
১৯৮৯ সালের ৯ অক্টোবর, সোমবার। পূর্ব জার্মানির লাইপৎসিগে সন্ধ্যার বিক্ষোভে নামা মানুষের সামনে একটি প্রশ্ন ছিল: রাষ্ট্র কি আবার শক্তি প্রয়োগ করবে? আগের সপ্তাহগুলোর ধরপাকড় ও দমনপীড়নের পর সে আশঙ্কা অমূলক ছিল না। তবু সেদিন প্রায় ৭০ হাজার মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন। তাঁদের কণ্ঠে দুটি দাবি বিশেষভাবে শোনা যাচ্ছিল—‘Wir sind das Volk’, অর্থাৎ ‘আমরাই জনগণ’; এবং ‘Keine Gewalt’, অর্থাৎ ‘কোনো সহিংসতা নয়’।
সেদিনের মিছিল শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়। নিরাপত্তা বাহিনী সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করতে আক্রমণ চালায়নি। পূর্ব জার্মানির শাসক দল এসইডির জন্য এই ঘটনা ছিল কর্তৃত্বের একটি বড় পরাজয়। কিন্তু পরাজয়টি বোঝার জন্য শুধু জনতার সংখ্যা দেখা যথেষ্ট নয়। দেখতে হয় সেই রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে, যেখানে মানুষ এত দিন নিজেদের অসন্তোষ প্রকাশের আগে শাস্তির সম্ভাবনা হিসাব করত।
একটি কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার শক্তি শুধু অস্ত্র বা কারাগারে থাকে না। থাকে নাগরিকের মনে তৈরি হওয়া অনুমানে: আমি কথা বললে অন্যরা পাশে দাঁড়াবে না; আমি বিপদে পড়লে আমার প্রতিবেশী চুপ থাকবে; আমার মতো করে হয়তো আর কেউ ভাবে না। এই অনুমান মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে। অসন্তোষ থাকলেও তা প্রকাশ না পেলে রাষ্ট্র সেই নীরবতাকে সম্মতি হিসেবে দেখাতে পারে।
লাইপৎসিগের রাস্তায় বিপুল মানুষের উপস্থিতি সেই বিচ্ছিন্নতার ধারণায় আঘাত করেছিল। একজন মানুষ দেখতে পেলেন, তাঁর ভয় ও আকাঙ্ক্ষা কেবল তাঁর নিজের নয়। অন্যরাও একই ঝুঁকি নিয়ে দাঁড়িয়েছেন। ভয় মুছে যায়নি; কিন্তু ভয় বহন করার সামাজিক পরিস্থিতি বদলে গিয়েছিল। নিঃসঙ্গ মানুষের সিদ্ধান্ত একটি দৃশ্যমান নাগরিক অবস্থানে পরিণত হয়েছিল।
এই সাহস হঠাৎ জন্ম নেয়নি। নিকোলাইকির্শে বা সেন্ট নিকোলাস গির্জায় শান্তি, পরিবেশ ও মানবাধিকারের প্রশ্নে মানুষের মিলিত হওয়ার ইতিহাস ছিল। ১৯৮৯ সালের ৪ সেপ্টেম্বর প্রার্থনা শেষে প্রায় এক হাজার মানুষ গির্জার বাইরে প্রতিবাদে থেকে যান। পরবর্তী সোমবারগুলোতে সমাবেশ বাড়তে থাকে; ২ অক্টোবর অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ২০ হাজারে পৌঁছায়। এক সপ্তাহ পর তা প্রায় ৭০ হাজার হয়।
একটি নিয়মিত সমাবেশের গুরুত্ব এখানে বোঝা যায়। প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার জায়গা ও সময় জানা থাকলে মানুষকে প্রতিবার শূন্য থেকে প্রস্তুতি নিতে হয় না। পরিচিত মুখ, সম্পর্ক এবং ধারাবাহিক উপস্থিতি আস্থার ভিত্তি তৈরি করে। কোনো এক দিনের বিশাল মিছিলের পেছনে ছোট ছোট সমাবেশের এই ইতিহাস প্রায়ই আড়ালে পড়ে যায়। অথচ দৃশ্যমান শক্তির ভিত্তি তৈরি হয় সেই কম দৃশ্যমান কাজেই।
গির্জার ভূমিকা শুধু ধর্মীয় আচারে সীমাবদ্ধ ছিল না। সেখানে মানুষের কথা বলা, একত্র হওয়া এবং বিকল্প সামাজিক সম্পর্ক গড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। এর রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল: রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রিত জনপরিসরের বাইরে নাগরিকেরা নিজেদের ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলেন। যাঁরা ধর্মীয় বিশ্বাসে একমত ছিলেন না, তাঁরাও স্বাধীনতা ও অধিকার নিয়ে একটি সাধারণ আলোচনায় মিলতে পারছিলেন।
তবে সেই সন্ধ্যার শান্তিপূর্ণ পরিণতি আগে থেকে নিশ্চিত ছিল না। কর্তৃপক্ষ বিপুল নিরাপত্তা প্রস্তুতি নিয়েছিল। সরকারি ইতিহাসবিবরণ অনুযায়ী, তিন হাজার সশস্ত্র এবং পাঁচ হাজার অন্য সংগঠিত সদস্যকে প্রস্তুত রাখা হয়। এমন প্রস্তুতির মুখে রাস্তায় নামার অর্থ ছিল বাস্তব ঝুঁকি নেওয়া। পরে সাফল্য জানার সুবিধা নিয়ে ঘটনাটি পড়লে সেই অনিশ্চয়তার গভীরতা হারিয়ে যেতে পারে।
এ কারণেই ‘কোনো সহিংসতা নয়’ স্লোগানটিকে কেবল নৈতিক ঘোষণা হিসেবে দেখলে অসম্পূর্ণ হবে। এটি ছিল আন্দোলনের আচরণ নির্ধারণেরও চেষ্টা। ভিড়ের মধ্যে ক্ষোভ থাকবে, উত্তেজনা থাকবে; কিন্তু তার প্রকাশ যেন সংঘর্ষে রূপ না নেয়—এই শৃঙ্খলা নিজে থেকে আসে না। একে বারবার স্মরণ করাতে হয় এবং অন্য অংশগ্রহণকারীর কাছ থেকেও প্রত্যাশা করতে হয়।
সেদিন অহিংসতার আহ্বান বিভিন্ন দিক থেকে এসেছিল। ‘লাইপৎসিগের ছয়জন’ নামে পরিচিত একটি দল সংলাপ ও সংযমের আবেদন জানায়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সংগীত পরিচালক কুর্ট মাসুর, ধর্মযাজক পিটার জিমারমান, শিল্পী বের্ন্ড-লুৎস লাঙ্গে এবং এসইডির স্থানীয় নেতৃত্বের তিন সদস্য।
এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ক্ষমতার বাইরের মানুষ এবং ক্ষমতার ভেতরের কিছু ব্যক্তিকে একই অবস্থানে দেখা গিয়েছিল। তাঁরা গণআন্দোলনের একমাত্র চালিকাশক্তি ছিলেন না। কিন্তু তাঁদের আহ্বান দেখিয়েছিল, উত্তেজনা কমানোর পক্ষে শাসক কাঠামোর ভেতরেও কিছু জায়গা তৈরি হচ্ছিল। রাষ্ট্রকে একটি সম্পূর্ণ একক সত্তা হিসেবে কল্পনা করলে এমন পরিবর্তন চোখে পড়ে না।
একই কারণে সেদিন কেন গুলি চলেনি, তার ব্যাখ্যাও একটি বাক্যে দেওয়া যায় না। বিশাল জনসমাবেশ, আন্দোলনের অহিংস আচরণ, স্থানীয় কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগের সমস্যাকে বিবেচনায় নিতে হয়। জার্মান সরকারের বিবরণে দেখা যায়, স্থানীয় নেতৃত্ব বার্লিনে যোগাযোগের চেষ্টা করছিল; শেষ পর্যন্ত পুলিশ মিছিল আক্রমণ না করার অবস্থান নেয়।
এখানে রাষ্ট্রের ভয় ভাঙার অর্থ রাষ্ট্রের অস্ত্র অকার্যকর হয়ে যাওয়া নয়। অস্ত্র তখনো ছিল। বদলে গিয়েছিল সেই অস্ত্র ব্যবহারের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক হিসাব। এত বিপুল নিরস্ত্র মানুষের বিরুদ্ধে দমন চালাতে গিয়ে কর্তৃপক্ষকে পরিণতির মুখোমুখি হতে হচ্ছিল। জনতা এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, যেখানে অভ্যাসগত শক্তি প্রয়োগও সহজ সিদ্ধান্ত থাকেনি।
বৃহত্তর আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মিখাইল গর্বাচেভের সংস্কারনীতি সোভিয়েত ব্লকের রাজনৈতিক পরিবেশ বদলাচ্ছিল; পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর জন্য আগের তুলনায় বেশি স্বাধীনতার জায়গা তৈরি হচ্ছিল। পূর্ব জার্মানির আন্দোলন তাই শুধু একটি শহরের ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না। নাগরিক উদ্যোগ এমন এক সময়ে বিকশিত হয়েছিল, যখন শাসনব্যবস্থার বাইরের সমর্থনের পুরোনো নিশ্চয়তাও দুর্বল হচ্ছিল।
তবু সব কৃতিত্ব আন্তর্জাতিক পরিবর্তনকে দিলে রাস্তায় নামা মানুষের ভূমিকা ছোট হয়ে যায়। সুযোগ তৈরি হওয়া এবং সেই সুযোগ কাজে লাগানো আলাদা বিষয়। অনুকূল পরিস্থিতি নিজে থেকে সমাবেশ সংগঠিত করে না, মানুষকে ঝুঁকি নিতে শেখায় না, অহিংস আচরণও নিশ্চিত করে না। লাইপৎসিগের নাগরিকেরা বৃহত্তর পরিবর্তনকে একটি বাস্তব রাজনৈতিক ঘটনাতে রূপ দিয়েছিলেন।
‘আমরাই জনগণ’ স্লোগানের মধ্যেও ছিল একটি গভীর প্রশ্ন: জনগণের নামে শাসন করা সরকার কি জনগণের স্বাধীন মতপ্রকাশকে মানতে পারে? রাষ্ট্র যদি নাগরিকের প্রতিনিধিত্ব দাবি করে, তবে নাগরিকের কণ্ঠকে অপরাধ হিসেবে দেখানোর সঙ্গে সেই দাবির সংঘাত তৈরি হয়। মিছিল সেই সংঘাতকে প্রকাশ্য করে তুলেছিল।
তবে জনগণের নামে কথা বলা নিজে থেকেই গণতন্ত্রের নিশ্চয়তা নয়। কোনো আন্দোলনের সংখ্যাগরিষ্ঠতাও ভিন্নমতকে দমন করার অধিকার দেয় না। লাইপৎসিগের ইতিহাস থেকে আজ যে শিক্ষা নেওয়া যায়, তা হলো মতপ্রকাশ, অংশগ্রহণ এবং ক্ষমতার জবাবদিহির দাবি। সেই দাবিকে ভবিষ্যতে আরেকটি একচ্ছত্র কর্তৃত্বের অনুমতি হিসেবে ব্যবহার করলে তার নাগরিক তাৎপর্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সেদিনের ছবি ছড়িয়ে পড়াও ছিল ঘটনাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আরাম রাডোমস্কি ও জিগবার্ট শেফকে গোপনে মিছিলের ভিডিও ধারণ করেছিলেন। সেই দৃশ্য অন্যত্র পৌঁছালে পূর্ব জার্মানির আরও মানুষ দেখতে পেলেন, বিপুল নাগরিক সমাবেশ সম্ভব এবং লাইপৎসিগের সেই মিছিল শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে। শেফকের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বিবরণে ছবি ধারণের ঝুঁকি ও তার বিস্তারের গুরুত্ব উঠে এসেছে।
এই দৃশ্যমানতা ভয় ও প্রত্যাশার সম্পর্ক বদলাতে সাহায্য করে। গুজবের বদলে মানুষ নিজের চোখে কিছু প্রমাণ দেখতে পায়। যদিও একটি জায়গার শান্তিপূর্ণ পরিণতি অন্য জায়গায় নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় না, তবু এটি রাষ্ট্রের অপরাজেয়তার ধারণায় ফাটল তৈরি করতে পারে। সাহস তখন শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতি থাকে না; অন্য মানুষের সিদ্ধান্তের জন্যও তথ্য হয়ে ওঠে।
এরপর আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। অক্টোবরের মধ্যেই এরিখ হোনেকার নেতৃত্ব ছাড়েন। ৯ নভেম্বর বার্লিনের প্রাচীরের সীমান্তপথ খুলে যায়। পরের বছর, ৩ অক্টোবর ১৯৯০, জার্মানি পুনরেকত্রীকরণ সম্পন্ন হয়। কিন্তু এই পরিণতিগুলোকে ৯ অক্টোবরের অনিবার্য ফল হিসেবে দেখলে ইতিহাস অতিরিক্ত সরল হয়ে যায়। মিছিল, পরবর্তী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং আন্তর্জাতিক আলোচনার আলাদা ভূমিকা ছিল।
লাইপৎসিগে অংশ নেওয়া মানুষেরও সবাই তখন একই ভবিষ্যৎ কল্পনা করছিলেন না। মুক্ত মতপ্রকাশ, রাজনৈতিক সংস্কার কিংবা নিজের দেশে থেকে পরিবর্তন আনার দাবি এবং পরবর্তী পুনরেকত্রীকরণের পথ এক বিষয় নয়। একটি আন্দোলনকে তার শেষ ফল দিয়ে বিচার করলে শুরুতে থাকা আকাঙ্ক্ষার বৈচিত্র্য হারিয়ে যেতে পারে।
আজকের পৃথিবীতে এই ইতিহাসের প্রাসঙ্গিকতা তাই একটি সহজ সূত্রে সীমাবদ্ধ নয়: নিরস্ত্র মানুষ রাস্তায় নামলেই রাষ্ট্র পিছিয়ে যাবে। বহু ক্ষেত্রে শান্তিপূর্ণ মানুষও কঠোর দমনের শিকার হন। লাইপৎসিগের সাফল্যকে সব আন্দোলনের নিশ্চিত ভবিষ্যৎ বলা যাবে না। বরং এর শিক্ষা বুঝতে হলে দেখতে হবে সংগঠন, সামাজিক আস্থা, শৃঙ্খলা, তথ্যের বিস্তার এবং ক্ষমতার ভেতরে তৈরি হওয়া দ্বিধা কীভাবে একসঙ্গে কাজ করেছিল।
সেই সোমবারের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন সম্ভবত মানুষের পরস্পরকে নতুনভাবে দেখা। নাগরিকেরা বুঝেছিলেন, তাঁরা শুধু নজরদারির অধীন বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি নন; তাঁরা একটি জনসমাজের অংশ, যার স্বাধীন কণ্ঠ আছে। রাষ্ট্রও দেখেছিল, ভয় দেখিয়ে তৈরি করা নীরবতা স্থায়ী সম্মতি নয়।
লাইপৎসিগের মানুষ সেদিন ভয়হীন ছিলেন বলে রাস্তায় নামেননি। ভয় থাকা সত্ত্বেও তাঁরা একসঙ্গে দাঁড়িয়েছিলেন। ইতিহাসের মূল্য সেখানেই: সাহস সব সময় ভয় দূর হওয়ার পর আসে না। কখনো মানুষ পরস্পরের পাশে দাঁড়িয়ে ভয়কে এমনভাবে বহন করেন, যাতে তা আর ক্ষমতার একতরফা সম্পদ থাকে না।
আপনার মতামত জানানঃ