বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় সাম্প্রতিক সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। দেশের আরও পাঁচটি সিটি করপোরেশনে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার, এবং এ নিয়োগের একটি বিশেষ দিক হলো—নিয়োগ পাওয়া সবাই রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪-এর ধারা অনুযায়ী এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রশাসনিক কাঠামো, স্থানীয় রাজনীতি এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনী পরিবেশ—সবকিছু নিয়েই নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
গত শনিবার স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, দেশের পাঁচটি সিটি করপোরেশনে পূর্ণকালীন প্রশাসক হিসেবে পাঁচজন ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই সিটি করপোরেশনগুলো হলো বরিশাল, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, রংপুর এবং কুমিল্লা। নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসকরা হলেন—বরিশাল সিটি করপোরেশনে অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন, রাজশাহী সিটি করপোরেশনে মো. মাহফুজুর রহমান, ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে মো. রুকুনোজ্জামান রোকন, রংপুর সিটি করপোরেশনে মাহফুজ উন নবী চৌধুরী এবং কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে মো. ইউসুফ মোল্লা। তারা সবাই বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা হিসেবে পরিচিত।
প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪-এর ধারা ২৫ক-এর উপধারা (১) অনুযায়ী এই নিয়োগ কার্যকর হয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, প্রশাসকরা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিজ নিজ সিটি করপোরেশনের পূর্ণকালীন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তারা ধারা ২৫ক-এর উপধারা (৩) অনুযায়ী মেয়রের ক্ষমতা প্রয়োগ এবং মেয়রের দায়িত্ব পালন করবেন। অর্থাৎ নির্বাচিত মেয়র না থাকলেও প্রশাসকরা কার্যত মেয়রের মতো করেই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবেন।
নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয়ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং বরিশাল বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা। রাজশাহীর প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমান রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্যসচিব। রংপুর সিটির প্রশাসক মাহফুজ উন নবী চৌধুরী রংপুর মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব এবং কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি নতুন নয়, তবে একই রাজনৈতিক দলের একাধিক নেতাকে একই সময় বিভিন্ন সিটি করপোরেশনে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করতে পারে। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ভারসাম্য, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন ধরনের সমীকরণ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের সিটি করপোরেশনগুলো সাধারণত নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলরদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কিন্তু বিভিন্ন কারণে কখনো কখনো মেয়রের পদ শূন্য হলে বা আইনি জটিলতা দেখা দিলে সরকার প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে সাময়িকভাবে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম পরিচালনা করে। প্রশাসকরা তখন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং নগর সেবাগুলো পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন।
সাম্প্রতিক এই নিয়োগের আগে সরকার ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ দেশের ছয়টি সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছিল। গত ২২ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে সেই প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ফলে নতুন পাঁচজন প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে বর্তমানে দেশের মোট ১১টি সিটি করপোরেশনে প্রশাসক দায়িত্ব পালন করছেন। অর্থাৎ দেশের অধিকাংশ বড় শহরের স্থানীয় সরকার কাঠামো এখন নির্বাচিত মেয়রের পরিবর্তে প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
তবে এই প্রেক্ষাপটে একটি ব্যতিক্রম হলো চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। সেখানে আদালতের আদেশ অনুযায়ী বিএনপি নেতা শাহাদাত হোসেন মেয়রের দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে দেশের অন্য সিটি করপোরেশনগুলোর তুলনায় চট্টগ্রামে পরিস্থিতি ভিন্ন। আদালতের এই সিদ্ধান্ত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় বিচার বিভাগের ভূমিকার একটি উদাহরণ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে সরকার দ্রুত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং নগর ব্যবস্থাপনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে প্রশাসক দ্বারা সিটি করপোরেশন পরিচালিত হলে স্থানীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোর প্রশ্নও সামনে আসে। কারণ সিটি করপোরেশন মূলত স্থানীয় জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার কথা।
বাংলাদেশে নগরায়নের গতি দ্রুত বাড়ছে। শহরের জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, যানজট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি সরবরাহ ও ড্রেনেজ সমস্যার মতো নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সিটি করপোরেশনগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে প্রশাসকদের দায়িত্বও কম নয়। তাদেরকে একদিকে নগর সেবার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে, অন্যদিকে উন্নয়ন কার্যক্রমও সচল রাখতে হবে।
স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতিতেও এই নিয়োগ নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। বিএনপি নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হওয়ায় দলটির স্থানীয় সংগঠনগুলো নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে বলে অনেকের ধারণা। একই সঙ্গে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। স্থানীয় রাজনীতির ভারসাম্য, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনী প্রস্তুতির ওপর এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়তে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আরেকটি মত হলো, প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে অনেক সময় সরকার স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করতে পারে। কারণ নির্বাচিত মেয়রদের তুলনায় প্রশাসকরা সরাসরি সরকারের নীতিমালা অনুসরণ করে কাজ করেন। ফলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দ্রুততা আসতে পারে।
তবে একই সঙ্গে অনেকেই মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হলে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমেই নগর পরিচালনা করা উচিত। কারণ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা সরাসরি জনগণের কাছে জবাবদিহি করেন এবং স্থানীয় সমস্যাগুলো সম্পর্কে তাদের অভিজ্ঞতাও বেশি থাকে।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন প্রশাসকদের সামনে বড় একটি চ্যালেঞ্জ হলো নগর সেবার মান উন্নত করা এবং নাগরিকদের আস্থা অর্জন করা। শহরের মানুষ সাধারণত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, রাস্তা, পানি সরবরাহ, ড্রেনেজ এবং যানজটের মতো সমস্যার দ্রুত সমাধান প্রত্যাশা করে। প্রশাসকদের কার্যক্রম যদি নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে, তবে এই নিয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে ইতিবাচক মূল্যায়নও দেখা যেতে পারে।
সব মিলিয়ে দেশের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সিটি করপোরেশনে নতুন প্রশাসক নিয়োগ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতার একটি প্রতিফলনও বটে। আগামী দিনে এই প্রশাসকরা কীভাবে দায়িত্ব পালন করেন এবং নগর ব্যবস্থাপনায় কী ধরনের পরিবর্তন আনতে পারেন—তা এখন দেখার বিষয়।
আপনার মতামত জানানঃ