আদালত আর হাসপাতাল—মানুষের কষ্ট ও দুর্ভোগের সবচেয়ে স্পষ্ট চিত্র দেখতে হলে এই দুই জায়গায় আসতে হয়—এমন কথাটি দীর্ঘদিন ধরে সমাজে প্রচলিত। ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বারান্দায় বসে থাকা অসংখ্য নারী ও তাঁদের স্বজনদের মুখের দিকে তাকালে সেই কথার সত্যতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আদালতের কক্ষের ভেতরে জায়গা না হওয়ায় অনেকে বারান্দায় বেঞ্চে বসে মামলার ডাকের অপেক্ষায় থাকেন। প্রত্যেকটি ডাক যেন একেকটি দুঃসহ স্মৃতি, একেকটি সংগ্রামের গল্প। বিচারকের সামনে দাঁড়িয়ে কেউ কাঁপা গলায় কথা বলেন, কেউ আবার চোখের জল লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেই দমিয়ে রাখা কান্না, বিষণ্নতা আর ভয়ের ছাপ মুখে মুখেই ধরা পড়ে।
একটি ট্রাইব্যুনালে মাইক্রোফোন থাকায় ভুক্তভোগী নারীদের বক্তব্য বাইরে পর্যন্ত শোনা যায়। সেখানে দাঁড়িয়ে কেউ নির্যাতনের বর্ণনা দিচ্ছেন, কেউ আবার ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে থেমে যাচ্ছেন কান্নায়। অন্য একটি ট্রাইব্যুনালে মাইক্রোফোন নেই। ফলে বাইরে বসে থাকা মানুষজন শুধু বিচারক ও আইনজীবীর কথা শুনতে পান। সেদিন একটি দলবদ্ধ ধর্ষণের মামলায় এক আসামির জামিন আবেদন শুনানি চলছিল। বিচারক সেই আবেদন নাকচ করে দেন এবং আসামির প্রতি কঠোর ভর্ৎসনা করেন। সেই দৃশ্য দেখছিলেন পাশের বেঞ্চে বসে থাকা এক তরুণী। কিছুক্ষণ পর তিনি ধীরে ধীরে বলতে শুরু করেন নিজের কথা—তিনি এসেছেন তাঁর প্রেমিকের বিরুদ্ধে প্রতারণামূলক ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে মামলা করতে। কথার এক পর্যায়ে তিনি মুখ ঢেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাঁর সেই কান্না শুধু ব্যক্তিগত বেদনার নয়, বরং সমাজের এক গভীর সংকটের প্রতিফলন।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাগুলো সেই সংকটকে আরও প্রকট করে তুলেছে। পাবনায় এক কিশোরীকে ধর্ষণ করে হত্যা করার আগে তার দাদিকেও হত্যা করা হয়। নরসিংদীতে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার এক কিশোরীর পরিবার স্থানীয়ভাবে বিচার চাইতে গেলে পরে মেয়েটিকে হত্যা করা হয়। সীতাকুণ্ডে সাত বছরের একটি শিশুকে যৌন সহিংসতার পর গলা কেটে দেওয়া হয়; রক্তাক্ত অবস্থায় জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসা সেই শিশুটির দৃশ্য অনেককে শিউরে উঠতে বাধ্য করেছে। হাসপাতালে দেড় দিন লড়াই করার পর সে মারা যায়। আবার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও নিরাপত্তাহীনতার ঘটনা সামনে এসেছে—জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী সাবেক প্রেমিকের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নারী নিপীড়নের ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। কক্সবাজারের উখিয়ায় সাহ্রি খেতে ওঠার সময় বাড়িতে ঢুকে এক গৃহবধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, যার পরিণতিতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
এসব ঘটনা শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধের গল্প নয়; বরং একটি বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দায়ের করা মামলার সংখ্যা প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে ধর্ষণের মামলা বেড়েছে ২৭ শতাংশের বেশি। ২০২৫ সালে সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে মোট ২১ হাজার ৯৩৯টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৭ হাজার ৬৮টি মামলা ধর্ষণের অভিযোগে। ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৫ হাজার ১৭১ জন প্রাপ্তবয়স্ক নারী এবং ১ হাজার ৮৯৭ জন শিশু। অর্থাৎ নারী নির্যাতনের মোট মামলার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ধর্ষণসংক্রান্ত অভিযোগ।
এর আগের বছরগুলোর পরিসংখ্যানেও উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যায়। ২০২৪ সালে নারী নির্যাতনের অভিযোগে মামলা হয়েছিল ১৭ হাজার ৫৭১টি, যার মধ্যে ধর্ষণের মামলা ছিল ৫ হাজার ৫৬৬টি। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৮ হাজার ৯৪১টি, ২০২২ সালে ২১ হাজার ৭৬৬টি এবং ২০২১ সালে ২২ হাজার ১৩৬টি। সংখ্যার ওঠানামা থাকলেও সামগ্রিকভাবে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা যে সমাজে একটি গভীর সমস্যায় পরিণত হয়েছে, তা স্পষ্ট।
তবে শুধু মামলা বাড়ছে—বিচারপ্রক্রিয়া তত দ্রুত এগোচ্ছে না। উচ্চ আদালতের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৯৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৭টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা মামলার সংখ্যা ৩০ হাজার ৩৬৫টি। ঢাকার নয়টি ট্রাইব্যুনালেই বিচারাধীন মামলার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি—১১ হাজার ৫৬৭টি। দীর্ঘদিন ধরে বিচার ঝুলে থাকায় অনেক ভুক্তভোগী ন্যায়বিচারের আশাই হারিয়ে ফেলেন।
নারীর প্রতি সহিংসতার এই পরিস্থিতিকে সমাজের গভীর মানসিকতার সঙ্গে যুক্ত করে দেখেন নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক। তাঁর মতে, নারীর ওপর সহিংসতা, হুমকি, নিপীড়ন ও হেনস্তা যেন দৈনন্দিন ঘটনার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক পুরুষের মধ্যে এমন একটি ধারণা কাজ করে যে নারীর ওপর নিয়ন্ত্রণ বা সহিংসতা প্রয়োগ করার অধিকার তার রয়েছে এবং সে এর জন্য শাস্তি পাবে না। এই মানসিকতা বদলানো ছাড়া সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে বড় পরিসরের সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি, যার মূল বার্তা হবে—নারীকে মানুষ হিসেবে চিনুন, জানুন এবং সম্মান করুন।
নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলরা মনে করেন, নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করা শুধু সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। পরিবার, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম—সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। সচেতনতা তৈরি করা এবং নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।
আইনি কাঠামো শক্তিশালী করার জন্য গত কয়েক বছরে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালে মাগুরায় আট বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার পর দেশজুড়ে তীব্র প্রতিবাদ দেখা দেয়। সেই ঘটনার পর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে কিছু সংশোধন আনা হয়। নতুন সংশোধনীতে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে যৌন সম্পর্ক স্থাপনকে আলাদা ধারায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং এ ধরনের অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ধর্ষণের মামলার তদন্ত ও বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য সময়সীমা কমিয়ে আনা হয়েছে—তদন্ত শেষ করতে হবে ১৫ দিনের মধ্যে এবং বিচার সম্পন্ন করতে হবে ৯০ দিনের মধ্যে, যদিও প্রয়োজন হলে আদালত সময় বাড়াতে পারেন।
এর আগে ২০২০ সালে সিলেট ও নোয়াখালীর দুটি আলোচিত দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনার পর ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং ডিএনএ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, আইন কঠোর হলেও অপরাধের সংখ্যা কমছে না।
তদন্তপ্রক্রিয়াও অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্নের মুখে পড়ে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ২০১৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ধর্ষণের অভিযোগে করা ১১ হাজারের বেশি মামলা তদন্ত করে জানিয়েছে, এর প্রায় ৪৪ শতাংশ ক্ষেত্রে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করেন, এসব মামলার অন্তত ৩০ শতাংশ সত্য হলেও সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাব, বাদীর অনীহা বা তদন্তের সীমাবদ্ধতার কারণে তা প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি।
আইনজীবী সারা হোসেন মনে করেন, শুধু বিচারপ্রক্রিয়ার দিকে নজর দিলেই হবে না; তদন্তপ্রক্রিয়াও সঠিকভাবে হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ বা চিকিৎসকের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীরা আদালতে উপস্থিত হন না। আবার কেউ বদলি হয়ে গেলে নতুন করে সাক্ষ্যগ্রহণের জটিলতা তৈরি হয়। সাক্ষীদের যাতায়াতের খরচও অনেক সময় দেওয়া হয় না। এসব কারণে মামলার অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়।
ভুক্তভোগীদের জন্য প্রয়োজন আর্থিক, আইনি ও স্বাস্থ্যগত সহায়তা। অনেক নারী সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক চাপ বা নিরাপত্তাহীনতার কারণে মামলা করতে সাহস পান না। আবার মামলা করার পরও দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া তাঁদের মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তোলে। তাই ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার ও সহায়তা সেবাগুলোকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
এই বাস্তবতার মধ্যেই আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হচ্ছে। দিবসটির প্রতিপাদ্য—“আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার: সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার।” কিন্তু স্লোগানের বাইরে বাস্তবতা হলো—দেশের বহু নারী প্রতিদিন ভয়, অনিশ্চয়তা ও অবিচারের মধ্যে দিয়ে জীবন পার করছেন।
নারীর প্রতি সহিংসতা শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংকট। পরিবারে, শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে এবং সামাজিক আচরণে নারীর প্রতি সম্মানবোধ তৈরি না হলে এই সহিংসতা থামানো কঠিন। তাই প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা, শিক্ষা এবং মানবিক মূল্যবোধের চর্চা।
আদালতের সেই বারান্দায় বসে থাকা তরুণীর কান্না, জঙ্গলের ভেতর থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় বেরিয়ে আসা শিশুর দৃশ্য, কিংবা ন্যায়বিচারের আশায় বছরের পর বছর অপেক্ষা করা অসংখ্য নারীর গল্প—এসবই আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন তুলে ধরে। প্রশ্নটি শুধু অপরাধের পরিসংখ্যান নিয়ে নয়; বরং আমাদের সমাজের মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ এবং মানবিকতার জায়গা নিয়েই। যতদিন না সমাজের প্রতিটি স্তরে নারীকে সমান মানুষ হিসেবে সম্মান করা শেখা যাচ্ছে, ততদিন এই সংকটের সমাধান অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।
আপনার মতামত জানানঃ