ভারতের নির্বাচন কমিশনকে একসময় গণতন্ত্রের অন্যতম শক্তিশালী রক্ষাকবচ হিসেবে দেখা হতো। সরকারের চাপের মুখেও কমিশনের স্বাধীনতা, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কঠোরতা এবং ভোটাধিকার রক্ষায় দৃঢ় অবস্থানের বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে দেশটির ইতিহাসে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই পুরোনো ভাবমূর্তিকে বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বিতর্ক এখন শুধু একজন কর্মকর্তার পদ নিয়ে নয়; বরং ভারতের নির্বাচনব্যবস্থার স্বাধীনতা, ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়েই প্রশ্ন তুলছে।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতার ইতিহাসে প্রথম প্রধান নির্বাচন কমিশনার সুকুমার সেনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। স্বাধীনতার পর প্রায় ৩৬ কোটি মানুষের দেশে প্রথম সাধারণ নির্বাচন আয়োজন ছিল অভূতপূর্ব এক প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ। বিপুলসংখ্যক ভোটার, যাঁদের বড় অংশই ছিলেন নিরক্ষর, তাঁদের তালিকা তৈরি, নির্বাচনী প্রতীক নির্ধারণ, ব্যালট বাক্স প্রস্তুত এবং দুর্গম এলাকায় ভোটের ব্যবস্থা—সবকিছুই ছিল কঠিন কাজ। প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু দ্রুত নির্বাচন চাইলেও সেন প্রস্তুতি ছাড়া নির্বাচনে যেতে রাজি হননি। তাঁর অবস্থান ছিল পরিষ্কার—সরকারের রাজনৈতিক তাগিদ নয়, নির্বাচন আয়োজনের বাস্তব সক্ষমতাই হবে সিদ্ধান্তের ভিত্তি।
নারীর রাজনৈতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও সেনের অবস্থান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ভোটার তালিকায় অনেক নারী নিজেদের নামের পরিবর্তে ‘অমুকের স্ত্রী’ বা ‘অমুকের মা’ হিসেবে পরিচিত হতে চাইলেও সেন তাঁদের নিজস্ব নামে নিবন্ধনের নির্দেশ দেন। অর্থাৎ ভোটার হিসেবে একজন নারী যে স্বতন্ত্র নাগরিক—প্রথম নির্বাচনেই সেই ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।
পরে টি এন শেষনের সময় নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিমা রাওয়ের সরকারের সঙ্গে তাঁর সংঘাত ভারতের নির্বাচনী ইতিহাসে প্রায় কিংবদন্তির পর্যায়ে পৌঁছেছে। নির্বাচন কমিশন কোনো মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান নয়—এই অবস্থান থেকে শেষন সরকারের নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। এমনকি কোনো নির্দিষ্ট আসনে কখন নির্বাচন হবে, সে সিদ্ধান্তেও সরকার হস্তক্ষেপ করতে পারে না বলে তিনি দৃঢ়ভাবে জানিয়েছিলেন।
শেষনের এই অবস্থান দেখিয়েছিল, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার জন্য শুধু আইন যথেষ্ট নয়; দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির প্রাতিষ্ঠানিক আত্মমর্যাদাবোধও গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী সময়ে এস ওয়াই কুরেইশির সময়েও ক্ষমতাসীন ও প্রভাবশালী নেতাদের নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কমিশন কঠোর অবস্থান নেয়। ফলে ভারতের নির্বাচন কমিশন ধীরে ধীরে এমন একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি পায়, যা প্রয়োজনে সরকারের বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে পারে।
কিন্তু আজ সেই ভাবমূর্তিই প্রশ্নের মুখে। অভিযোগের কেন্দ্রে জ্ঞানেশ কুমার এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন কমিশন। বিশেষ করে ভোটার তালিকা সংশোধনের জন্য পরিচালিত স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর নিয়ে বিতর্ক ক্রমেই তীব্র হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এই প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়েছে কিংবা তাঁদের ভোটার পরিচয়কে ‘সন্দেহজনক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিতর্ক আরও গভীর হয়েছে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বরাতে বলা হচ্ছে, জ্ঞানেশ কুমারের দুই সহকর্মী নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে বারবার আপত্তি জানিয়েছেন। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত তাঁরা একাধিকবার লিখিতভাবে নিজেদের আপত্তির কথা জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, তিন সদস্যের কমিশনে যদি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে দুই কমিশনার আপত্তি জানিয়ে থাকেন, তাহলে সেই সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে কার্যকর হলো?
ভারতের নির্বাচন কমিশনের কাঠামো বোঝা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদমর্যাদায় কমিশনের প্রধান হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তিনি অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারের ওপর একক কর্তৃত্ব রাখেন না। সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণেও কমিশনারদের সমান ভূমিকার বিষয়টি উঠে এসেছে। ফলে কমিশনের সিদ্ধান্ত যৌথভাবে নেওয়ার কথা। অথচ সাম্প্রতিক অভিযোগগুলো সত্য হলে দেখা যাচ্ছে, কমিশনের ভেতরেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে ইসিআইনেট নামের ডিজিটাল ব্যবস্থাকে ঘিরে। ভোটার তালিকার তথ্য ব্যবস্থাপনার জন্য এই সফটওয়্যার ব্যবহৃত হচ্ছে। অভিযোগ হলো, স্থানীয় পর্যায়ের ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারদের হাতে যে দায়িত্ব থাকার কথা, বাস্তবে তার একটি বড় অংশ কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।
ভারতের প্রচলিত ব্যবস্থায় ভোটার তালিকা তৈরির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব স্থানীয় ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারদের। তাঁরা নাগরিকদের নথি যাচাই করে নাম অন্তর্ভুক্ত বা বাদ দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন। এর উদ্দেশ্য ছিল ভোটার তালিকা তৈরির ক্ষমতাকে একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের হাতে সম্পূর্ণভাবে কেন্দ্রীভূত না করা।
কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, ইসিআইনেট ব্যবস্থায় স্থানীয় কর্মকর্তাদের প্রবেশাধিকার সীমিত বা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কার্যত সংকুচিত হয়েছে। এর ফলে ভোটার তালিকা তৈরির ক্ষমতা দিল্লির কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে বলে সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
এই বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’, ‘নো ম্যাপিং’ এবং ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’-এর মতো নতুন শ্রেণিবিন্যাস। পশ্চিমবঙ্গে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়া কিংবা তাঁদের তথ্যকে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করার ঘটনা এ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, ভোটারদের তথ্যের সামান্য বানানভুল বা পুরোনো তথ্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যও তাঁদের সন্দেহের তালিকায় ফেলতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এমন একটি ব্যবস্থার ওপর কতটা নির্ভর করা যায়, যার কার্যকারিতা ও নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সফটওয়্যার চালুর পর প্রথম পর্যায়ে বড় ধরনের কারিগরি সমস্যা দেখা দিয়েছিল। এক পর্যায়ে বিপুলসংখ্যক ভোটারকে একই সঙ্গে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করার ঘটনা ঘটে। পরে সেটিকে কারিগরি ত্রুটি বলা হলেও পুরো ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
গণতান্ত্রিক নির্বাচনে প্রযুক্তির ব্যবহার অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রযুক্তি কখনোই মানুষের ভোটাধিকার নির্ধারণের চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ হতে পারে না—এটাই মূল প্রশ্ন। একটি অ্যালগরিদম যদি কোনো ভোটারের নামের বানান, বয়সের তথ্য বা পুরোনো নথির সঙ্গে অসামঞ্জস্য খুঁজে পায়, তাহলে তার ভিত্তিতে একজন নাগরিককে সন্দেহজনক করে তোলার আগে মানবিক ও আইনি যাচাই অপরিহার্য। কারণ ভোটার তালিকা কোনো সাধারণ ডেটাবেস নয়; এটি নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার নির্ধারণ করে।
এসআইআর নিয়ে আরেকটি বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে ফরম-৬ পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে। নতুন একটি ঘোষণাপত্রে ভোটারকে তাঁর নিজের বা পরিবারের সদস্যদের পুরোনো ভোটার তালিকায় নাম থাকার বিষয়ে তথ্য দিতে বলা হয়েছিল। নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্য এ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তাঁদের যুক্তি ছিল, নির্ধারিত আইনি ফরমে এমন পরিবর্তন আনতে হলে সংশ্লিষ্ট বিধি সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে।
পরে বিতর্কের মধ্যে ওই অতিরিক্ত ঘোষণাপত্রের ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এতে সমালোচকদের প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে—যদি পরিবর্তনটি প্রয়োজনীয় ও আইনসম্মতই হয়ে থাকে, তাহলে পরে সেটি প্রত্যাহার করতে হলো কেন?
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভিআইপি ভোটারদের অভিযোগ। কিছু অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থায় বিচারক, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, পুলিশ কর্মকর্তা ও পরিচিত ব্যক্তিদের মতো কিছু নাগরিককে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, যাতে তাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ না পড়ে। অভিযোগটি সত্য হলে সেটি ‘এক ব্যক্তি, এক ভোট, সমান মূল্য’—এই গণতান্ত্রিক নীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। কারণ ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষেত্রে কোনো নাগরিকের পরিচয় বা সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে আলাদা সুরক্ষা থাকা উচিত নয়।
অন্যদিকে তরুণ ভোটারদের নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৪ সালের পর নতুন করে ১৮ বছর পূর্ণ করা অনেক তরুণ ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের সুযোগ থেকে পিছিয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে জেন-জি ভোটারদের নিয়ে রাজনৈতিক সন্দেহের আবহে এই বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। নির্বাচন কমিশন কেন সময়মতো ভোটার তালিকা হালনাগাদ করেনি, সেটিও এখন রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ।
সব অভিযোগের মধ্যেই রাজনৈতিক বিরোধীরা জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিয়েছেন। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়গে তাঁকে ‘মোদির হাতের পুতুল’ বলেছেন। রাহুল গান্ধী তাঁকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দিয়ে পদত্যাগ দাবি করেছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ বিরোধী নেতারাও কমিশনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন। রাজপথে আন্দোলনও শুরু হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক অভিযোগ আর প্রমাণিত সত্য এক বিষয় নয়। জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ওঠা প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট নথির স্বাধীন যাচাই জরুরি। কারণ নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, সেটিকে রাজনৈতিক বক্তব্যের স্তরে রেখে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত, আদালতের পর্যবেক্ষণ এবং কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার পূর্ণ জবাবদিহি।
এখানে আরও বড় একটি প্রশ্ন রয়েছে—নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগব্যবস্থা কতটা স্বাধীন? ২০২৩ সালের আইনি পরিবর্তনের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের বাছাই কমিটিতে সরকারের প্রভাব বেড়েছে বলে সমালোচনা রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের প্রস্তাবিত কাঠামোয় প্রধান বিচারপতির ভূমিকার বদলে একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর অন্তর্ভুক্তি নিয়ে বিরোধীদের আপত্তি ছিল। এর ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীন সরকারের প্রভাব বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই জায়গাতেই জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বর্তমান বিতর্ক আরও রাজনৈতিক তাৎপর্য পায়। একজন নির্বাচন কমিশনার যদি সরকারের পছন্দের মাধ্যমে নিয়োগ পান, তাহলে তিনি পরে সরকারের বিরুদ্ধে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন কি না—এটি গণতন্ত্রের মৌলিক প্রশ্ন। তবে একই সঙ্গে এটিও সত্য যে নিয়োগের কাঠামো নিয়ে বিতর্ক থাকলেই কোনো নির্দিষ্ট কমিশনারের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে সরকারের নির্দেশিত সিদ্ধান্ত হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না।
ভারতের গণতন্ত্রের শক্তি শুধু নির্বাচন অনুষ্ঠানে নয়; নির্বাচন কতটা বিশ্বাসযোগ্য, ভোটার তালিকা কতটা নির্ভুল, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা কতটা সমান সুযোগ পাচ্ছে এবং নির্বাচন কমিশন কতটা স্বাধীন—তার ওপরও নির্ভর করে।
সুকুমার সেন থেকে টি এন শেষন, এস ওয়াই কুরেইশি—ভারতের নির্বাচন কমিশনের ইতিহাসে এমন অনেক উদাহরণ আছে, যেখানে কমিশন সরকারের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেও নিজের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেছে। সেই ঐতিহ্যের বিপরীতে যদি বর্তমান কমিশনের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয়করণ, অস্বচ্ছ সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে ক্ষতিটা শুধু জ্ঞানেশ কুমারের হবে না; ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভারতের নির্বাচন কমিশনের দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা।
আর সেখানেই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি নরেন্দ্র মোদি সরকারের জন্য। কারণ নির্বাচন কমিশন নিয়ে আস্থা নষ্ট হলে বিরোধীদের অভিযোগ শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য থাকবে না; তা ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলবে।
শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্নটি শুধু ‘জ্ঞানেশ কুমার থাকবেন কি না’—এতটুকু নয়। প্রশ্ন হলো, ভারতের নির্বাচন কমিশন কি আবার সেই জায়গায় ফিরতে পারবে, যেখানে সরকারের ক্ষমতার চেয়ে সংবিধানের ক্ষমতাই বড়? যে প্রতিষ্ঠান একসময় ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীকেও বলতে পারত—‘আদেশ নয়, যুক্তি দিন’—সেই প্রতিষ্ঠান কি আবার একই আত্মমর্যাদা ফিরে পাবে?
উত্তরটি নির্ভর করবে জ্ঞানেশ কুমারের ভবিষ্যৎ নয়, বরং ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা স্বাধীনভাবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে পারে তার ওপর। কারণ একজন নির্বাচন কমিশনার চলে যেতে পারেন, একটি সরকারও বদলে যেতে পারে। কিন্তু ভোটার তালিকা ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি মানুষের আস্থা একবার ভেঙে গেলে সেটি ফিরিয়ে আনা অনেক কঠিন।
আপনার মতামত জানানঃ