
প্রায় ৭৪ হাজার বছর আগে মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপে। সেখানে অবস্থিত টোবা সুপারভলকানো হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়ে বিপুল পরিমাণ ছাই ও ধ্বংসাবশেষ বায়ুমণ্ডলে নিক্ষেপ করে। এই অগ্ন্যুৎপাতকে গত আড়াই মিলিয়ন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়গুলোর একটি হিসেবে ধরা হয়। তবুও বিস্ময়করভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বসবাসকারী হোমো স্যাপিয়েন্স বা আধুনিক মানুষেরা এই বিপর্যয়ের মধ্য দিয়েও টিকে থাকতে সক্ষম হয়। বরং সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, তারা শুধু বেঁচেই থাকেনি—বরং পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিজেদের জীবনযাপন আরও উন্নত করেছিল।
টোবার অগ্ন্যুৎপাতের ছাই পৃথিবীর বহু অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, যার মধ্যে দক্ষিণ ও পূর্ব আফ্রিকাও ছিল—যেখানে সে সময় মানুষের বসতি ছিল। যদিও আফ্রিকার মানুষরা আগ্নেয়গিরির সরাসরি ধ্বংসযজ্ঞ থেকে অনেক দূরে ছিল, তবুও বৈশ্বিক জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব তারা এড়াতে পারেনি। দীর্ঘদিন ধরে কিছু গবেষক ধারণা দিয়েছিলেন যে এই অগ্ন্যুৎপাতের ফলে একটি “ভলকানিক উইন্টার” বা আগ্নেয় শীত নেমে এসেছিল, যা মানবজাতিকে প্রায় বিলুপ্তির মুখে ঠেলে দিয়েছিল। বিশেষ করে ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে একজন নৃতত্ত্ববিদ এই তত্ত্ব সামনে আনেন এবং তা বেশ আলোচিত হয়।
তবে পরবর্তী সময়ের গবেষণা এই ধারণাকে অনেকটাই নরম করেছে। নতুন তথ্য বলছে, টোবার অগ্ন্যুৎপাতের ফলে জলবায়ু কিছুটা শুষ্ক হলেও তা এতটা চরম ছিল না যে মানবজাতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। বরং মানুষ দ্রুত নিজেদের আচরণ ও খাদ্যাভ্যাস বদলে নিয়ে নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেয়। এই অভিযোজন ক্ষমতাই তাদের টিকে থাকার মূল শক্তি হয়ে দাঁড়ায়।
বিজ্ঞানীরা “সুপারভলকানো” বলতে এমন আগ্নেয়গিরিকে বোঝান, যার অগ্ন্যুৎপাতে এক হাজার ঘন কিলোমিটারের বেশি ছাই, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ বের হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে ইয়েলোস্টোন (যুক্তরাষ্ট্র), লা পাকানা (চিলি) এবং টাউপো
(নিউজিল্যান্ড)-এর মতো স্থানে এমন সুপারঅগ্ন্যুৎপাতের প্রমাণ রয়েছে। টোবার ৭৪ হাজার বছর আগের বিস্ফোরণকে “ইয়ংগেস্ট টোবা” বলা হয়, কারণ এটি ওই অঞ্চলের সবচেয়ে সাম্প্রতিক সুপারঅগ্ন্যুৎপাত। আজ সেই আগ্নেয়গিরির ক্যালডেরা অংশটি লেক টোবা নামে বিশাল হ্রদে পরিণত হয়েছে।
গবেষকদের মতে, টোবার বিস্ফোরণের সময় মানুষেরা সম্ভবত সুমাত্রা পর্যন্ত পৌঁছায়নি। যদি কেউ কাছাকাছি থেকেও থাকে, তবে তারা বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ছিল খুবই কম। তাই বিজ্ঞানীরা মানুষের টিকে থাকার প্রমাণ খুঁজেছেন মূলত আফ্রিকার প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলোতে। সেখানে এক গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ছিল “ক্রিপ্টোটেফ্রা”—অগ্ন্যুৎপাত থেকে তৈরি অত্যন্ত ক্ষুদ্র কাচের কণা। এগুলো এত ছোট যে খালি চোখে দেখা যায় না; মাইক্রোস্কোপ ছাড়া শনাক্ত করা সম্ভব নয়।
ভূতত্ত্ববিদ জিন স্মিথ প্রথম আফ্রিকার প্রত্নস্থানে এই ক্ষুদ্র কাচের কণাগুলো শনাক্ত করেন। প্রত্নতাত্ত্বিক স্তরে এই কণার উপস্থিতি গবেষকদের বুঝতে সাহায্য করে কোন স্তরটি টোবার অগ্ন্যুৎপাতের আগে, কোনটি সময়ে এবং কোনটি পরে তৈরি হয়েছে। এই তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইথিওপিয়ার মানুষেরা অগ্ন্যুৎপাতের পরবর্তী পরিবেশগত পরিবর্তনের সঙ্গে সফলভাবে মানিয়ে নিয়েছিল।
২০১৮ সালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে দাবি করা হয়, দক্ষিণ আফ্রিকার কিছু প্রত্নস্থানে টোবার পর মানুষেরা শুধু টিকে ছিল না, বরং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনেও এগিয়ে যায়। পিনাকল পয়েন্ট ও ভ্লিসবাই নামের দুটি স্থানে পাওয়া নিদর্শনে দেখা যায়, মানুষ তাদের পাথরের সরঞ্জামে নতুন কৌশল প্রয়োগ করতে শুরু করে। এই উদ্ভাবনগুলো হাজার বছর ধরে ব্যবহৃত হয়েছে, যা মানব অভিযোজনের শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত।
২০২৪ সালের আরেকটি গবেষণা মানুষের অভিযোজন প্রক্রিয়ার আরও বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরে। ইথিওপিয়ার শিনফা-মেটেমা ১ নামে পরিচিত একটি স্থানে দেখা যায়, টোবার অগ্ন্যুৎপাতের পর সেখানে জলবায়ু কিছুটা বেশি শুষ্ক হয়ে পড়ে। নদীগুলো আংশিক শুকিয়ে ছোট ছোট পানির গর্তে পরিণত হয়, যেখানে মাছ আটকে পড়ে। মানুষ তখন দ্রুত খাদ্যাভ্যাস বদলে ফেলে এবং স্থলজ প্রাণীর বদলে মাছকে প্রধান খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে।
এর আগে ওই অঞ্চলের মানুষের খাদ্যতালিকায় হরিণজাতীয় প্রাণী, শূকর ও বানরের মতো স্থলজ প্রাণী বেশি ছিল, আর মাছ ছিল খুব সামান্য অংশ। কিন্তু টোবার পর এক থেকে দুই বছর তারা প্রধানত মাছ খেতে শুরু করে। যখন পরিবেশ আবার আগের মতো হয়ে যায় এবং নদী স্বাভাবিক প্রবাহে ফিরে আসে, তখন মানুষও আবার আগের খাদ্যাভ্যাসে ফিরে যায়। গবেষকদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে প্রাচীন শিকারি-সংগ্রাহক মানুষেরা ছিল অত্যন্ত বাস্তববাদী এবং পরিবেশভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম।
১৯৯৮ সালে প্রকাশিত একটি প্রভাবশালী গবেষণায় বলা হয়েছিল, টোবার অগ্ন্যুৎপাত মানবজাতিকে প্রায় বিলুপ্তির মুখে ঠেলে দিয়েছিল। কিন্তু নতুন প্রমাণ দেখাচ্ছে, অন্তত আফ্রিকায় সেই মাত্রার বিপর্যয় ঘটেনি। জলবায়ু কিছুটা শুষ্ক হলেও তা ছিল সাময়িক এবং মানুষ তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছিল। বিজ্ঞানীরা এটিকে বিজ্ঞানের স্বাভাবিক অগ্রগতির উদাহরণ হিসেবে দেখছেন—প্রথমে একটি তত্ত্ব আসে, পরে নতুন তথ্যের ভিত্তিতে তা সংশোধিত বা বাতিল হয়।
সব মিলিয়ে টোবা সুপারভলকানোর গল্প শুধু একটি ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ইতিহাস নয়; এটি মানব অভিযোজন ক্ষমতারও এক অনন্য উদাহরণ। পরিবেশ বদলালেও মানুষ দ্রুত নিজেদের কৌশল, খাদ্যাভ্যাস ও প্রযুক্তি বদলে নিয়ে টিকে থাকতে পারে—এই ঘটনাই তার প্রমাণ। হাজার হাজার বছর আগের সেই সংকটময় সময়ে মানুষ যে স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছিল, তা আজও মানব বিবর্তনের ইতিহাসে এক শক্তিশালী অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
আপনার মতামত জানানঃ