
১৭৬২ সালের ৬ অক্টোবর। ইউরোপ থেকে বহু দূরে, ফিলিপাইনের ম্যানিলায় স্পেনের দুর্গে ব্রিটিশ বাহিনী আক্রমণ চালিয়ে শহরটি দখল করে। ঘটনাটি আলাদা কোনো দ্বীপের যুদ্ধ ছিল না। একই সংঘাতের আগুন জ্বলছিল জার্মানির যুদ্ধক্ষেত্রে, কানাডার নদীতীরে, ক্যারিবীয় দ্বীপে এবং ভারতীয় উপমহাদেশে। সমুদ্রপথ সেই দূরবর্তী যুদ্ধক্ষেত্রগুলোকে জুড়ে দিয়েছিল।
সাত বছরের যুদ্ধকে অনেক সময় ইতিহাসের প্রথম ‘বিশ্বযুদ্ধ’ বলা হয়। কথাটি আনুষ্ঠানিক নাম নয়; এর বৈশ্বিক বিস্তার বোঝানোর একটি পরিচয়। ১৯১৪ বা ১৯৩৯ সালের যুদ্ধের সঙ্গে এর প্রযুক্তি, গণসমাবেশ কিংবা ধ্বংসের মাত্রা এক ছিল না। তার আগেও আন্তমহাদেশীয় সংঘাত হয়েছে। তবু আঠারো শতকের এই যুদ্ধ দেখিয়েছিল, সাম্রাজ্যের বাণিজ্য ও সামরিক যোগাযোগ এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে একটি অঞ্চলের বিরোধ অন্য অঞ্চলের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।
ইউরোপে যুদ্ধটির প্রচলিত সময়সীমা ১৭৫৬–১৭৬৩। কিন্তু উত্তর আমেরিকার সংশ্লিষ্ট সংঘাত শুরু হয়েছিল ১৭৫৪ সালে। সেখানে ব্রিটিশ ও ফরাসি উপনিবেশের সীমান্তবিরোধ, বিশেষ করে ওহাইও উপত্যকায় প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা, বড় যুদ্ধের পথ তৈরি করে। তরুণ জর্জ ওয়াশিংটনও এই প্রাথমিক সংঘাতে অংশ নিয়েছিলেন—স্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা হওয়ার বহু আগে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার একজন সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে।
ইউরোপের হিসাব, সমুদ্রের সাম্রাজ্য
যুদ্ধের সব পক্ষ একই উদ্দেশ্যে লড়ছিল না। মধ্য ইউরোপে অস্ট্রিয়া ও প্রুশিয়ার প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে ছিল সিলেশিয়া। অন্যদিকে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের বিরোধে উপনিবেশ, বন্দর ও বাণিজ্যপথ বড় ভূমিকা রাখে। যুদ্ধের সময়ে ব্রিটেন প্রুশিয়ার পাশে দাঁড়ায়; ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া ও রাশিয়া প্রুশিয়াবিরোধী পক্ষের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে ওঠে। পুরোনো শত্রুতা ও নতুন নিরাপত্তার হিসাব মিলে জোটের বিন্যাস বদলে যায়।
এই সংঘাতে স্থলবাহিনী যত জরুরি ছিল, নৌবাহিনীও ততটাই। দূরের দুর্গে সৈন্য পাঠাতে, গোলাবারুদ পৌঁছাতে এবং প্রতিপক্ষের সরবরাহ আটকাতে সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। যুদ্ধক্ষেত্রে দক্ষ সেনাপতি থাকলেও সাহায্যবাহী জাহাজ না পৌঁছালে তার অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ত। ব্রিটেনের সামুদ্রিক শক্তি তাই বিচ্ছিন্ন লড়াইগুলোকে একটি সাম্রাজ্যিক অভিযানে পরিণত করার সুযোগ দেয়।
উত্তর আমেরিকায় ব্রিটিশ সাফল্য শুরু থেকেই নিশ্চিত ছিল না। প্রথম দিকে তারা গুরুতর পরাজয় বরণ করে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সামরিক সম্পদ বৃদ্ধি এবং ফরাসি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতি বদলে দেয়। ১৭৫৯ সালে কুইবেকের পতন কানাডায় ফরাসি ক্ষমতার জন্য বড় আঘাত হয়ে আসে।
পলাশীকে শুধু বাংলার ভেতর থেকে দেখা যায় না
বাংলার ইতিহাসে পলাশী সাধারণত সিরাজউদ্দৌলা, মীর জাফর ও রবার্ট ক্লাইভের ঘটনাপ্রবাহ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এর পেছনে ব্রিটিশ–ফরাসি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতাও সক্রিয় ছিল। কোম্পানির বাণিজ্যিক সুবিধা, দুর্গ নির্মাণ এবং নবাবের কর্তৃত্ব নিয়ে বিরোধের সঙ্গে ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা মিশে যায়। ১৭৫৭ সালের মার্চে ব্রিটিশরা ফরাসি চন্দননগর দখল করে; জুনে ঘটে পলাশীর যুদ্ধ।
এই যোগসূত্র মানে সিরাজউদ্দৌলা কেবল ফ্রান্সের প্রতিনিধি ছিলেন, তা নয়। বাংলার শাসনক্ষমতা ও কোম্পানির আচরণ নিয়ে তাঁর নিজস্ব বিরোধ ছিল। একইভাবে নবাবের দরবারের অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রভাবশালী আর্থিক স্বার্থ এবং মীর জাফরের সঙ্গে কোম্পানির গোপন সমঝোতা ছাড়া পলাশীর ফল ব্যাখ্যা করা অসম্পূর্ণ। স্থানীয় রাজনীতি ও বৈশ্বিক যুদ্ধ এখানে একে অন্যকে প্রভাবিত করেছে।
পলাশীর জয়ে গোটা ভারত সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ শাসনে চলে যায়নি। কোম্পানির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ছিল দীর্ঘ প্রক্রিয়া। যুদ্ধের প্রচলিত সময়সীমার বাইরে, ১৭৬৫ সালে কোম্পানির দেওয়ানি লাভ সেই প্রক্রিয়ায় বড় পরিবর্তন আনে। রাজস্ব সংগ্রহের অধিকার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানটিকে প্রশাসনিক ও সামরিক ক্ষমতার নতুন ভিত্তি দেয়। বাংলার আয় ব্যবহার করে ভারতীয় পণ্য কেনা এবং কোম্পানির শাসনযন্ত্র চালানোর সুযোগ তৈরি হয়।
সুতরাং বাংলার জন্য এই ইতিহাসের গুরুত্ব শুধু একটি যুদ্ধের পরাজয়ে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে প্রশ্ন হলো, কীভাবে একটি বিদেশি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সামরিক প্রভাব ধীরে ধীরে রাজস্ব ও শাসনের অধিকারে রূপ নিল। সাম্রাজ্যের মানচিত্র কাগজে আঁকার আগেই তার আর্থিক ভিত্তি মানুষের উৎপাদন ও করের ওপর দাঁড়াতে শুরু করে।
১৭৬৩: কে কী পেল, কে কী হারাল
১৭৬৩ সালের প্যারিস চুক্তি ব্রিটেন, ফ্রান্স ও স্পেনের সংঘাতের অবসান ঘটায়। কানাডা ব্রিটেনের হাতে যায়। মিসিসিপির পূর্বদিকে ফরাসি দাবিকৃত ভূখণ্ডের বড় অংশও ব্রিটেন পায়, নিউ অরলিন্স বাদে। স্পেন ফ্লোরিডা ছেড়ে দেয় এবং হাভানা ফেরত পায়। মিসিসিপির পশ্চিমের লুইজিয়ানা ও নিউ অরলিন্স ফ্রান্স থেকে স্পেনের হাতে যাওয়ার ব্যবস্থা পৃথক চুক্তিতে হয়েছিল।
ভূখণ্ডের আয়তনই অবশ্য সব পক্ষের কাছে সম্পদের একমাত্র মাপকাঠি ছিল না। ফ্রান্স ক্যারিবীয় অঞ্চলের লাভজনক চিনি উৎপাদনকারী দ্বীপ ফেরত পাওয়াকে গুরুত্ব দেয়। বিশাল কানাডার তুলনায় ছোট দ্বীপের আয় তখন বেশি আকর্ষণীয় হতে পারত। এই হিসাবের আড়ালে ছিল দাসত্বের ওপর দাঁড়ানো বাগান অর্থনীতি—সাম্রাজ্যের মুনাফা যাদের শ্রম থেকে আসত, শান্তিচুক্তির ভাষায় তাদের জীবন প্রায় অদৃশ্য।
ইউরোপে হুবার্টুসবুর্গের চুক্তি যুদ্ধপূর্ব ভূখণ্ডগত অবস্থান মূলত ফিরিয়ে আনে। প্রুশিয়া সিলেশিয়া ধরে রাখে। অর্থাৎ সব যুদ্ধক্ষেত্রে মানচিত্র সমানভাবে বদলায়নি। কোথাও ভূখণ্ড হস্তান্তর হয়েছে, কোথাও বিদ্যমান দখল টিকে গেছে, আর কোথাও ভবিষ্যৎ আধিপত্যের পথ প্রশস্ত হয়েছে।
বিজয়ের ভেতরে পরবর্তী সংকট
ব্রিটেন বড় বিজয়ী হলেও যুদ্ধের ব্যয় তাকে ঋণের চাপে ফেলে। উত্তর আমেরিকার উপনিবেশ থেকে কর আদায় বাড়ানো এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের নীতি নিয়ে বিরোধ তীব্র হয়। এই টানাপোড়েন পরবর্তী স্বাধীনতা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি তৈরি করে। সাত বছরের যুদ্ধ একাই আমেরিকান বিপ্লব ঘটিয়েছে বলা যাবে না; তবে সাম্রাজ্যের জয় তার নিজের উপনিবেশের সঙ্গে সম্পর্কেও নতুন সংকট তৈরি করেছিল।
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্যও ব্রিটিশ বিজয় গভীর পরিবর্তন আনে। ফরাসি ও ব্রিটিশ শক্তির প্রতিযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের ভূমি ও রাজনৈতিক অবস্থান রক্ষার কূটনৈতিক সুযোগ সংকুচিত হয়। ইউরোপীয় শান্তিচুক্তি তাদের ভূমির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করলেও তারা সেই আলোচনার সমান অংশীদার ছিল না।
সাত বছরের যুদ্ধের উত্তরাধিকার তাই বিজয়ী রাজা ও সেনাপতির তালিকার চেয়ে বড়। ইউরোপের ক্ষমতার হিসাব, আটলান্টিকের বাণিজ্য, বাংলার রাজস্ব এবং উপনিবেশের মানুষের জীবন একই ব্যবস্থায় জড়িয়ে যায়। আমাদের জন্য পলাশীকে সেই বৃহত্তর ইতিহাসে রাখা জরুরি—তাতে স্থানীয় দায় আড়াল হয় না, বরং বোঝা যায় কীভাবে স্থানীয় বিভাজনকে বাইরের সাম্রাজ্যিক শক্তি কাজে লাগাতে পেরেছিল।
‘প্রথম বিশ্বযুদ্ধ’ পরিচয়টি নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু যুদ্ধটির শিক্ষা স্পষ্ট: সাম্রাজ্যের সীমানা বদলানোর সিদ্ধান্ত দূরের রাজধানীতে নেওয়া হলেও তার দীর্ঘ মূল্য দেয় সেই ভূখণ্ডের মানুষ। ১৭৬৩ সালে যুদ্ধ থেমেছিল; তার তৈরি শাসন, কর ও প্রতিরোধের ইতিহাস তখনো শুরু হচ্ছিল।
আপনার মতামত জানানঃ