
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে চলমান সামরিক উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে বৈশ্বিক পরিবহন ব্যবস্থা, আকাশপথ এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশের জন্য এই সংঘাত বিশেষ উদ্বেগের কারণ, কারণ দেশের শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স প্রবাহের বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। ফলে যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরেই শ্রম অভিবাসন বাংলাদেশের লাখো পরিবারের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। রপ্তানির পর রেমিট্যান্স দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দ্বিতীয় বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। ২০০০ সালের পর থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ দ্রুত বেড়েছে এবং একসময় এটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছেছিল। একই সঙ্গে এটি প্রতিবছর সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রায় ১ থেকে ১ দশমিক ৫ শতাংশ অবদান রাখে। রেমিট্যান্স গ্রামীণ অর্থনীতি, পারিবারিক ভোগব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং পরিশোধ ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তবে চলমান সংঘাত ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যাতায়াত ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলেছে। প্রায় ৩৩৫টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে এবং বাংলাদেশ থেকে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সংযোগকারী বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রুট সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে অনেক প্রবাসী কর্মী যারা ছুটিতে দেশে এসেছিলেন, তারা কবে আবার কাজে ফিরতে পারবেন তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। অন্যদিকে বিপুল অর্থ ব্যয় করে বিদেশে চাকরি নিশ্চিত করা অনেক নতুন অভিবাসীও এখন আটকে পড়েছেন।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, এই পরিস্থিতি বিশেষ করে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া শ্রমিকদের জন্য অত্যন্ত কঠিন। অনেক শ্রমিক বিদেশে যাওয়ার জন্য নিয়োগপ্রক্রিয়া, ভিসা ও যাতায়াত বাবদ প্রায় ৩ লাখ থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করেন। যদি তাদের যাত্রা বিলম্বিত হয় এবং ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়, তাহলে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান অন্য দেশ থেকে শ্রমিক নিয়ে নিতে পারে। এতে ওই শ্রমিকরা ঋণের বোঝা নিয়ে দেশে আটকে পড়বেন এবং বিদেশে কাজের সুযোগ হারাবেন।
বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসন ব্যবস্থা মূলত নিয়মিত যাতায়াতের ওপর নির্ভরশীল। প্রবাসী কর্মীরা সাধারণত অল্প সময়ের ছুটিতে দেশে আসেন এবং দ্রুত কর্মস্থলে ফিরে যান যাতে তাদের চাকরির চুক্তি বজায় থাকে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা থাকলে অনেক কর্মী তাদের চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
২০২৫ সালে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৩২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, যা একটি রেকর্ড পরিমাণ। এর মধ্যে প্রায় ৪৭ শতাংশই এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫ অনুযায়ী, ওই অর্থবছর পর্যন্ত ৮ দশমিক ৬ মিলিয়ন বাংলাদেশি বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৪৮ শতাংশ শ্রমিক কাজ পেয়েছেন সৌদি আরবে। সামগ্রিকভাবে সৌদি আরব, ওমান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক কর্মসংস্থানের প্রায় ৭৫ শতাংশই হয়।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে প্রবাসী কর্মীরা টাকা পাঠাতে পারবেন কি না—তা নয়; বরং তারা নিয়মিত আয় করতে পারবেন কি না। যদি নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে অর্থনৈতিক কার্যক্রম ধীর হয়ে যায় বা বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে অনেক শ্রমিকের আয় কমে যেতে পারে বা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
তিনি বলেন, এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করা শ্রমিকদের ক্ষেত্রে। অনেক বাংলাদেশি ছোট দোকান, নির্মাণকাজ, পরিবহন সেবা বা অস্থায়ী শ্রমভিত্তিক কাজে যুক্ত। এসব ক্ষেত্রে কর্মীরা সাধারণত দৈনিক বা সাপ্তাহিক ভিত্তিতে পারিশ্রমিক পান এবং তাদের চাকরির নিরাপত্তা খুব সীমিত।
মুনীর আরও বলেন, যদি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরগতিতে চলে বা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে কর্মীদের আয় তাৎক্ষণিকভাবে কমে যায় এবং এর ফলে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স প্রবাহও কমে যেতে পারে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন এবং সৌদি আরবের কিছু অঞ্চলে এই ঝুঁকি বেশি।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এই ধরনের আয়ের ধাক্কা ধীরে ধীরে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ রেমিট্যান্সের অর্থ দিয়ে অনেক পরিবার তাদের দৈনন্দিন খরচ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং ছোটখাটো বিনিয়োগ পরিচালনা করে।
বাংলাদেশের প্রায় ২০ থেকে ২৫টি জেলা এমন রয়েছে যেখানে স্থানীয় অর্থনীতি অনেকাংশে রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল। রেমিট্যান্স কমে গেলে স্থানীয় ব্যবসা, বাড়িঘর নির্মাণ এবং কৃষি খাতে ব্যয় কমে যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যা রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি রেমিট্যান্সের ওপরও নির্ভরশীল।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বৈশ্বিক তেলের বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। বাংলাদেশ যেহেতু তার অধিকাংশ জ্বালানি আমদানি করে, তাই তেলের দাম বাড়লে দেশের আমদানি ব্যয়ও বাড়ে। এতে বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি পায় এবং উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বেড়ে গিয়ে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
তবে তেলের দাম ও মধ্যপ্রাচ্যের কর্মসংস্থানের সম্পর্ক সবসময় সরল নয়। অতীতে দেখা গেছে, তেলের দাম বাড়লে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েতের মতো দেশগুলোর সরকারি রাজস্বও বেড়ে যায়। তখন তারা অবকাঠামো উন্নয়ন ও বড় প্রকল্পে বেশি ব্যয় করে, যা বিদেশি শ্রমিকদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে।
আসিফ মুনীর বলেন, যদি তেলের দাম বেশি থাকে কিন্তু সংঘাত বড় আকারে না বাড়ে, তাহলে উপসাগরীয় দেশগুলোর সরকার উন্নয়ন ব্যয় বাড়াতে পারে। এতে বাংলাদেশিসহ বিদেশি শ্রমিকদের জন্য নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে।
তবে স্বল্পমেয়াদে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছেন অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা। নিরাপত্তা বিধিনিষেধ, ব্যবসা বন্ধ বা কার্যক্রম কমে যাওয়ার কারণে তারা সহজেই আয়ের উৎস হারাতে পারেন। আনুষ্ঠানিক চাকরিজীবীদের মতো তাদের অনেক সময় কাজ বন্ধ থাকলেও বেতন পাওয়া যায় না। ফলে বর্তমান সংকটে তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার বলেন, রেমিট্যান্সের ওপর যুদ্ধের প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করবে সংঘাত কতদিন স্থায়ী হয় এবং পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয় তার ওপর।
সেলিম রায়হান বলেন, যদি অর্থনৈতিক কার্যক্রম ধীর হয়ে যায়, তাহলে প্রবাসী বাংলাদেশিরা চাকরি বা আয়ের ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। স্বল্পমেয়াদে অনিশ্চয়তার কারণে কিছু শ্রমিক তাদের সঞ্চিত অর্থ দেশে পাঠিয়ে দিতে পারেন, ফলে সাময়িকভাবে রেমিট্যান্স বাড়তেও পারে। তবে এটিকে ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
তিনি আরও সতর্ক করেন যে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অর্থনীতি সংকুচিত হতে পারে। তখন বিদেশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাবে। অনেক প্রবাসী কর্মী দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হতে পারেন এবং তখন দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও কর্মসংস্থানের চাপ বাড়বে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, এই সংকট দুটি বড় গোষ্ঠীকে প্রভাবিত করছে। একদিকে রয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যে ইতোমধ্যে কর্মরত শ্রমিকরা, অন্যদিকে রয়েছেন যারা বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
তিনি বলেন, অনেক শ্রমিক ছুটিতে দেশে এসে এখন আটকে পড়েছেন, কারণ ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। আবার অনেকের মেডিকেল পরীক্ষা ও অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষ হলেও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তাদের বিদেশ যাওয়া স্থগিত হয়ে গেছে।
ফখরুল ইসলাম আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের অনেক কোম্পানি তাদের কার্যক্রম ধীরগতিতে পরিচালনা করছে বা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। কোম্পানি যদি কাজ না চালায়, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের বেতনও দেওয়া হয় না। ফলে তাদের আয় কমে যায় এবং তারা বাংলাদেশে টাকা পাঠাতে পারেন না।
তিনি মনে করেন, এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের উচিত বিকল্প শ্রমবাজার খুঁজে বের করা। বিশেষ করে পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশ এবং ইউরোপের নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশে শ্রমবাজার সম্প্রসারণের সুযোগ খোঁজা যেতে পারে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপর অনিশ্চয়তার ছায়া ফেলেছে। স্বল্পমেয়াদে এর প্রভাব সীমিত থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শ্রমবাজার বৈচিত্র্য করা, নতুন অভিবাসন গন্তব্য তৈরি করা এবং প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষার ব্যবস্থা জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।
আপনার মতামত জানানঃ