দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো নিয়ে যখন নানা আলোচনা ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন সেই প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বার্তা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তেলের দাম বাড়িয়ে জনগণের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করা হবে না। বরং যেকোনো মূল্যে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং বাজারে আতঙ্ক বা অস্থিরতা তৈরি হতে না দেওয়াই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। শনিবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেখানে জ্বালানিমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সচিবসহ সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরে তেলের দাম বাড়ানোর একটি প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়েছিল। তবে প্রধানমন্ত্রী সেই প্রস্তাব টেবিলেই থামিয়ে দেন এবং স্পষ্টভাবে বলেন যে, জনগণের স্বার্থ বিবেচনা করে আপাতত দাম বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।
বৈঠকে কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেল বিক্রি করে সরকারের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি এবং আমদানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেলে সরকারকে প্রায় আঠারো থেকে বিশ টাকা পর্যন্ত ক্ষতি গুনতে হচ্ছে। তবু প্রধানমন্ত্রী দাম বাড়ানোর পরিবর্তে সরবরাহ ব্যবস্থাকে সচল রাখার ওপর বেশি গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, সংকটের সময় জনগণের ওপর অতিরিক্ত বোঝা চাপানো ঠিক হবে না। বরং প্রশাসনকে আরও সক্রিয় হতে হবে এবং এমন ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে বাজারে তেলের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকে।
এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই সাধারণ মানুষের স্বস্তির খবর হিসেবে দেখছেন। কারণ দেশে যখনই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ে, তখন তার প্রভাব দ্রুতই পড়ে পরিবহন ভাড়া, কৃষিকাজের খরচ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ওপর। ফলে তেলের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বড় ধরনের চাপ তৈরি করে। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে সরকার আপাতত দাম বাড়ানোর পথ থেকে সরে এসেছে বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে সরকার সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপর জোর দিচ্ছে।
বৈঠকে জ্বালানি বিভাগ জানায়, দেশে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন করে কয়েকটি জাহাজে করে ডিজেল দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, আগামী নয় মার্চ দুটি জাহাজে ডিজেল দেশে আসবে এবং এরপর আরও দুটি জাহাজ আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এই জ্বালানি দেশে পৌঁছালে সরবরাহ পরিস্থিতি আরও স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে কিছু সমস্যার কারণে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে কমতে পারে বলেও বৈঠকে উল্লেখ করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, কোনোভাবেই যাতে জ্বালানি তেলের মজুতদারি বা কৃত্রিম সংকট তৈরি না হয়, সে জন্য কঠোর নজরদারি চালাতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, সংকটের গুজব ছড়ালেই কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত তেল মজুত করে বাজারে কৃত্রিম ঘাটতি তৈরি করার চেষ্টা করে। এতে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ে এবং বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। এই ধরনের অনিয়ম রোধে প্রশাসনকে আরও কঠোর ভূমিকা পালনের নির্দেশ দেন তিনি। প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন জ্বালানিমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং জনগণের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। তিনি সবাইকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ না করার আহ্বান জানান। কারণ অনেক সময় আতঙ্কের কারণে মানুষ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তেল কিনে মজুত করার চেষ্টা করে। এতে সাময়িকভাবে বাজারে চাহিদা বেড়ে যায় এবং সরবরাহে চাপ পড়ে। ফলে সংকটের পরিস্থিতি আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
মন্ত্রী আরও জানান, সরকার নির্ধারিত দামের বেশি নিয়ে কেউ তেল বিক্রি করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ জন্য সারা দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যাচাই করবে, তারা সরকার নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী তেল বিক্রি করছে কি না। কোনো অনিয়ম ধরা পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে দেখা গেছে, জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে মানুষের উদ্বেগ ইতোমধ্যে কিছু জায়গায় ভিড় ও বিশৃঙ্খলার জন্ম দিয়েছে। জ্বালানি তেল রেশনিং কার্যক্রম শুরু হওয়ার প্রথম দিন দেশের বিভিন্ন এলাকায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে তীব্র ভিড় দেখা যায়। অনেক জায়গায় হুড়োহুড়ি ও বাগবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটেছে। মানুষ আশঙ্কা করছিলেন যে তেলের ঘাটতি আরও বাড়তে পারে, তাই অনেকেই অতিরিক্ত তেল নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এই পরিস্থিতিতে রাজধানীর অনেক ফিলিং স্টেশন দুপুরের পরই বন্ধ হয়ে যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় প্রায় একশ পঁচিশটি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে তেল সংকটের কারণে শনিবার দুপুরের মধ্যেই শতাধিক ফিলিং স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। তবে সরকার আশা করছে নতুন জাহাজে করে জ্বালানি দেশে পৌঁছালে এই পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ওঠানামা করায় অনেক দেশই বর্তমানে চাপের মধ্যে রয়েছে। আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি আরও জটিল। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে আমদানির খরচ বেড়ে যায় এবং সরকারকে ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ করতে হয়। ফলে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপও বাড়ে। তবু অনেক সময় সরকার জনগণের স্বার্থ বিবেচনায় দাম স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। সরকার একদিকে অর্থনৈতিক চাপ সামলানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যেন হঠাৎ বেড়ে না যায়, সেদিকেও নজর রাখছে। এই প্রেক্ষাপটে তেলের দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে অনেকেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হলে শুধু আমদানি বাড়ালেই হবে না, বিতরণ ব্যবস্থাও আরও কার্যকর করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত থাকা সত্ত্বেও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে বিভিন্ন এলাকায় ঘাটতি দেখা দেয়। তাই নজরদারি বাড়ানো, পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
অন্যদিকে সাধারণ মানুষও এই পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল আচরণ করতে পারেন। অপ্রয়োজনীয়ভাবে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ না করা, গুজবে কান না দেওয়া এবং স্বাভাবিক ব্যবহার বজায় রাখা বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করতে পারে। সরকারও জনগণের কাছে বারবার আহ্বান জানাচ্ছে যাতে কেউ আতঙ্কিত না হন এবং স্বাভাবিকভাবে জ্বালানি ব্যবহার করেন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সরকারকে কিছুটা সময় এনে দিয়েছে। এই সময়ের মধ্যে সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, নতুন জ্বালানি আমদানি নিশ্চিত করা এবং বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। যদি এই পদক্ষেপগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে সাময়িক সংকট কাটিয়ে আবারও স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
আপনার মতামত জানানঃ