রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র আবারও আলোচনায় এসেছে নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে। বাগেরহাটের রামপালে অবস্থিত বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড (বিআইএফপিসিএল)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন ভারতীয় প্রকৌশলী রমানাথ পূজারী। বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই প্রকৌশলীর যোগদানকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট মহলে নতুন প্রত্যাশার সঞ্চার হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, প্ল্যান্টের দক্ষতা উন্নয়ন এবং পরিবেশগত মান রক্ষায় তার পূর্ব অভিজ্ঞতা রামপাল প্রকল্পের ভবিষ্যৎ কার্যক্রমে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) আনুষ্ঠানিকভাবে তার যোগদানের বিষয়টি নিশ্চিত করেন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটির ডিজিএম (এইচআর-পি আর) আনোয়ারুল আজিম। তিনি জানান, সাবেক এমডি প্রকৌশলী সঙ্গীতা কৌশিকের স্থলাভিষিক্ত হয়ে দায়িত্ব নিয়েছেন রমানাথ পূজারী। দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই তিনি প্রকল্পের চলমান কার্যক্রম, উৎপাদন সক্ষমতা এবং পরিচালন কাঠামো সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে শুরু করেছেন বলে জানা গেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, শুরু থেকেই তিনি সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালনে মনোযোগী।
রমানাথ পূজারীর পেশাগত জীবন বিদ্যুৎ খাতের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। ১৯৬৮ সালে ভারতের ওড়িশা রাজ্যে জন্ম নেওয়া এই প্রকৌশলী ভুবনেশ্বরের কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে গুরগাঁওয়ের এমডিআই থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন, যা তাকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি ব্যবস্থাপনা দক্ষতাতেও সমৃদ্ধ করেছে। এছাড়া তিনি ভারতের আহমেদাবাদের আইআইএম এবং যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল থেকেও উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। বহুমাত্রিক এই শিক্ষাগত পটভূমি তাকে বিদ্যুৎ প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে গেছে।
১৯৮৯ সালে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রতিষ্ঠান এনটিপিসিতে যোগদানের মাধ্যমে তার পেশাগত যাত্রা শুরু হয়। দীর্ঘ প্রায় ৩৬ বছরের কর্মজীবনে তিনি বিদ্যুৎ উৎপাদন, প্ল্যান্ট পরিচালনা, নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি এবং দক্ষতা উন্নয়নের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। ভারতের ছত্তিশগড় রাজ্যের ২৯৮০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এনটিপিসির সিপাত পাওয়ার স্টেশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন তার ক্যারিয়ারের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। এই অভিজ্ঞতা তাকে বৃহৎ আকারের তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনায় বাস্তবমুখী দক্ষতা দিয়েছে, যা রামপাল প্রকল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
রামপাল মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্টের সঙ্গে রমানাথ পূজারীর পূর্ব সম্পর্কও রয়েছে। নতুন এমডি হিসেবে যোগদানের আগে তিনি একই প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক ও নির্বাহী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। ওই সময়ে তিনি প্ল্যান্ট পরিচালনা, উৎপাদন বৃদ্ধি, নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিতকরণ এবং পরিবেশগত বিধি মানার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম এবং প্রকল্প এলাকার টাউনশিপ উন্নয়নেও তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। ফলে প্রকল্পের ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতা সম্পর্কে তার পূর্ব ধারণা রয়েছে, যা নতুন দায়িত্ব পালনে তাকে বাড়তি সুবিধা দেবে।
রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প। বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়িত এই প্রকল্প দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তবে পরিবেশগত প্রভাব, পরিচালন ব্যয় এবং দক্ষতা নিয়ে বিভিন্ন সময় আলোচনা-সমালোচনাও হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে একজন অভিজ্ঞ প্রকৌশলীর নেতৃত্বে প্রকল্পটি নতুন গতি পেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে প্ল্যান্টের নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত মান বজায় রাখা—এই দুই ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা পরীক্ষিত।
বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায় প্রযুক্তিগত জ্ঞান যেমন জরুরি, তেমনি ব্যবস্থাপনা দক্ষতা ও কৌশলগত পরিকল্পনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। রমানাথ পূজারীর শিক্ষাগত ও পেশাগত প্রোফাইল এই দুই দিকেই ভারসাম্যপূর্ণ। ফলে তিনি যদি দক্ষতার সঙ্গে দল পরিচালনা করতে পারেন এবং স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় রেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তাহলে রামপাল প্রকল্পের কর্মদক্ষতা আরও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর দৃষ্টিকোণ থেকেও এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। রামপাল প্রকল্প ঘিরে কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সামাজিক উদ্যোগের বিষয়গুলো স্থানীয়দের কাছে সংবেদনশীল। পূর্বে তিনি যে সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন, তা অব্যাহত থাকলে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হতে পারে। একই সঙ্গে পরিবেশগত বিষয়গুলোতে স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা দেখানো নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের জন্য বড় বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পায়ন, নগরায়ন এবং ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদার প্রেক্ষাপটে রামপালের মতো কেন্দ্রগুলোর নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন ধরে রাখা জরুরি। এই বাস্তবতায় নতুন এমডির নেতৃত্ব কতটা কার্যকর হয়, তা সময়ই বলে দেবে। তবে অভিজ্ঞতা, শিক্ষা ও পূর্ব সম্পৃক্ততার কারণে রমানাথ পূজারীকে ঘিরে প্রত্যাশা যে তৈরি হয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিবাহিত এবং দুই সন্তানের জনক। পেশাগত কঠোরতার পাশাপাশি পারিবারিক ভারসাম্য বজায় রাখার অভিজ্ঞতা নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে অনেকেই মনে করেন। সামনে তার প্রধান দায়িত্ব হবে উৎপাদন ধারাবাহিক রাখা, দক্ষতা বাড়ানো এবং পরিবেশগত মান বজায় রেখে প্রকল্পকে টেকসই পথে এগিয়ে নেওয়া। নতুন অধ্যায়ের শুরুতে রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র এখন তাকিয়ে আছে তার নেতৃত্বের দিকেই।
আপনার মতামত জানানঃ