মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে একাধিক সামরিক ঘটনা ও পাল্টা প্রতিক্রিয়ার ধারাবাহিকতায়। শনিবার ভোর থেকে শুরু হওয়া উত্তেজনা দ্রুত আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার খবরের পরপরই বিভিন্ন দেশে সামরিক সতর্কতা জারি হয়েছে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে এবং কূটনৈতিক মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ঘটনাপ্রবাহে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক তথ্য এসেছে ইরানের একটি মেয়েদের স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমোজগান প্রদেশের মিনাব কাউন্টিতে অবস্থিত একটি মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয় তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়। দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আলী ফরহাদির উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, এই হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫৩ জনে দাঁড়িয়েছে এবং অন্তত ৬৩ জন আহত হয়েছে। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে সম্ভাব্য আরও হতাহতের সন্ধান চালানো হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। স্কুলে হামলার এই খবর শুধু ইরানেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেসামরিক স্থাপনায় এমন হামলা সংঘাতের মানবিক সংকটকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তোলে।
এই ঘটনার মধ্যেই কূটনৈতিক মহলে উদ্বেগ বাড়িয়েছে ওমানের প্রতিক্রিয়া। যুক্তরাষ্ট্র–ইরান আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পরিচিত ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাদর আল বুসাইদি শনিবার এক বার্তায় ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলায় দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, সক্রিয় ও গুরুতর আলোচনাগুলো আবারও দুর্বল হয়ে পড়েছে। ওমান বরাবরই অঞ্চলটিতে উত্তেজনা কমাতে মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করে এসেছে, ফলে তাদের এই প্রকাশ্য হতাশা পরিস্থিতির কূটনৈতিক গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করেছে।
বুসাইদি যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্দেশ করে বলেন, তারা যেন এই সংঘাতে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে না পড়ে। তার ভাষায়, “এটি আপনাদের যুদ্ধ নয়।” এই মন্তব্য বিশ্লেষকদের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে, কারণ এটি ইঙ্গিত দেয় যে আঞ্চলিক শক্তিগুলো সংঘাত বিস্তারের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বিগ্ন। মাত্র কয়েকদিন আগে জেনেভায় অনুষ্ঠিত ইরান–মার্কিন তৃতীয় দফা আলোচনার পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছিলেন, আলোচনায় ভালো অগ্রগতি হয়েছে এবং এটি ছিল সবচেয়ে গুরুতর সংলাপগুলোর একটি। সেই প্রেক্ষাপটে হঠাৎ সামরিক উত্তেজনা কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে বড় ধাক্কা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে উত্তেজনার প্রভাব দ্রুত ইরানের সীমানা ছাড়িয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শনিবার সকালে দেশটির আলী আল সালেম বিমান ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে বেশ কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। তবে কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সেগুলো সফলভাবে প্রতিহত করেছে। হামলার পর ঘাঁটির আশপাশে কিছু ধ্বংসাবশেষ পড়ে থাকতে দেখা গেছে, যা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্রিয়তার ইঙ্গিত দেয়।
কুয়েতের সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সশস্ত্র বাহিনী দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে। একই সঙ্গে সাধারণ নাগরিকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে এবং সন্দেহজনক কোনো বস্তু দেখলে কর্তৃপক্ষকে জানাতে বলা হয়েছে। এই ধরনের সতর্কতা সাধারণত তখনই জারি করা হয়, যখন নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে।
কুয়েতের আল জাহারা এলাকার একজন প্রবাসী বাংলাদেশি স্থানীয় পরিস্থিতির একটি ভিডিও পাঠিয়েছেন বলে জানা গেছে, যা থেকে বোঝা যায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের উপস্থিতি থাকায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোও পরিস্থিতির দিকে নিবিড়ভাবে নজর রাখছে।
একই সময়ে জর্ডানও তাদের আকাশসীমায় সামরিক তৎপরতার কথা নিশ্চিত করেছে। দেশটির সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, তাদের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে আসা দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তারা ভূপাতিত করেছে। একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এতে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি, তবে কিছু বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জর্ডানের এই পদক্ষেপ দেখায় যে আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে।
ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলা শুরু হওয়ার খবরের সঙ্গে সঙ্গে ইসরায়েলজুড়ে সাইরেন এবং মোবাইল সতর্কতা জারি করা হয়েছে বলেও জানা গেছে। সাধারণত এই ধরনের সতর্কতা তখনই দেওয়া হয়, যখন সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার আশঙ্কা থাকে। ফলে বোঝা যাচ্ছে, পরিস্থিতি কেবল সীমিত হামলা–পাল্টা হামলার পর্যায়ে নেই; বরং এটি দ্রুত বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকটে রূপ নিতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা প্রায়ই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, কারণ এখানে বহু দেশের সামরিক ঘাঁটি, জোট ও প্রতিদ্বন্দ্বী স্বার্থ জড়িত। যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক উপস্থিতি রয়েছে, ইসরায়েল ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে দীর্ঘদিন ধরে হুমকি হিসেবে দেখে আসছে, আর ইরান নিজেকে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। এই জটিল সমীকরণে যে কোনো সামরিক পদক্ষেপ দ্রুত বহু দেশের নিরাপত্তা হিসাব পাল্টে দিতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হলো মানবিক পরিস্থিতি। মিনাবের মেয়েদের স্কুলে হামলার ঘটনাটি যদি আন্তর্জাতিকভাবে যাচাই হয়ে একই রকম থাকে, তাহলে তা বিশ্বব্যাপী তীব্র নিন্দা ডেকে আনতে পারে। যুদ্ধ বা সামরিক সংঘাতে বেসামরিক স্থাপনা, বিশেষ করে স্কুল ও হাসপাতাল আক্রান্ত হলে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার প্রশ্ন সামনে চলে আসে। এতে কূটনৈতিক চাপ বাড়ার সম্ভাবনাও থাকে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এই উত্তেজনা কি সীমিত থাকবে, নাকি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেবে। ওমানের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশ ইতোমধ্যে উদ্বেগ জানিয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় কূটনৈতিক পথ এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। তবে সামরিক পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে আলোচনার সুযোগ দ্রুত সংকুচিত হতে পারে।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারও এই পরিস্থিতির দিকে সতর্ক নজর রাখছে। উপসাগরীয় অঞ্চল বিশ্ব তেল সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি উত্তেজনা হরমুজ প্রণালী বা আশপাশের সামুদ্রিক পথে প্রভাব ফেলে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অস্থির হয়ে উঠতে পারে। ইতোমধ্যে বাজার বিশ্লেষকদের মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
মাঠ পর্যায়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে। তেহরান থেকে মিনাব, কুয়েত থেকে জর্ডান—বিভিন্ন জায়গায় সাইরেন, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সামরিক সতর্কতার খবর মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। বিশেষ করে যেখানে বেসামরিক হতাহতের খবর আসছে, সেখানে মানসিক চাপ আরও বেশি।
এই মুহূর্তে পরিস্থিতি অত্যন্ত তরল এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল। সামরিক পদক্ষেপ, পাল্টা হামলা, কূটনৈতিক বার্তা—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এক অনিশ্চিত মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। পরবর্তী কয়েক দিনই নির্ধারণ করবে উত্তেজনা প্রশমিত হবে নাকি আরও বিস্তৃত সংঘাতে রূপ নেবে। বিশ্ব সম্প্রদায়ের নজর এখন সেদিকেই, আর অঞ্চলজুড়ে সাধারণ মানুষ অপেক্ষা করছে—পরিস্থিতি কি শান্ত হবে, নাকি সামনে আরও কঠিন সময় আসছে।
আপনার মতামত জানানঃ