অ্যালার্ম, প্রহরী টাওয়ার, টহলপথ এবং পূর্ব অংশের আরেকটি অভ্যন্তরীণ দেয়াল। মাঝের এলাকাটি পরিচিত হয় ‘ডেথ স্ট্রিপ’ হিসেবে। পালানোর চেষ্টা শনাক্ত করতে বালুর ওপর পদচিহ্নও পর্যবেক্ষণ করা হতো।
বার্লিনের চারপাশে এই সীমান্তব্যবস্থার দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১৫৫ কিলোমিটার। এটি শহরকে দুই ভাগ করার পাশাপাশি পুরো পশ্চিম বার্লিনকে পূর্ব জার্মানির ভূখণ্ড থেকে ঘিরে রেখেছিল।
তারপরও মানুষ পালানোর চেষ্টা বন্ধ করেনি। কেউ সুড়ঙ্গ খুঁড়েছেন, কেউ ভবনের ছাদ থেকে দড়ি টেনেছেন, কেউ পরিবর্তিত গাড়ির গোপন জায়গায় লুকিয়েছেন। হট-এয়ার বেলুন, ছোট উড়োজাহাজ এবং নিজ হাতে বানানো যন্ত্র ব্যবহার করেও পালানোর চেষ্টা হয়েছে।
অনেক চেষ্টা সফল হয়েছিল; অনেকের জন্য শেষ হয়েছিল গ্রেপ্তার, কারাবাস বা মৃত্যুতে।
বার্লিন ওয়াল ফাউন্ডেশনের গবেষণা অনুযায়ী, প্রাচীর ও পূর্ব জার্মান সীমান্তব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনায় অন্তত ১৪০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এ ছাড়া সীমান্ত পারাপারের তল্লাশির সময় বা পরে অন্তত ২৫১ জন যাত্রীর মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে ১৮ বছর বয়সী পিটার ফেখটার অন্যতম পরিচিত নাম। ১৯৬২ সালে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তিনি সীমান্তের কাছে পড়ে থেকে রক্তক্ষরণে মারা যান—দুই পাশের মানুষ অসহায়ের মতো তা দেখেছিল।
২৮ বছর পর দেয়ালের পতন
প্রাচীর পূর্ব জার্মানির জনস্রোত সাময়িকভাবে থামিয়ে দিয়েছিল এবং রাষ্ট্রটিকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে কিছুটা স্থিতিশীল হতে সাহায্য করেছিল। কিন্তু এটি শাসনব্যবস্থার মৌলিক দুর্বলতা দূর করতে পারেনি।
১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নে মিখাইল গর্বাচেভের সংস্কার, পূর্ব ইউরোপে গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং পূর্ব জার্মানিতে বাড়তে থাকা বিক্ষোভ পরিস্থিতি বদলে দেয়। হাঙ্গেরি ও চেকোস্লোভাকিয়ার পথ ব্যবহার করে বিপুলসংখ্যক পূর্ব জার্মান নাগরিক পশ্চিমে যেতে শুরু করেন।
৯ নভেম্বর ১৯৮৯ রাতে পূর্ব জার্মান কর্মকর্তা গুন্টার শাবোভস্কি ভ্রমণবিধি শিথিল করার একটি সিদ্ধান্ত ভুল ও অস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন। সাংবাদিকেরা জানতে চান, সিদ্ধান্তটি কখন থেকে কার্যকর। কাগজপত্র ঠিকমতো না দেখে তিনি বলেন, তাঁর জানা মতে তা অবিলম্বে কার্যকর।
খবর ছড়িয়ে পড়তেই হাজার হাজার মানুষ সীমান্তচৌকিতে ভিড় করেন। সীমান্তরক্ষীরা কোনো স্পষ্ট নির্দেশ পাচ্ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত জনতার চাপ সামলাতে গেট খুলে দেওয়া হয়। পূর্ব ও পশ্চিম বার্লিনের মানুষ দেয়ালের ওপর উঠে একে অপরকে আলিঙ্গন করেন। কেউ হাতুড়ি দিয়ে কংক্রিট ভাঙতে শুরু করেন।
১৩ আগস্ট ১৯৬১-এর রাতে যে বিভাজন কাঁটাতারের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল, ৯ নভেম্বর ১৯৮৯-এ তা মানুষের সম্মিলিত উপস্থিতির সামনে ভেঙে পড়ে।
দেয়ালটি আসলে কাকে বন্দী করেছিল?
পূর্ব জার্মান সরকার বার্লিন প্রাচীরকে বলত ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রতিরক্ষা প্রাচীর’। তাদের ভাষ্য ছিল, পশ্চিমা গুপ্তচর, ষড়যন্ত্রকারী ও সামরিক হুমকি থেকে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে রক্ষা করতেই এটি প্রয়োজন।
কিন্তু প্রাচীরের প্রকৃত বিন্যাস অন্য কথা বলত। এর প্রতিরক্ষা পশ্চিমের মানুষকে পূর্বে ঢোকা থেকে বিরত রাখার চেয়ে পূর্বের মানুষকে পশ্চিমে যেতে বাধা দেওয়ার জন্য তৈরি হয়েছিল। বন্দুক, প্রহরী ও ‘ডেথ স্ট্রিপ’ সবই ছিল নিজের নাগরিকদের মুখোমুখি।
এ কারণেই বার্লিন প্রাচীর শুধু শীতল যুদ্ধের স্মারক নয়। এটি এমন রাষ্ট্রের প্রতীক, যে নাগরিকের আনুগত্য অর্জনের বদলে তার চলে যাওয়ার পথ বন্ধ করে দেয়।
জার্মান সরকারের স্মৃতিচারণে ১৩ আগস্টকে এমন একটি অন্ধকার দিন বলা হয়েছে, যেদিন রাতারাতি পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়েছিল এবং মানুষের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
এক রাতের অভিযানে কোনো শহরের পরিচিত পথ বন্ধ করা যায়, তার ভূখণ্ড ভাগ করা যায় এবং বন্দুকের মুখে মানুষের চলাচল থামানো যায়। কিন্তু দেয়াল দিয়ে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা যায় না।
বার্লিন প্রাচীর সেই সত্যেরই কংক্রিটে লেখা ইতিহাস।
আপনার মতামত জানানঃ