
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে আবারও এক বড় অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ইরান। ২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বহুজাতিক বাহিনীর অভিযান শুরুর দুই দশকেরও বেশি সময় পর এবার ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধ এখন দ্বিতীয় সপ্তাহে পৌঁছেছে। ইরানের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রয়েছে। তবে যুদ্ধের সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্নও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত লক্ষ্য আসলে কী?
যুদ্ধ শুরুর দিন থেকেই পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টাতে শুরু করে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের হামলা শুরু হওয়ার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো রিসোর্টে অবস্থান করছিলেন এবং সেখান থেকেই পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। এরপর কয়েক দিনের মধ্যেই মার্কিন বাহিনী ইরানের প্রায় দুই হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। এসব হামলার মধ্যে ছিল সামরিক ঘাঁটি, পারমাণবিক স্থাপনা, তেল শোধনাগার, পানি শোধনকেন্দ্র এবং বিভিন্ন অবকাঠামো। হামলার এক পর্যায়ে তেহরানে আঘাতে নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। প্রায় ৩৭ বছর ধরে তিনি দেশটির নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন এবং এর আগে ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
হামলার ফলে ইরানে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে। এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ১ হাজার ২০০–এর বেশি ইরানি নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এর মধ্যে একটি স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৬০টির বেশি শিশু নিহত হওয়ার ঘটনাটি আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানও বসে থাকেনি। তেহরান থেকে ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের দিকে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে এবং হাজার হাজার ড্রোন পাঠানো হয়েছে। ইরান ঘোষণা করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত সামরিক ঘাঁটি, জ্বালানি অবকাঠামো, মার্কিন দূতাবাস এবং বেসামরিক স্থাপনাও তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। সংঘাতের এই পর্যায়ে সাতজন মার্কিন সেনার মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে।
যুদ্ধের শুরু থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্যে এক ধরনের দ্বৈততা দেখা গেছে। কখনো তিনি সমঝোতার কথা বলেছেন, আবার কখনো ইরানকে ধ্বংস করার হুমকি দিয়েছেন। এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের কারণে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ট্রাম্প আসলে কীভাবে এই যুদ্ধ শেষ করতে চান, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা এখনো সামনে আসেনি। ট্রাম্প প্রশাসন কখনো সরাসরি ইরানে শাসকগোষ্ঠী পরিবর্তনের লক্ষ্য ঘোষণা করেনি, কিন্তু অনেক বিশ্লেষকের মতে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপে সেই ইঙ্গিত স্পষ্ট।
পাকিস্তান-চায়না ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক মুস্তফা হায়দার সায়েদ মনে করেন, হামলার পেছনে একটি বড় কৌশল ছিল। তাঁর মতে, এই আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল ইরানের ক্ষমতাকাঠামোকে ভেঙে দেওয়া এবং এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা যাতে শাসনব্যবস্থা দ্রুত আত্মসমর্পণে বাধ্য হয় অথবা দেশের ভেতরে গণবিদ্রোহ শুরু হয়। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি তেমনভাবে গড়ায়নি। অনেক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হলেও ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের মূল প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়ার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ এখনো দেখা যায়নি।
দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুহানাদ সেলুমের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপে একটি অঘোষিত কৌশল কাজ করেছে। ধারণা ছিল, যদি ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে দ্রুত সরিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে পুরো শাসনব্যবস্থা হয় ধসে পড়বে অথবা এতটাই দুর্বল হয়ে পড়বে যে নতুন কোনো রাজনৈতিক কাঠামো সহজে প্রতিষ্ঠা করা যাবে। কিন্তু খামেনি নিহত হওয়ার পরও ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়েনি।
খামেনির মৃত্যুর পর ইরান দ্রুত তাঁর উত্তরসূরি ঘোষণা করে। রোববার দেশটি জানায়, খামেনির ৫৬ বছর বয়সী ছেলে আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেবেন। তেহরানে তাঁর সমর্থনে শোভাযাত্রাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই পদক্ষেপকে অনেক বিশ্লেষক যুক্তরাষ্ট্রের চাপের সরাসরি প্রত্যাখ্যান হিসেবে দেখছেন। কারণ ট্রাম্প এর আগে স্পষ্টভাবে বলেছিলেন যে তিনি মোজতবা খামেনিকে গ্রহণযোগ্য নেতা হিসেবে মনে করেন না।
যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসির সদস্যদের অস্ত্র নামিয়ে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাদের দায়মুক্তির প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে ইরানের কূটনীতিকদের পক্ষ পরিবর্তনের আহ্বান জানানো হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে এর কোনো ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। বরং আইআরজিসি এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের পাল্টা আক্রমণে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ইরানি কূটনীতিকেরাও একটি প্রকাশ্য চিঠিতে ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছেন যে তারা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ।
সেলুম মনে করেন, বোমা হামলা চলতে থাকলে এ ধরনের আলোচনার রাজনৈতিক সুযোগই থাকে না। কারণ যখন একটি দেশকে সরাসরি আক্রমণ করা হচ্ছে, তখন সেই দেশের ভেতরে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ তৈরি করা খুব কঠিন হয়ে যায়।
যুদ্ধের আরেকটি ঘোষিত লক্ষ্য হিসেবে ট্রাম্প ও তাঁর সহযোগীরা বারবার বলেছেন যে তারা ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করতে চান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইতিমধ্যে ইরানের নৌবাহিনী এবং বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এমনকি শ্রীলঙ্কার উপকূলের কাছেও একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজে হামলার খবর পাওয়া গেছে। দুই দেশই দাবি করেছে যে তারা এখন ইরানের আকাশসীমা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু সামরিক শক্তি ব্যবহার করে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়।
যুদ্ধ শুরুর পর ট্রাম্প ইরানের জনগণের উদ্দেশে একটি বার্তাও দেন। তিনি বলেন, যুদ্ধ শেষ হলে ইরানের জনগণকেই তাদের দেশের সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হবে। তাঁর মতে, যুদ্ধ-পরবর্তী ইরানে নেতৃত্ব অবশ্যই দেশের ভেতর থেকেই আসা উচিত। এই বক্তব্যের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী ইরানের সাবেক শাহর ছেলে রেজা পাহলভির ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়। বহু বছর ধরে তিনি আশা করছেন যে একদিন ইরানে ফিরে গিয়ে নেতৃত্ব দেবেন।
তবে ট্রাম্প একই সঙ্গে বলেছেন যে ইরানে কে নেতা হবে সে বিষয়ে তাঁরও মতামত থাকা উচিত। ৬ মার্চ ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ইরানের শাসকদের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে হবে, নইলে কোনো চুক্তি হবে না। তাঁর মতে, আত্মসমর্পণের পর গ্রহণযোগ্য নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করা প্রয়োজন।
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের আরেকটি পরিকল্পনার কথাও আলোচনায় এসেছে। বলা হচ্ছে, ইরানের সামরিক প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা চালাতে কুর্দি বাহিনীকে কাজে লাগানোর চিন্তা করছে যুক্তরাষ্ট্র, যাতে ইরানের ভেতরে বড় ধরনের বিদ্রোহের পথ তৈরি হয়। ইরাকের কুর্দি গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ভালো হলেও বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, কুর্দি যোদ্ধাদের ইরানের ভেতরে পাঠানো অত্যন্ত জটিল একটি কাজ হবে এবং তা পুরো অঞ্চলে আরও উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।
অন্যদিকে ইরান পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে যে তারা আত্মসমর্পণ করবে না এবং বোমা হামলার মধ্যে কোনো আলোচনা হবে না। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি স্থল হামলা চালায়, তার জন্যও ইরান প্রস্তুত। যদিও এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র স্থল সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়নি, তবে সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া হয়নি।
বিশ্লেষকেরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ইরাক ও আফগানিস্তানের দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলেছে। নিউ লাইন্স ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড পলিসির জ্যেষ্ঠ পরিচালক কামরান বোখারি বলেন, ট্রাম্প দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নিয়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। সেই বাস্তবতায় ইরানে স্থল যুদ্ধ শুরু করা তাঁর জন্য রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
এই সংঘাতে ইসরায়েলের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে তাদের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের গালফ স্টাডিজ সেন্টারের পরিচালক মাহবুব জোয়েইরির মতে, বর্তমান যুদ্ধ আসলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্র পুনর্গঠনের একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। তাঁর মতে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর থেকেই এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
জোয়েইরি বলেন, ইসরায়েল এখন সম্ভাব্য সব প্রতিপক্ষকে দুর্বল করে দিতে চায়, যাতে ভবিষ্যতে কেউ তাদের নিরাপত্তাকে চ্যালেঞ্জ করতে না পারে। এই তালিকায় ইরান অন্যতম প্রধান প্রতিপক্ষ।
এদিকে কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা অধ্যয়নবিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রিয়াস ক্রিগ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হতে পারে ইরানকে সমঝোতার টেবিলে বসতে বাধ্য করা। তাঁর মতে, স্থল যুদ্ধ চালানো বাস্তবসম্মত বিকল্প নয়। বরং ওয়াশিংটন যদি ইরানের শাসকগোষ্ঠীর কিছু অংশের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও পারমাণবিক কার্যক্রমে কিছু সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে পারে, তাহলে ট্রাম্প রাজনৈতিকভাবে এটিকে সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করতে পারবেন।
মুস্তফা হায়দার সায়েদের মতে, ট্রাম্পের বাস্তববাদী রাজনৈতিক মানসিকতা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি মনে করেন, ট্রাম্প হয়তো এমন একটি চুক্তির দিকে এগোতে চাইবেন যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করতে পারবে যে তাদের লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে এবং যুদ্ধ শেষ করার সময় এসেছে। এমনকি তিনি নতুন একটি বিজয়ের বয়ানও তৈরি করতে পারেন—যেখানে বলা হবে খামেনি নিহত হয়েছেন, ইরানের সামরিক শক্তি দুর্বল হয়েছে, তাই যুদ্ধ শেষ করা যুক্তিযুক্ত।
তবে যদি পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে এবং স্থল অভিযান শুরু হয়, তাহলে তা ট্রাম্পের জন্য অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাঁর দলকেও মূল্য দিতে হতে পারে। ফলে যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে সামরিক সংঘর্ষের বাইরে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশও এই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।
আপনার মতামত জানানঃ