বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবর্তনের হাওয়া নতুন কিছু নয়, তবে কিছু সময় থাকে যখন পরিবর্তনের গতি হঠাৎ করেই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক নির্বাচন–পরবর্তী পরিস্থিতি তেমনই এক সময়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর দেশে একটি তুলনামূলক স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছে—এমন একটি প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্ব বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। তাঁর নেতৃত্বে দলটির যে আদর্শিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরের কথা বলা হচ্ছে, সেটি কত দূর যাবে এবং কতটা টেকসই হবে—এই প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আলোচনার কেন্দ্রে।
নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জামায়াত তাদের অতীতের তুলনায় উল্লেখযোগ্য ভোট ও আসন বৃদ্ধি পেয়েছে। এই উত্থানকে কেউ কেউ ‘নীরব বিস্তার’ বলছেন। প্রচলিত অর্থে তারা প্রধান প্রতিপক্ষকে পরাজিত করে ক্ষমতায় যায়নি, কিন্তু সামাজিক সমর্থনের যে বিস্তার ঘটেছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ কম। একসময় যে দলটি সীমিত আসনে আটকে ছিল, তারা এখন কয়েক গুণ বেশি আসন ও ভোট অর্জন করেছে—এটি নিছক পরিসংখ্যান নয়; এর ভেতরে সামাজিক প্রবণতারও ইঙ্গিত রয়েছে।
ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বের বিশেষত্ব হলো তিনি দলটিকে একটি বাস্তবমুখী রাজনৈতিক কাঠামোর দিকে নিয়ে যেতে চাইছেন—এমন ধারণা অনেক পর্যবেক্ষকের। জামায়াত ঐতিহাসিকভাবে একটি আদর্শনির্ভর দল হিসেবে পরিচিত ছিল, যার বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি মওদুদীবাদী চিন্তায় গভীরভাবে প্রভাবিত। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কেবল আদর্শিক অবস্থানে স্থির থাকা রাজনৈতিকভাবে কার্যকর নাও হতে পারে। এই বাস্তবতা থেকেই সম্ভবত দলটির নীতিগত ভাষ্যে পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে।
বিশেষ করে অর্থনৈতিক প্রশ্নে দলটির অবস্থানের পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে পুঁজিবাদের কড়া সমালোচনা থাকলেও এখন বাজার অর্থনীতির কাঠামোর ভেতরে থেকে সুশাসনের কথা বলছে দলটি। এটি নিছক ভাষার পরিবর্তন নয়; বরং রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর একটি কৌশল হিসেবেও দেখা যেতে পারে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, দলের বিপুলসংখ্যক কর্মী নিজেই পুঁজিনির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে বসবাস করেন। ফলে আদর্শ ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব কমাতে নেতৃত্বের এই অবস্থান পরিবর্তন কৌশলগত বলেই মনে হয়।
নারী অংশগ্রহণের প্রশ্নেও জামায়াতের ভেতরে দৃশ্যমান পরিবর্তনের আলোচনা হচ্ছে। অতীতে দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রমে নারীদের ভূমিকা সীমিত পরিসরে থাকলেও সাম্প্রতিক নির্বাচনে নারী কর্মীদের দৃশ্যমান উপস্থিতি অনেক বেশি ছিল। বিভিন্ন এলাকায় নারীদের বড় সমাবেশ ও প্রচার কার্যক্রম দলটির অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। যদিও সমালোচকেরা এখনো প্রশ্ন তুলছেন—নীতিগত অবস্থান কতটা বদলেছে এবং তা বাস্তবে কত দূর কার্যকর হবে।
ডা. শফিকুর রহমানের কিছু বক্তব্য, বিশেষ করে নারীদের রাজনৈতিক নেতৃত্বে আনার প্রসঙ্গে ‘আমরা তাদের প্রস্তুত করছি’—এই মন্তব্য রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে আলোচিত হয়েছে। এটি একদিকে পরিবর্তনের ইঙ্গিত, অন্যদিকে একটি ধীরগতির রূপান্তর প্রক্রিয়ার স্বীকারোক্তি বলেও ধরা যায়। কারণ, দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক সংস্কৃতি রাতারাতি বদলানো সম্ভব নয়। ফলে নেতৃত্বের এই ধীরলয়ের কৌশল সচেতন রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা যেতে পারে।
দলটির বৈশ্বিক যোগাযোগ কৌশলেও পরিবর্তনের আভাস মিলছে। অতীতে যেখানে ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক যোগাযোগ বেশি গুরুত্ব পেত, সেখানে এখন বাস্তব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে সামনে রেখে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। বিদেশে অবস্থানরত সাবেক কর্মীদের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা—এটিও একটি আধুনিক রাজনৈতিক সংগঠন কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে এই উত্থানের মাঝেও কিছু মৌলিক প্রশ্ন রয়ে গেছে, যা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা নিয়ে দলটির প্রতি যে ঐতিহাসিক সমালোচনা রয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ ও খোলামেলা মূল্যায়ন এখনো হয়নি—এমন অভিযোগ সমাজের একটি বড় অংশের। যদিও বর্তমান নেতৃত্বের বড় অংশই একাত্তর–পরবর্তী প্রজন্ম, তবু অতীতের দায় থেকে পুরোপুরি মুক্ত হওয়া রাজনৈতিকভাবে সহজ নয়। ভবিষ্যতে দলটি যদি সত্যিই একটি গণমুখী রূপ নিতে চায়, তাহলে এই প্রশ্নগুলোর মোকাবিলা এড়িয়ে যাওয়া কঠিন হবে।
আরেকটি বড় পরীক্ষার জায়গা হলো বিএনপির নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্ক। অতীতে দুই দলের মধ্যে যে বোঝাপড়া ছিল, বর্তমান প্রজন্মের নেতৃত্বে তা নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। উভয় দলের ভেতরে নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটেছে, এবং মাঠপর্যায়ের শক্তির বিন্যাসও বদলাচ্ছে। ফলে সম্পর্ক সহযোগিতামূলক হবে, নাকি প্রতিযোগিতামূলক রূপ নেবে—তা এখনো অনিশ্চিত।
রাজনীতির বাস্তবতা হলো—উত্থান যত দ্রুত ঘটে, টিকে থাকা তত কঠিন। জামায়াতের সাম্প্রতিক সাফল্য তাই কেবল শুরু, শেষ নয়। ডা. শফিকুর রহমানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই সমর্থনকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা। এর জন্য প্রয়োজন সাংগঠনিক আধুনিকায়ন, নীতিগত স্বচ্ছতা, এবং সামাজিক আস্থার বিস্তার।
সব মিলিয়ে বলা যায়, জামায়াত একটি রূপান্তরের পথে হাঁটছে—এমন ধারণা রাজনৈতিক মহলে জোরালো হচ্ছে। তবে এই পথ কত দূর যাবে, তা নির্ভর করবে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা, নীতিগত সাহস এবং বাস্তব রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর। বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবর্তনের গল্প বহুবার শুরু হয়েছে, কিন্তু সব গল্প শেষ পর্যন্ত টেকেনি। ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্ব সেই পরিচিত ইতিহাসকে ভাঙতে পারে কি না—এখন সেটিই দেখার বিষয়।
আপনার মতামত জানানঃ