
একটি মানিব্যাগ পড়ে আছে নির্জন পথে। আশপাশে কেউ নেই। কোনো ক্যামেরায় আপনার মুখ ধরা পড়বে না। মালিকও জানতে পারবেন না, মানিব্যাগটি কে পেয়েছিল। আপনি সেটি ফিরিয়ে দেবেন, নাকি টাকা রেখে চলে যাবেন? প্রশ্নটি টাকার পরিমাণ নিয়ে নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, কেউ দেখছে না—এই নিশ্চয়তা আমাদের সিদ্ধান্ত কতটা বদলে দেয়।
আমরা সাধারণত নিজেদের ভালো মানুষ ভাবতে পছন্দ করি। কিন্তু নিজের নৈতিকতা সম্পর্কে আমাদের ধারণা এবং সুবিধা পেলে আমরা কী করব—এই দুটির মধ্যে দূরত্ব থাকতে পারে। শাস্তির ভয় সেই দূরত্ব আড়াল করে রাখতে পারে। আবার এমন আচরণও কল্পনা করা যায়, যেখানে কোনো পুরস্কার বা শাস্তির হিসাব ছাড়াই একজন মানুষ অন্যের অধিকারকে গুরুত্ব দেন। তাই ভয় সরে গেলেই সবাই অনৈতিক হয়ে যাবেন—এমন সিদ্ধান্তও অতিরিক্ত সরল।
নৈতিকতার এই প্রশ্ন নতুন নয়। প্লেটোর ‘রিপাবলিক’-এর দ্বিতীয় বইয়ে গ্লাউকন একটি আংটির গল্প বলেন। আংটিটি পরিধানকারীকে অদৃশ্য হওয়ার ক্ষমতা দেয়। প্রচলিতভাবে ‘গাইজিসের আংটি’ নামে পরিচিত এই কাহিনিতে অদৃশ্যতার সুযোগ ক্ষমতা দখল ও অন্যায় করার পথ খুলে দেয়। গ্লাউকনের চ্যালেঞ্জ হলো, ধরা পড়ার আশঙ্কা না থাকলে ন্যায়পরায়ণ মানুষও কি অন্যায়ের দিকে যাবেন? এটি প্লেটোর সংলাপে উত্থাপিত একটি যুক্তি; মানুষের আচরণ সম্পর্কে পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত নয়।
আজ সেই আংটি কল্পনা করতে জাদুর প্রয়োজন নেই। নিজের পরিচয় লুকানোর সুযোগ, তদারকির বাইরে থাকা একটি হিসাব কিংবা প্রশ্ন করার ক্ষমতাহীন মানুষের ওপর কর্তৃত্ব—এসব পরিস্থিতি একই ধরনের নৈতিক প্রশ্ন তৈরি করে। এগুলো প্রাচীন কাহিনির আধুনিক উপমা। প্রত্যেক ক্ষেত্রে মূল কথা: সুযোগ পেলেই কি অন্যের ক্ষতি করার অধিকার জন্মায়?
প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে আচরণ ও প্রেরণাকে আলাদা করতে হবে। কেউ জরিমানার ভয়ে ট্রাফিক সংকেত মানেন। কেউ দুর্ঘটনায় অন্যের ক্ষতির কথা ভেবে মানেন। বাইরে থেকে দুজনের কাজ একই। কিন্তু তাঁদের সিদ্ধান্তের কারণ এক নয়। প্রথম ব্যক্তি শাস্তি এড়াতে সফল হয়েছেন; দ্বিতীয় ব্যক্তি অন্যের নিরাপত্তাকে নিজের সিদ্ধান্তের অংশ করেছেন। ফলের মূল্য আছে, আবার প্রেরণার মূল্যও আছে।
কান্ট এই পার্থক্যকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর ‘গ্রাউন্ডওয়ার্ক’-এ একজন ব্যবসায়ীর উদাহরণ আসে, যিনি অনভিজ্ঞ ক্রেতার কাছেও অতিরিক্ত দাম নেন না। তবে ব্যবসা ও সুনামের স্বার্থে সৎ থাকা থেকে কর্তব্যবোধে সৎ থাকা আলাদা। কান্টের মতে, কর্তব্যের প্রতি শ্রদ্ধা থেকে কাজ করার বিশেষ নৈতিক মূল্য রয়েছে। তাঁর যুক্তি থেকে আমাদের জন্য প্রশ্নটি দাঁড়ায়: আমি কি সৎ থাকছি কারণ সততা ঠিক, নাকি অসততা আমার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ?
তবে বাস্তব মানুষের প্রেরণা প্রায়ই মিশ্র। মানিব্যাগ ফেরত দেওয়ার সময় একই সঙ্গে মালিকের কষ্টের কথা ভাবা, নিজের মূল্যবোধ ধরে রাখা এবং ভালো কাজের তৃপ্তি পাওয়া সম্ভব। ভালো কাজ করে স্বস্তি পেলেই কাজটি স্বার্থপর হয়ে যায় না। আনন্দ বা আত্মমর্যাদার উপস্থিতি অন্যের প্রতি যত্নকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিথ্যা করে না। নৈতিকতা বিচার করতে গিয়ে মানুষের ভেতরের প্রতিটি ইতিবাচক অনুভূতিকে সন্দেহের চোখে দেখাও অনাবশ্যক।
সহমর্মিতা এখানে একটি স্বতন্ত্র কারণ। মানিব্যাগে থাকা টাকা হয়তো কারও ওষুধ কেনার জন্য। অফিসে অন্যের কৃতিত্ব নিজের নামে নেওয়া তাঁর জীবিকার সুযোগ কমাতে পারে। একটি গোপন অপমানও যার প্রতি করা হচ্ছে, তাঁর কাছে বাস্তব ক্ষতি। কেউ আমাকে শাস্তি দেবেন কি না, সেই প্রশ্নের বাইরেও আক্রান্ত মানুষটির অভিজ্ঞতা আছে। নৈতিক মনোযোগ নিজের ঝুঁকি থেকে অন্যের অবস্থার দিকে সরতে পারে।
কিন্তু কেবল অনুভূতির ওপর নির্ভর করাও যথেষ্ট নয়। আমরা পরিচিত মানুষের দুঃখ সহজে বুঝতে পারি; অপরিচিতের দুঃখ উপেক্ষা করতে পারি। প্রতিপক্ষের ক্ষতি আনন্দও দিতে পারে। তখন প্রয়োজন এমন নীতি, যা পছন্দের মানুষের বাইরেও প্রযোজ্য। আমার পরিচিতকে ঠকানো ভুল হলে অপরিচিতকে ঠকানো কেন ঠিক হবে? নিজের জন্য যে সম্মান চাই, তা অন্যের ক্ষেত্রেও স্বীকার করার যুক্তি এখানেই।
অ্যারিস্টটল নৈতিক চরিত্র গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে অভ্যাসের গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর ‘নিকোম্যাকিয়ান এথিকস’-এ নৈতিক গুণকে বারবার কাজ করার মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বভাব হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। ন্যায়সংগত কাজের অনুশীলন ন্যায়পরায়ণ চরিত্র গড়তে সাহায্য করে। তবে ভালো চরিত্র নিছক যান্ত্রিক নিয়ম পালন নয়; বিচারের ক্ষমতা ও সচেতন নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ।
এই ধারণা দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগ করলে দেখা যায়, বড় পরীক্ষার প্রস্তুতি ছোট সিদ্ধান্তে তৈরি হতে পারে। ভুল করে বেশি ফেরত পাওয়া টাকা ফিরিয়ে দেওয়া, অনুপস্থিত সহকর্মীর কৃতিত্ব স্বীকার করা কিংবা দুর্বল কারও সঙ্গে সম্মান বজায় রাখা—প্রতিটি সিদ্ধান্তে আমরা একটি আচরণের ধরন অনুশীলন করি। একইভাবে বারবার নিজের সুবিধার জন্য ব্যতিক্রম তৈরি করলে অন্যায়কে গ্রহণযোগ্য বলার ভাষাও গড়ে উঠতে পারে। এটি চরিত্র নিয়ে ভাবার একটি দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি, ভবিষ্যৎ আচরণ নিশ্চিতভাবে গণনার সূত্র নয়।
শাস্তির ভয় ছাড়া নৈতিকতা নিয়ে ভাবতে গেলে আরও একটি পার্থক্য জরুরি: আইনসম্মত হওয়া এবং ন্যায়সংগত হওয়া অভিন্ন নয়। আইনের ফাঁক ব্যবহার করে করা কোনো কাজ অন্যের প্রতি অসৎ হতে পারে। আবার কোনো অন্যায্য নিয়মের বিরোধিতা করতে গিয়ে মানুষ শাস্তির মুখে পড়তে পারেন। তাই শাস্তি এড়ানোর দক্ষতা দিয়ে নৈতিকতার পূর্ণ মান নির্ধারণ করা যায় না। নিয়মটি কী দাবি করছে এবং কার অধিকার রক্ষা বা ক্ষুণ্ন করছে, সেটিও বিচার করতে হয়।
একই কারণে ‘কেউ দেখছে না’ পরীক্ষাটি মূল্যবান হলেও অসম্পূর্ণ। মানুষ সামাজিক সম্পর্কে বাস করেন। বিশ্বাস, লজ্জা, ভালোবাসা, অভ্যাস, ধর্মীয় বিশ্বাস কিংবা আত্মসম্মান—বিভিন্ন কারণ সিদ্ধান্তে জায়গা নিতে পারে। কাউকে কল্পনায় সমস্ত সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে তাঁর আচরণ অনুমান করা বাস্তব নৈতিকতার সম্পূর্ণ ছবি দেয় না। শাস্তির অনুপস্থিতি একটি কারণ সরায়; মানুষের বাকি সমস্ত কারণ মুছে দেয় না।
এখানে বিপরীত ভুলটি হচ্ছে, ভালো মানুষ থাকলেই প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহির প্রয়োজন শেষ—এমন ভাবা। জনসম্পদ পরিচালনায় ব্যক্তির বিবেকের পাশাপাশি যাচাইয়ের ব্যবস্থা প্রয়োজন। ক্ষমতাবান ব্যক্তি সৎ কি না, সেই অনুমানের ওপর অন্য মানুষের অধিকার ছেড়ে দেওয়া যায় না। প্রশ্ন করার সুযোগ, স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত ও ন্যায্য প্রতিকার একটি সমাজের নৈতিক দায়িত্বের অংশ হতে পারে। এগুলোর উদ্দেশ্য শুধু অপরাধীকে ভয় দেখানো নয়; ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অবস্থানও রক্ষা করা।
শাস্তির ব্যবস্থা থাকলেই সেটি ন্যায়সংগত হয়ে যায় না। প্রমাণ ছাড়া শাস্তি, অপমানকে শাসন মনে করা কিংবা একই ভুলে দুর্বলকে শাস্তি দিয়ে শক্তিমানকে ছাড় দেওয়া নৈতিকতার সমস্যা বাড়ায়। দায়িত্বশীল জবাবদিহি এবং প্রতিহিংসা এক জিনিস নয়। নৈতিক সমাজের প্রশ্ন তাই শুধু মানুষ কেন নিয়ম মানবে, তা নয়; যারা নিয়ম প্রয়োগ করছে, তারা কীভাবে ন্যায় বজায় রাখবে, সেটিও।
নিজের অবস্থান বোঝার জন্য কয়েকটি প্রশ্ন কাজে আসতে পারে। কাজটি গোপন থাকবে জানলেও কি করতাম? যার ক্ষতি হচ্ছে, তাঁর অবস্থানে থাকলে কি একই যুক্তি মেনে নিতাম? অন্য সবাই একই সুবিধা নিলে কি ব্যবস্থাটি ন্যায্য থাকত? আর ভুল ধরা পড়লে কি ক্ষতি স্বীকার করে সংশোধন করতাম, নাকি শুধু নিজের ভাবমূর্তি রক্ষা করতাম? এগুলো নৈতিকতার নম্বর দেওয়ার পরীক্ষা নয়; আত্মপক্ষসমর্থন থামিয়ে ভাবার সুযোগ।
শেষ পর্যন্ত আমরা শাস্তির ভয় ছাড়া কতটা নৈতিক থাকব, তার সবার জন্য এক উত্তর নেই। তবে ভয় ছাড়া নৈতিক থাকার কারণ আছে: অন্যের ক্ষতি বাস্তব, সম্পর্কের বিশ্বাস মূল্যবান, এবং নিজের সিদ্ধান্তের দায় এড়িয়ে যাওয়া যায় না। শাস্তির ভয় অন্যায়ের পথে বাধা হতে পারে। বিবেক, সহমর্মিতা ও বিচারবোধ আমাদের সেই পথ বেছে না নেওয়ার কারণ দিতে পারে।
নির্জন পথে পড়ে থাকা মানিব্যাগের মালিক হয়তো কখনো জানবেন না, কে সেটি ফিরিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু তাঁর ক্ষতি এড়ানোর মূল্য সেই অজ্ঞাত পরিচয়ের কারণে কমে যায় না। নৈতিকতার গভীর প্রশ্নটি এখানেই: কেউ আমাকে ধরতে পারবেন কি না, তার পাশাপাশি আমি কি দেখতে পাচ্ছি—আমার সিদ্ধান্তে অন্য একজন মানুষের কী হচ্ছে?
আপনার মতামত জানানঃ