
মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ইতিহাসে নতুন এক মোড় এনে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ঘোষিত শান্তিচুক্তি। বছরের পর বছর ধরে পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার, প্রক্সি যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনা দুই দেশের সম্পর্ককে সংঘাতের কিনারায় ঠেলে রেখেছিল, সেই বাস্তবতায় হঠাৎ শান্তিচুক্তির ঘোষণা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর। কিন্তু চুক্তি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায়, এই সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির পথ যতটা না সুগম করবে, তার চেয়ে বেশি নতুন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সংকটের জন্ম দিতে পারে। বিশেষ করে ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে দিয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে হওয়া যেকোনো সমঝোতা তেল আবিবের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তিচুক্তির ঘোষণা আসে এমন এক সময়ে, যখন কয়েক মাস ধরে চলা যুদ্ধ, পাল্টাপাল্টি হামলা এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা মধ্যপ্রাচ্যকে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছিল। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ঘোষণা করেন, দুই দেশের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা হয়েছে এবং এর আওতায় লেবাননসহ বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক অভিযান বন্ধের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে স্থায়ী শান্তির ভিত্তি তৈরির জন্য কূটনৈতিক প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়।
ঘোষণার পরপরই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বস্তির আবহ তৈরি হলেও ইসরায়েলে শুরু হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রতিক্রিয়া। দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব, নিরাপত্তা মহল এবং ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো এই চুক্তিকে শুধু সন্দেহের চোখে দেখেনি, বরং অনেকেই এটিকে সরাসরি ইসরায়েলের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে একটি পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। তাদের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা উদ্বেগকে উপেক্ষা করে এমন একটি সমঝোতার পথে এগিয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত ইরানকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে খুব বেশি মন্তব্য না করলেও তাঁর ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে ইসরায়েল এই চুক্তির কোনো বাধ্যবাধকতা স্বীকার করে না। বিশেষ করে লেবানন, সিরিয়া বা গাজা প্রসঙ্গে ইরানের শর্ত মেনে নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না বলে জানিয়েছেন দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তারা। নেতানিয়াহুর অবস্থান থেকে পরিষ্কার, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সমঝোতা হলেও তেল আবিব নিজের নিরাপত্তা নীতিতে কোনো পরিবর্তন আনতে রাজি নয়।
এই প্রতিক্রিয়ার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায় ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজের বক্তব্যে। তিনি ঘোষণা করেন, ইসরায়েলি বাহিনী অনির্দিষ্টকালের জন্য লেবানন, সিরিয়া ও গাজার বিভিন্ন নিরাপত্তা অঞ্চলে অবস্থান করবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো আন্তর্জাতিক সমঝোতা বা রাজনৈতিক চাপের কাছে ইসরায়েল নতি স্বীকার করবে না। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে কার্যত শান্তিচুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্রত্যাখ্যান করে দেশটি।
ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনে চুক্তি নিয়ে ক্ষোভের মাত্রা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন কট্টর ডানপন্থী নেতারা একে ‘ঐতিহাসিক ভুল’ হিসেবে আখ্যা দিতে শুরু করেন। অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ সরাসরি বলেন, এই চুক্তি শুধু ইসরায়েলের জন্য নয়, সমগ্র মুক্ত বিশ্বের জন্য ক্ষতিকর। তাঁর মতে, ইরানকে বিশ্বাস করা যায় না এবং তাদের সঙ্গে যেকোনো সমঝোতা শেষ পর্যন্ত নতুন সংকটের জন্ম দেবে। তিনি আরও দাবি করেন, ইসরায়েলকে একাই প্রয়োজন হলে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যেতে হবে।
জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বলেন, ইসরায়েল কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের অধীন রাষ্ট্র নয়। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে সেই রাজনৈতিক মনোভাব, যেখানে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তকেও চ্যালেঞ্জ করতে প্রস্তুত ইসরায়েল। তিনি মনে করেন, এই চুক্তি বাস্তবে ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না এবং দেশটির নিজস্ব সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকবে।
চুক্তি ঘিরে ক্ষোভ শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যম এবং ডানপন্থী বিশ্লেষকরাও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। অনেকেই মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে নিজের কৌশলগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে দীর্ঘদিনের মিত্র ইসরায়েলকে উপেক্ষা করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। কিছু বিশ্লেষক এমনও দাবি করেছেন যে যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েলকে একা ফেলে দিয়েছে ওয়াশিংটন।
এই ক্ষোভের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের একটি কৌশলগত বাস্তবতা। ইসরায়েল বরাবরই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে নিজের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। দেশটির নিরাপত্তা নীতির বড় একটি অংশ গড়ে উঠেছে এই ধারণার ওপর যে ইরানকে সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ফলে এমন একটি চুক্তি, যেখানে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হচ্ছে, তা অনেক ইসরায়েলির কাছে নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখা স্বাভাবিক।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা ভিন্ন। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ, বিপুল সামরিক ব্যয় এবং মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীলতা ওয়াশিংটনকে নতুন পথ খুঁজতে বাধ্য করেছে। ট্রাম্প প্রশাসন মনে করছে, সংঘাতের পরিবর্তে কূটনৈতিক সমঝোতা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারে। সেই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি, জ্বালানি সরবরাহ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির স্বার্থও এই চুক্তির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
তবে সমঝোতা হলেও বাস্তবতা হলো, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। লেবাননে হিজবুল্লাহ, গাজায় হামাস, সিরিয়ার বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং ইয়েমেনের হুথিদের মতো শক্তিগুলোও এই বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সমীকরণের অংশ। ফলে দুই দেশের মধ্যে কাগজে-কলমে চুক্তি হলেও মাটির বাস্তবতায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত কঠিন হবে।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ইসরায়েলের এই কঠোর অবস্থান ভবিষ্যতে নতুন কূটনৈতিক সংকট সৃষ্টি করতে পারে। যদি তেল আবিব চুক্তির শর্ত অগ্রাহ্য করে লেবানন বা অন্য কোথাও সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখে, তাহলে পুরো সমঝোতা প্রক্রিয়াই প্রশ্নের মুখে পড়বে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও চাপ বাড়বে, কারণ একদিকে তাকে চুক্তির প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের মিত্র ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগও মোকাবিলা করতে হবে।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই চুক্তি বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। বিরোধী নেতারা ইতোমধ্যে নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, বছরের পর বছর কঠোর অবস্থান নেওয়ার পরও ইসরায়েল এমন একটি বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে সমঝোতার পথে হাঁটছে। ফলে নেতানিয়াহুর কৌশল কতটা সফল ছিল, তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট এবং অন্যান্য বিরোধী নেতারা এই সুযোগে বর্তমান সরকারের সমালোচনা আরও জোরালো করেছেন। তাঁদের মতে, দীর্ঘ যুদ্ধ, নিরাপত্তা সংকট এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা ইসরায়েলকে দুর্বল অবস্থানে নিয়ে গেছে। এখন নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রয়োজন, যারা ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করতে পারবে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলেও তা মোটেও নির্বিঘ্ন নয়। বরং এই সমঝোতা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে নতুন উত্তেজনা, নতুন হিসাব-নিকাশ এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। ইসরায়েলের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে দিয়েছে যে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি কেবল দুটি দেশের মধ্যে চুক্তি সইয়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এখানে প্রতিটি আঞ্চলিক শক্তির নিরাপত্তা, স্বার্থ এবং রাজনৈতিক অবস্থান সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
আগামী দিনগুলোতে এই চুক্তি কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে শুধু ওয়াশিংটন ও তেহরানের সদিচ্ছার ওপর নয়; বরং ইসরায়েল, লেবানন, সিরিয়া এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতা কীভাবে পরিবর্তিত হয়, তার ওপরও। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—এই সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে, যার প্রভাব বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অনুভূত হতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ