
জনসংখ্যার চাপ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যানজট, ফুটপাত দখল, নাগরিক সেবার সংকট ও সমন্বয়হীন উন্নয়ন—সব মিলিয়ে বসবাসের অযোগ্যতার দিকে এগোচ্ছে রাজধানী।
ঢাকা। প্রতিদিন ভোরে ঘুম ভাঙার আগেই যেন জেগে ওঠে এই শহর। কেউ ছুটছেন জীবিকার সন্ধানে, কেউ কর্মস্থলে, কেউবা চিকিৎসা কিংবা শিক্ষার প্রয়োজনে। বাস, ট্রেন, লঞ্চ কিংবা ব্যক্তিগত গাড়িতে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এসে ভিড় করেন রাজধানীতে। তাঁদের কারও গন্তব্য কয়েক ঘণ্টার জন্য, আবার কেউ স্থায়ীভাবে থেকে যান এই শহরে। স্বপ্নের খোঁজে আসা মানুষের ভিড়ে প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে ঢাকার চেহারা। বাড়ছে জনসংখ্যা, গড়ে উঠছে নতুন নতুন ভবন, বিস্তৃত হচ্ছে নগরীর সীমানা। কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়ছে না নাগরিক সুযোগ-সুবিধা। বরং একের পর এক সংকটে ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে রাজধানীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
একসময় ঢাকা ছিল ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র। আজও দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র এই মহানগরী। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অতিরিক্ত জনসংখ্যা, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা শহরটিকে ঠেলে দিচ্ছে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে রাজধানীতে বসবাস করাটাই অনেকের কাছে প্রতিদিনের সংগ্রামে পরিণত হয়েছে। নাগরিক সুযোগ-সুবিধার তুলনায় মানুষের সংখ্যা এতটাই বেড়েছে যে, ঢাকাকে ক্রমেই একটি বিশাল বস্তিতে পরিণত হওয়ার পথে এগিয়ে যাওয়া নগরী হিসেবে দেখছেন অনেকে।
ঢাকার সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি জনসংখ্যার চাপ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন মানুষ আসছেন রাজধানীতে। গ্রাম কিংবা মফস্বলে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব, উন্নত চিকিৎসার সীমিত সুযোগ, মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বল্পতা এবং নানা ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা মানুষকে ঢাকামুখী করছে। রাজধানীতে একটি চাকরি, সন্তানের ভালো স্কুল, পরিবারের চিকিৎসা কিংবা একটু উন্নত জীবনযাপনের আশায় মানুষ এখানে এসে ভিড় করছেন। কিন্তু এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত আবাসন, পরিবহন, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পয়ঃনিষ্কাশন ও অন্যান্য সেবা নিশ্চিত করার সক্ষমতা নগর ব্যবস্থাপনায় কতটা রয়েছে, সেই প্রশ্ন ক্রমেই বড় হয়ে উঠছে।
মানুষের সংখ্যা বাড়লেও শহরের আয়তন ও অবকাঠামোর ওপর চাপ সামাল দেওয়ার পরিকল্পনা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। একদিকে বহুতল ভবন নির্মাণ করে নগরীর আবাসন চাহিদা পূরণের চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে বাড়ছে ঘনবসতি। অনেক এলাকায় সরু গলির দুই পাশে গড়ে উঠেছে ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক ভবন। কোথাও ভবনের পাশে পর্যাপ্ত খোলা জায়গা নেই, কোথাও নেই পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা। অনেক এলাকায় অগ্নিনির্বাপণ যানবাহন প্রবেশের মতো পর্যাপ্ত রাস্তা পর্যন্ত নেই। অথচ এসব এলাকার বাসিন্দাদের প্রতিনিয়ত আগুন, ভূমিকম্প কিংবা অন্য কোনো দুর্যোগের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে।
রাজধানীর ফুটপাতের চিত্র নগর ব্যবস্থাপনার আরেকটি বড় ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। নাগরিকদের নিরাপদে হাঁটার জন্য নির্মিত ফুটপাতের বড় অংশই এখন হকার, দোকান, অবৈধ স্থাপনা ও বিভিন্ন ধরনের দখলের কবলে। কোথাও ফুটপাতজুড়ে বসেছে অস্থায়ী দোকান, কোথাও আবার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে চলছে ব্যবসা। ফলে পথচারীদের বাধ্য হয়ে মূল সড়কে নামতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি, অন্যদিকে যানবাহনের চলাচলেও তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ। ফুটপাত নির্মাণ ও সংস্কারে প্রতি বছর বিপুল অর্থ ব্যয় করা হলেও সাধারণ মানুষ সেই ফুটপাত ব্যবহার করতে পারছেন না—এটি নগর ব্যবস্থাপনার এক নির্মম বাস্তবতা।
ফুটপাত দখলের পেছনে শুধু অবৈধ ব্যবসা নয়, রয়েছে চাঁদাবাজি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও। অনেক ক্ষেত্রে হকারদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের মাধ্যমে ফুটপাতের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলেও কিছুদিনের মধ্যে আগের অবস্থায় ফিরে আসে পরিস্থিতি। একদিকে জীবিকার তাগিদে ফুটপাতে ব্যবসা করা মানুষের বাস্তবতা, অন্যদিকে পথচারীদের চলাচলের অধিকার—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পরিকল্পিত হকার ব্যবস্থাপনা, নির্দিষ্ট বাজার এলাকা ও কার্যকর নজরদারি ছাড়া ফুটপাতের দখলমুক্ত পরিবেশ ফিরিয়ে আনা কঠিন।
রাজধানীর আরেকটি নিত্যদিনের ভোগান্তির নাম যানজট। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ঢাকার সড়কগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী কিংবা সাধারণ যাত্রী—সবাইকে প্রতিদিন সময়ের সঙ্গে লড়াই করতে হয়। কয়েক কিলোমিটারের পথ পাড়ি দিতেও কখনো কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় হচ্ছে। এতে শুধু মানুষের কর্মঘণ্টাই নষ্ট হচ্ছে না, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অর্থনীতি, বাড়ছে মানসিক চাপ এবং কমে যাচ্ছে জীবনযাত্রার স্বাভাবিক গতি।
ঢাকার যানজটের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। অপরিকল্পিত সড়কব্যবস্থা, গণপরিবহনের দুর্বলতা, ব্যক্তিগত গাড়ির আধিক্য, সড়ক দখল, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অসমন্বিত বাস্তবায়ন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাটারিচালিত রিকশার ব্যাপক বিস্তার। এসব যানবাহন স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের ক্ষেত্রে অনেকের কাছে সহজলভ্য হলেও নিয়ন্ত্রণহীন চলাচল, সড়কে বিশৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তার নানা প্রশ্ন তৈরি করছে। কার্যকর নীতিমালা ও বাস্তবসম্মত বিকল্প পরিবহনব্যবস্থা ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
গণপরিবহনের দুরবস্থাও ঢাকার নাগরিক জীবনের বড় সমস্যা। অনেক বাসের অবস্থা জরাজীর্ণ, যাত্রী ওঠানামায় রয়েছে বিশৃঙ্খলা, নির্দিষ্ট সময়সূচি ও রুট ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রয়েছে। যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং প্রতিযোগিতামূলকভাবে বাস চালানোর অভিযোগও দীর্ঘদিনের। রাজধানীতে গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিক ও সুশৃঙ্খল করার নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। অথচ একটি আধুনিক নগরীর জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন অপরিহার্য।
ঢাকার উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। যানজট কমানো, যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা কিংবা নগরীর আধুনিকায়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন সময়ে বড় বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সব প্রকল্প প্রত্যাশিত সুফল দিতে পারেনি। যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভার তার একটি আলোচিত উদাহরণ। যানজট নিরসনের উদ্দেশ্যে নির্মিত এই অবকাঠামো প্রত্যাশা অনুযায়ী সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। বরং এর আশপাশের সড়ক ও যান চলাচলের ওপর নতুন ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে ঢাকা-গাজীপুর বাস র্যাপিড ট্রানজিট বা বিআরটি প্রকল্পও দীর্ঘসূত্রতা, ব্যয় বৃদ্ধি ও বাস্তবায়ন জটিলতার কারণে আলোচনায় এসেছে। উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্দেশ্য যতই মহৎ হোক, পরিকল্পনা, সমন্বয় ও বাস্তবায়নে দুর্বলতা থাকলে তা নগরবাসীর জন্য নতুন ভোগান্তি তৈরি করতে পারে।
নগরীর আরেকটি গভীর সংকট পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পানির সংকট, গ্যাসের স্বল্পচাপ কিংবা সরবরাহের অনিয়মিত পরিস্থিতি বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। কোথাও পানি সংগ্রহের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে, কোথাও পানির মান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। গ্যাসের সমস্যায় রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা। জনসংখ্যা ও ভবনের সংখ্যা বাড়লেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন সমানতালে না হওয়ায় এসব সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠছে।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ক্ষেত্রেও রাজধানীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা স্পষ্ট। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য রোগীদের ঢাকায় পাঠানো হয়। বিশেষায়িত হাসপাতাল, অভিজ্ঞ চিকিৎসক, উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধা এবং চিকিৎসাসেবার নানা সুযোগ রাজধানীতে তুলনামূলক বেশি থাকায় এই প্রবণতা তৈরি হয়েছে। ফলে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ছে। চিকিৎসা নিতে এসে অনেক পরিবারকে আবাসন, যাতায়াত ও অন্যান্য ব্যয় সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। একইভাবে ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, কোচিং, উচ্চশিক্ষা কিংবা বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের জন্যও ঢাকামুখী হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। জেলা পর্যায়ে মানসম্মত শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে রাজধানীর ওপর এই অতিরিক্ত চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
এদিকে আবাসন সংকটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য ঢাকায় বাসা ভাড়া, খাবার, পরিবহন, শিক্ষা ও চিকিৎসার খরচ বহন করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। আয় বাড়ার তুলনায় ব্যয় দ্রুত বাড়লে মানুষের জীবনযাত্রার মানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে ছোট বাসায় বসবাস করছে, আবার কেউ কেউ শহরের প্রান্তিক এলাকায় গিয়ে বসতি গড়ছে। নিম্ন আয়ের মানুষের একটি বড় অংশ ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি কিংবা অনানুষ্ঠানিক আবাসনে বসবাস করে। সেখানে পর্যাপ্ত পয়ঃনিষ্কাশন, বিশুদ্ধ পানি, নিরাপদ বিদ্যুৎ সংযোগ এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশের অভাব রয়েছে। এই বাস্তবতা নগরীর সামগ্রিক বৈষম্যকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
ঢাকার পরিবেশগত সংকটও দিন দিন বাড়ছে। যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলাবালি, শিল্পকারখানার দূষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং জলাশয় ভরাটের কারণে পরিবেশের ওপর চাপ বাড়ছে। একসময় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খাল, পুকুর ও জলাধার ছিল। নগরায়ণের বিস্তারে অনেক জলাশয় হারিয়ে গেছে কিংবা দখল ও দূষণের শিকার হয়েছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে। সামান্য বৃষ্টিতেই অনেক সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়, ব্যাহত হয় যান চলাচল, দুর্ভোগে পড়েন সাধারণ মানুষ। জলাধার সংরক্ষণ, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই সমস্যার সমাধান কঠিন।
নগর ব্যবস্থাপনার অন্যতম দুর্বলতা হলো বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, রাজউক, ওয়াসা, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, সড়ক ও জনপথ বিভাগসহ একাধিক সংস্থা নগরীর বিভিন্ন সেবা ও অবকাঠামোর দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু প্রতিটি সংস্থার আলাদা পরিকল্পনা, প্রকল্প ও বাস্তবায়ন পদ্ধতির কারণে অনেক সময় সমন্বিত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। কোথাও রাস্তা নির্মাণের পর খনন করা হচ্ছে, কোথাও ড্রেনেজ প্রকল্পের সঙ্গে সড়ক উন্নয়নের সামঞ্জস্য নেই। কোনো এলাকায় এক সংস্থার কাজ শেষ হওয়ার পর অন্য সংস্থার কাজ শুরু হওয়ায় একই সড়কে বারবার খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। এতে অর্থের অপচয় হচ্ছে, মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে এবং অবকাঠামোর স্থায়িত্বও প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান ঢাকার গণপরিবহন সংকটের পেছনে সরকারের ভুল পরিকল্পনাকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মতে, ২০০৫ সালের কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় ঢাকার মতো মহানগরীর পরিবহন সমস্যা সমাধানে সহজ ও কম ব্যয়ের বেশ কিছু উদ্যোগের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শাম্মী আক্তার সেতুর মতে, আবাসন, চাকরি, চিকিৎসা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় রাজধানীতে মানুষের চাপ বাড়ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে নীতিগত পর্যায়ে বিকেন্দ্রীকরণের বিকল্প নেই। জেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, হাসপাতাল ও প্রয়োজনীয় ডায়াগনস্টিক সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে রাজধানীর স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ কমানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের এই বক্তব্যে স্পষ্ট, ঢাকার সংকট কেবল জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফল নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন কাঠামোর ভারসাম্যহীনতা। রাজধানীতে সব সুযোগ-সুবিধা কেন্দ্রীভূত রেখে শুধু নতুন সড়ক, ফ্লাইওভার কিংবা উড়ালপথ নির্মাণের মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন দেশের অন্যান্য শহর ও অঞ্চলে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শিল্পায়ন এবং প্রশাসনিক সুযোগ-সুবিধার বিস্তার। একই সঙ্গে রাজধানীর জনসংখ্যা, আবাসন চাহিদা, পরিবহন সক্ষমতা ও পরিবেশগত সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
ঢাকা আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় রাজধানীর ভূমিকা অপরিসীম, অন্যদিকে এই শহরের বাসযোগ্যতা ক্রমেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। মানুষ শহরে আসছে উন্নত জীবনের আশায়, অথচ সেই শহরেই তাদের প্রতিদিন লড়তে হচ্ছে যানজট, দূষণ, আবাসন সংকট, পানি ও গ্যাসের সমস্যা, ফুটপাত দখল এবং নিরাপত্তাহীনতার সঙ্গে। নগর উন্নয়নের নামে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি মানুষের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
ঢাকাকে বাঁচাতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক নগর পরিকল্পনা। সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়, ফুটপাত দখলমুক্ত করা, গণপরিবহন ব্যবস্থার সংস্কার, জলাশয় সংরক্ষণ, পরিকল্পিত আবাসন, পরিবেশ সুরক্ষা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি রাজধানীর বাইরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে দিতে হবে, যাতে মানুষ বাধ্য হয়ে ঢাকায় আসার পরিবর্তে নিজ নিজ এলাকায় উন্নত জীবন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়।
একটি শহর শুধু উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা বড় বড় প্রকল্পের সমষ্টি নয়। শহরের প্রকৃত উন্নয়ন নির্ভর করে তার বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার মান, নিরাপত্তা, চলাচলের স্বাধীনতা, পরিবেশ এবং মৌলিক সেবা পাওয়ার নিশ্চয়তার ওপর। ঢাকা যদি সেই নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তার আকার যতই বাড়ুক, উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ অধরাই থেকে যাবে। রাজধানীকে একটি বাসযোগ্য মহানগরীতে পরিণত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। তা না হলে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অতিরিক্ত জনসংখ্যা ও অব্যবস্থাপনার চাপে ঢাকা সত্যিই এক বিশাল বস্তির মতো নগরীতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
আপনার মতামত জানানঃ