
একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। কোথায় ধারণ করা, তার আগে কী ঘটেছিল, পরে কী হয়েছে—এসব এখনো পরিষ্কার নয়। অথচ মন্তব্যের ঘরে রায় লেখা শুরু হয়ে গেছে। কেউ অপরাধী চিহ্নিত করেছেন, কেউ ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন, কেউ জানতে চাইছেন, আপনি এখনো কিছু বলছেন না কেন।
এই দৃশ্যের মধ্যে আমাদের সময়ের একটি অস্বস্তি ধরা পড়ে। শুধু খবর জানা যথেষ্ট নয়; দ্রুত তার ব্যাখ্যা দিতে হবে, পক্ষ নিতে হবে এবং নিজের অবস্থান দৃশ্যমান করতে হবে। যেন কোনো বিষয়ে মতামত না থাকা মানেই চিন্তার অভাব, সাহসের ঘাটতি কিংবা সন্দেহজনক নীরবতা।
কিন্তু মানুষের মন কি প্রতিটি ঘটনার বিচারসভা? সবকিছুর উত্তর প্রস্তুত রাখা কি বুদ্ধিমত্তার লক্ষণ? নাকি কখনো ‘আমি এখনো যথেষ্ট জানি না’ বলাই চিন্তার সবচেয়ে সৎ শুরু?
অজ্ঞতা স্বীকারের সাহস
প্লেটোর ‘অ্যাপোলজি’তে সক্রেটিস এমন একজনের সঙ্গে নিজের তুলনা করেন, যিনি না জেনেও জানেন বলে মনে করেন। সক্রেটিসের সামান্য এগিয়ে থাকার জায়গাটি হলো, তিনি যা জানেন না, তা জানেন বলে ভাবেন না। এখানে জ্ঞানের দাবি ও নিজের সীমা সম্পর্কে সচেতনতার পার্থক্যটি মুখ্য।
সক্রেটিসের নামে প্রচলিত ‘আমি জানি যে আমি কিছুই জানি না’ বাক্যটিকে হুবহু ঐতিহাসিক উদ্ধৃতি হিসেবে ব্যবহার করার চেয়ে এই পার্থক্যটি বোঝা বেশি জরুরি। কারণ সব বিষয়ে অজ্ঞতার ঘোষণা দেওয়াও একটি অতিরঞ্জিত দাবি হতে পারে। মানুষ কিছু জানে, কিছু আংশিক জানে, কিছু বোঝার ভুল করে। বুদ্ধিবৃত্তিক সততা হলো এই অবস্থাগুলোর পার্থক্য চিনতে পারা।
দৈনন্দিন জীবনে কাজটি কঠিন। কোনো আলোচনায় ‘আমি জানি না’ বললে মনে হতে পারে নিজের মর্যাদা কমিয়ে দিলাম। তাই পরিচিত দুটি তথ্যের সঙ্গে অনুমান মিশিয়ে একটি আত্মবিশ্বাসী ব্যাখ্যা তৈরি করি। সমস্যাটি শুধু ভুল হওয়ার নয়। অনুমানকে জ্ঞান হিসেবে উপস্থাপন করলে অন্য মানুষও ভুল ভিত্তির ওপর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
অজ্ঞতা স্বীকার করা তাই আত্মঅবমূল্যায়ন নয়। একজন মানুষ একটি বিষয়ে দক্ষ হয়েও অন্য বিষয়ে অনভিজ্ঞ হতে পারেন। তাঁর মর্যাদা প্রতিটি প্রশ্নের তাৎক্ষণিক উত্তর দেওয়ার ওপর নির্ভর করে না।
সিদ্ধান্তের মাঝখানে একটি জায়গা
আমরা প্রায়ই ভাবি, কোনো দাবি শুনলে সেটিকে হয় গ্রহণ করতে হবে, নয় প্রত্যাখ্যান করতে হবে। অথচ তৃতীয় একটি অবস্থান সম্ভব: এখনই সিদ্ধান্ত না নেওয়া।
প্রাচীন পিরোনীয় সংশয়বাদের আলোচনায় এই বিচার স্থগিত রাখার ধারণা গুরুত্বপূর্ণ। সেক্সটাস এম্পিরিকাসের বিবরণে পরস্পরবিরোধী যুক্তি সমানভাবে বিশ্বাসযোগ্য মনে হলে সংশয়বাদী কোনো একটিকে চূড়ান্ত বলে মেনে নেওয়া থেকে বিরত থাকেন। এই অবস্থাকে সাধারণত ‘এপোখে’ বলা হয়।
আজকের জীবনে ধারণাটি প্রয়োগ করতে হলে অবশ্য একটি সীমা মনে রাখতে হবে। বিতর্ক আছে মানেই দুই পক্ষের প্রমাণ সমান নয়। একটি দাবির পক্ষে যাচাইযোগ্য বহু তথ্য, অন্যটির পক্ষে কেবল সন্দেহ থাকলে উভয়কে একই ওজন দেওয়া যুক্তিসংগত হবে না। সংশয় তখনই অনুসন্ধানের সহায়ক, যখন সে প্রমাণের মান বিচার করে।
ধরা যাক, কারও বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। আমরা বলতে পারি, অভিযোগের নির্দিষ্ট অংশটি এখনো যাচাই করিনি; তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে বলতে পারি, অভিযোগকারীকে হুমকি দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয় এবং অভিযুক্তেরও ন্যায্য প্রক্রিয়া পাওয়ার অধিকার আছে। ঘটনার সব তথ্য না জেনেও কিছু নৈতিক নীতিতে স্পষ্ট থাকা সম্ভব।
‘আমি জানি না’, ‘ঘটনাটি ঘটেনি’ এবং ‘কখনোই জানা যাবে না’—এই তিনটি বক্তব্য সম্পূর্ণ আলাদা। নিজের তথ্যের ঘাটতি দিয়ে বাস্তবতার অনুপস্থিতি প্রমাণ করা যায় না। আবার আজ উত্তর না পাওয়ার অর্থ অনুসন্ধান বন্ধ করে দেওয়াও নয়।
বিশ্বাসেরও কি দায়িত্ব আছে?
উইলিয়াম কিংডন ক্লিফোর্ডের ১৮৭৭ সালের ‘দ্য এথিকস অব বিলিফ’ একটি জাহাজমালিকের কল্পিত ঘটনা দিয়ে শুরু হয়। জাহাজ নিরাপদ কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও মালিক পরীক্ষা না করিয়ে নিজেকে আশ্বস্ত করেন। জাহাজটি ডুবে যায়। ক্লিফোর্ডের যুক্তি, মালিকের আন্তরিক বিশ্বাস তাঁকে দায়মুক্ত করে না; তিনি প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান এড়িয়ে বিশ্বাসটি গড়ে তুলেছিলেন। এমনকি জাহাজ নিরাপদে পৌঁছালেও সেই অবহেলার নৈতিক সমস্যা দূর হতো না।
এই যুক্তি আমাদের প্রকাশ্য মতামতের দায়িত্ব বুঝতে সাহায্য করে। ‘আমি তো বিশ্বাস করেই বলেছি’ সব ক্ষেত্রে যথেষ্ট ব্যাখ্যা নয়। কেন বিশ্বাস করেছি, যাচাইয়ের সুযোগ ছিল কি না, এবং ভুল হলে অন্যের কী ক্ষতি হতে পারে—এসবও বিবেচ্য।
অবশ্য প্রতিদিনের প্রতিটি বিশ্বাসকে গবেষণাপত্রের মতো যাচাই করা সম্ভব নয়। আমরা অন্যের সাক্ষ্য, পেশাগত দক্ষতা এবং প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করেই চলি। এখানেও দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন আছে: কোন উৎসের দক্ষতা প্রাসঙ্গিক, তাদের বক্তব্য কতটা স্বচ্ছ, ভুল হলে সংশোধনের ব্যবস্থা আছে কি না।
বিশ্বাসযোগ্য বিশেষজ্ঞের ওপর নির্ভর করা চিন্তা ছেড়ে দেওয়া নয়। বরং নিজের সীমা বুঝে উপযুক্ত জ্ঞানের সাহায্য নেওয়া। অন্ধ আনুগত্য ও যুক্তিসংগত আস্থার পার্থক্য হলো, দ্বিতীয়টি প্রশ্ন, ব্যাখ্যা এবং সংশোধনের পথ খোলা রাখে।
তবে অনিশ্চয়তার মধ্যে কখনো সিদ্ধান্ত নিতেই হয়। উইলিয়াম জেমস ‘দ্য উইল টু বিলিভ’-এ এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও এড়ানো যায় না এমন বিকল্পের কথা বলেন, যেখানে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণ একাই সিদ্ধান্ত মেটায় না। তাঁর যুক্তি ইচ্ছেমতো যেকোনো দাবি সত্য ধরে নেওয়ার অনুমতি নয়; তিনি বিশেষ ধরনের সিদ্ধান্তের শর্ত নিয়ে কথা বলছেন।
এখান থেকে আমাদের আলোচনায় একটি পার্থক্য টানা যায়: কোনো কাজ করার জন্য সীমিত তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং একটি বক্তব্যকে নিশ্চিত সত্য বলে প্রচার করা এক বিষয় নয়। পরিস্থিতি আমাদের পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করতে পারে; তাই বলে নিজের অনিশ্চয়তা লুকানো জরুরি হয়ে পড়ে না।
মতামত যখন পরিচয়ের পরীক্ষা
অনলাইনে কোনো আলোচনায় অনেক সময় প্রশ্নটি আর শুধু ‘কোন বক্তব্য সত্য’ থাকে না; হয়ে যায় ‘আপনি আমাদের দলে আছেন কি না’। ফলে মত বদলানোকে ভুল সংশোধনের বদলে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখা হতে পারে। মানুষ তখন তথ্যের সঙ্গে নিজের সামাজিক সম্পর্ক রক্ষার চাপও সামলায়।
এই পরিস্থিতিতে একটি সাময়িক মতামতও স্থায়ী পরিচয়ের মতো আটকে যেতে পারে। আগে বলা কথার পক্ষে নতুন যুক্তি খুঁজতে থাকি, কারণ তা প্রত্যাহার করলে অন্যেরা কী ভাববেন, সেই উদ্বেগ কাজ করে। অথচ একটি বক্তব্যের সঙ্গে আমাদের সম্মানকে পুরোপুরি বেঁধে ফেললে শেখার পথ সংকুচিত হয়।
মতামতেরও মাত্রা আছে। ‘এটি সম্ভব’, ‘বর্তমান তথ্য অনুযায়ী এটিই বেশি গ্রহণযোগ্য’ এবং ‘এটি অত্যন্ত সুপ্রতিষ্ঠিত’—এসব এক ধরনের দাবি নয়। সব বক্তব্য একই দৃঢ়তায় প্রকাশ করলে পাঠক বুঝতে পারেন না কোথায় তথ্য শেষ হয়েছে, কোথায় ব্যাখ্যা শুরু।
সৎ আলোচনায় তাই নিজের মতের ভিত্তি দৃশ্যমান করা মূল্যবান। আমি কী দেখেছি, কোন সূত্রের ওপর নির্ভর করছি, কোন তথ্যটি এখনো অনুপস্থিত, কী পেলে মত বদলাব—এসব বলা দুর্বলতা নয়। এতে কথাটির মূল্য যাচাই করার সুযোগ তৈরি হয়।
তবে ‘আরও জানার অপেক্ষা’ও আত্মরক্ষার কৌশল হতে পারে। নিজের পছন্দের পক্ষের বিরুদ্ধে তথ্য এলে যদি হঠাৎ অসম্ভব মানের প্রমাণ চাই, অথচ বিপক্ষের বিরুদ্ধে গুজবেই নিশ্চিত হই, তাহলে সেটি সতর্কতা নয়। সেটি প্রমাণের জন্য দুই রকম মাপকাঠি।
সব তথ্য জানা না গেলেও যথেষ্ট তথ্য কখন পাওয়া গেছে, সেই বিচার করতে হয়। সীমাহীন সংশয়ের দাবি কখনো দায়িত্ব এড়ানোর আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে। বুদ্ধিবৃত্তিক সততার পরীক্ষা তাই শুধু কতবার ‘জানি না’ বললাম, তা নয়; কখন প্রশ্ন করলাম, কীভাবে যাচাই করলাম এবং প্রমাণ পেলে কী করলাম।
সব বিষয়ে প্রকাশ্য বক্তব্য দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু দায়িত্ব অনুযায়ী অনুসন্ধানের প্রয়োজন আলাদা। সাধারণ পাঠক একটি বিষয়ে সাময়িকভাবে মত না-ও রাখতে পারেন; সেই বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার শুধু ‘জানি না’ বলে থেমে যাওয়ার সুযোগ নেই। দায়িত্বের সঙ্গে জানার চেষ্টা ও জবাব দেওয়ার দায়ও যুক্ত হয়।
নিজের অজ্ঞতা স্বীকারের অধিকার তাই অজ্ঞতাকে স্থায়ী রাখার প্রশংসা নয়। ‘জানি না, জানতে চাই’ এবং ‘জানি না, জানতেও চাই না’—দুটি ভিন্ন মানসিক অবস্থান। প্রথমটি কথোপকথন খোলে, দ্বিতীয়টি দরজা বন্ধ করে দিতে পারে।
চিন্তার স্বাধীনতার একটি অংশ হলো প্রতিটি শব্দের যুদ্ধে সঙ্গে সঙ্গে যোগ না দেওয়ার অবকাশ। কোনো বিষয় বুঝতে সময় নেওয়া, নিজের মনোযোগের সীমা মানা এবং অন্যের কথা সম্পূর্ণ শোনা—এসবও সক্রিয় বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ।
আমাদের এমন আলোচনা প্রয়োজন, যেখানে প্রশ্ন করাকে অক্ষমতা, সংশোধনকে পরাজয় এবং অনিশ্চয়তাকে চরিত্রের দোষ ভাবা হবে না। সেখানে প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া যাবে, আবার নতুন প্রমাণের জন্যও জায়গা থাকবে।
সবকিছুর মতামত থাকা জরুরি নয়। জরুরি হলো, যে মতটি দিচ্ছি তার ভিত্তি সম্পর্কে সৎ থাকা। কোথাও হয়তো বলতে হবে, ‘এটুকু জানি’; কোথাও, ‘এখনো নিশ্চিত নই’; আবার কোথাও, ‘আগে ভুল বলেছিলাম’। নিজের কথাকে সত্যের চেয়ে বড় না করাই বুদ্ধিবৃত্তিক সততার শুরু।
আপনার মতামত জানানঃ