উত্তর প্রদেশের বদায়ুঁ জেলার রুদায়ন এলাকায় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি মারধরের ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে, যখন সেই ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ভাইরাল হয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, এক যুবক তিনজন প্রবীণ মুসলমান ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে চড় মারছেন। ঘটনাটি নিয়ে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পুলিশের পদক্ষেপ, এবং বৃহত্তর সামাজিক প্রেক্ষাপট—সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন স্থানীয় সীমা ছাড়িয়ে জাতীয় বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে।
ভিডিওতে যাদের মারধর করতে দেখা গেছে, তাদের একজন ৫৬ বছর বয়সী আব্দুল সালাম। তিনি বদায়ুঁর সহসওয়ান থানা এলাকার বাসিন্দা। ঘটনার পর থেকে তিনি আতঙ্কের মধ্যে আছেন বলে জানিয়েছেন। তার মোবাইল ফোনও দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল। সালামের সঙ্গে থাকা অন্য দুই ব্যক্তি—আরিফ ও জাভেদ—সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেছেন। তবে আব্দুল সালাম বিবিসি বাংলার সঙ্গে কথা বলে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন।
তার বর্ণনা অনুযায়ী, ১৬ ফেব্রুয়ারি তিনি দুই সঙ্গীকে নিয়ে রুদায়ন এলাকার ইসলামনগর থানা অঞ্চলে গিয়েছিলেন সাহায্য সংগ্রহ করতে। তিনি দাবি করেন, হঠাৎ এক যুবক পিছন থেকে এসে তাদের আধার কার্ড দেখতে চায়। এরপর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সালামের অভিযোগ, ওই যুবক তাদের ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করে, মারধর শুরু করে এবং তাদের টুপি খুলে নেওয়ার চেষ্টা করে। এমনকি তাদের চোর বলেও অপমান করা হয়। সালাম বলেন, তারা শান্তভাবে বসে ছিলেন এবং কোনো ঝগড়া করতে চাননি, কিন্তু তাদের ওপর হামলা চালানো হয় এবং হামলাকারীরাই ভিডিও ধারণ করে সেটি ভাইরাল করে দেয়।
এই ঘটনার ভিত্তিতে ১৯ ফেব্রুয়ারি পুলিশ এফআইআর দায়ের করে। অভিযুক্ত হিসেবে অক্ষয় শর্মা ওরফে ছোট্টু নামে এক যুবককে গ্রেফতার করা হয় এবং হেফাজতে পাঠানো হয়। তবে পরবর্তীতে তিনি জামিন পেয়ে জেল থেকে বেরিয়ে আসেন। এই বিষয়টি নিয়েই সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আব্দুল সালাম। তার মতে, যে ধারাগুলো দেওয়া উচিত ছিল, পুলিশ তা দেয়নি, ফলে অভিযুক্ত দ্রুত জামিন পেয়ে গেছে এবং এখন প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে ভিন্ন একটি প্রাথমিক বিবরণ সামনে এসেছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, আব্দুল সালাম ও তার সঙ্গীরা রুদায়ন এলাকার মূল সড়ক দিয়ে যাচ্ছিলেন। পিছন থেকে এক ব্যক্তি হর্ন বাজালেও তারা তা শুনতে পাননি। এই বিষয়টি থেকেই নাকি অশান্তির সূত্রপাত ঘটে এবং পরে মারধরের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তা সুনীল কুমার জানিয়েছেন, অভিযোগ পাওয়ার পর অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছিল এবং তদন্ত চলছে।
তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ঘটনাটিকে সাধারণ রাস্তার বিবাদ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা হচ্ছে, অথচ সেখানে ধর্মীয় কটূক্তি ও অপমানের বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। আব্দুল সালাম স্পষ্টভাবে বলেছেন, তারা কোনো ঝগড়া চান না, কিন্তু ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেন। তার প্রতিবেশী শাকির আনসারিও একই সুরে কথা বলেছেন। তিনি জানান, সালাম একজন খেটে খাওয়া মানুষ এবং সেদিন তারা চাঁদা তুলতে গিয়েছিলেন। তার মতে, তাদের ন্যায়বিচার পাওয়া উচিত।
অভিযুক্ত অক্ষয় শর্মা সম্পর্কে সরাসরি তার বা তার পরিবারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার মোবাইল ফোন বন্ধ ছিল বলে জানা গেছে। তবে আব্দুল সালাম পুলিশে দেওয়া অভিযোগে উল্লেখ করেছেন, অভিযুক্ত নিজেকে বজরং দলের নেতা বলে পরিচয় দিয়েছিল এবং আধার কার্ড দেখতে চেয়েছিল। এই দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্র থেকে কিছু তথ্য সামনে এসেছে। সহসওয়ান এলাকার সমাজবাদী পার্টির বিধায়ক ব্রজেশ ইয়াদভ দাবি করেছেন, অক্ষয় শর্মা ‘গো-রক্ষা মিশন’ নামের একটি সংগঠনের জেলা সভাপতি। তিনি বলেন, এ সংক্রান্ত একটি নিয়োগপত্র তার কাছেও রয়েছে এবং তিনি সিনিয়র পুলিশ সুপারের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। তবে স্বাধীনভাবে এই দাবির সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি। এক স্থানীয় সাংবাদিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, অক্ষয়ের বয়স প্রায় ২১ বছর, তিনি দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন এবং চাষাবাদের সঙ্গে যুক্ত। তার বিরুদ্ধে এর আগে এমন কোনো অভিযোগ শোনা যায়নি বলেও ওই সাংবাদিকের দাবি।
এই একক ঘটনাটি বৃহত্তর এক বিতর্কের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেছে। গত এক দশকে ভারতে মুসলমানদের ওপর হামলা ও নিগ্রহের অভিযোগ বিভিন্ন সময় সামনে এসেছে। বিশেষ করে ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে বলে সমালোচকরা দাবি করে থাকেন। যদিও বিজেপি এবং কেন্দ্রীয় সরকার বরাবরই সংখ্যালঘুদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।
সমালোচকদের মতে, গরু জবাই বা গরুর মাংস বহনের অভিযোগে গণপিটুনি, তথাকথিত ‘গো-রক্ষক’দের হামলা, কিংবা ‘লাভ জিহাদ’ ও ‘ফ্লাড জিহাদ’-এর মতো শব্দের রাজনৈতিক ব্যবহার—এসব মিলিয়ে একটি উদ্বেগজনক সামাজিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনও সময় সময় এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আবার সরকারপন্থী বিশ্লেষকদের যুক্তি, বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে বড় করে দেখানো হচ্ছে এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
রুদায়নের এই ঘটনা সেই পুরনো বিতর্ককেই আবার সামনে এনে দিয়েছে। একদিকে ভুক্তভোগীদের দাবি—তাদের ধর্মীয় পরিচয়কে লক্ষ্য করেই হামলা হয়েছে এবং সঠিক ধারায় মামলা না হওয়ায় অভিযুক্ত সহজে জামিন পেয়েছে। অন্যদিকে পুলিশের বক্তব্য—তদন্ত চলছে এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসারেই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি জনমতকে দ্রুত প্রভাবিত করেছে। অনেকেই ভিডিও দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, আবার কেউ কেউ ঘটনার পূর্ণ প্রেক্ষাপট জানার আহ্বান জানিয়েছেন। ডিজিটাল যুগে এ ধরনের ভিডিও মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয় ঘটনা দ্রুত জাতীয় আলোচনায় পরিণত হচ্ছে—রুদায়নের ঘটনাও তার ব্যতিক্রম নয়।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে তদন্তের চূড়ান্ত ফল কী দাঁড়ায় এবং ভুক্তভোগীরা আদৌ তাদের প্রত্যাশিত ন্যায়বিচার পান কি না। আব্দুল সালাম বারবার বলেছেন, তারা ঝগড়া চান না—তারা শুধু ন্যায় চান। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্যও এটি একটি পরীক্ষা—তারা কতটা নিরপেক্ষ ও কার্যকরভাবে তদন্ত সম্পন্ন করতে পারে।
ভারতের মতো বহুধর্মী ও বহুসাংস্কৃতিক সমাজে এ ধরনের ঘটনা শুধু একটি ফৌজদারি মামলা নয়; এটি সামাজিক আস্থার সঙ্গেও জড়িত। তাই রুদায়নের এই ভাইরাল ভিডিও ঘিরে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে—সেগুলোর উত্তর শুধু আদালত বা পুলিশের তদন্তেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বৃহত্তর সামাজিক সহাবস্থানের প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে।
আপনার মতামত জানানঃ