ঢাকার মিরপুরে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা আবারও পুলিশের দায়িত্ব ও ভূমিকা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। বিশেষ করে কোনো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ভুক্তভোগী থানায় লিখিত অভিযোগ বা মামলা না করলে পুলিশ কি ঘটনাটি উপেক্ষা করে বসে থাকতে পারে—এ প্রশ্নটি এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারটি সংশ্লিষ্ট থানার কাছেই অবস্থিত। তারপরও সেখানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট ঠেকাতে পুলিশ কেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি বিষয়টি নিয়ে কথা বললেও প্রথম দিকে মামলা না হওয়াকে সামনে এনে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। পরে অবশ্য জানা যায়, ঘটনার পর শনিবার রাতেই তিনি ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করতে গিয়েছিলেন। মামলা নিতে দেরি হওয়ায় একপর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে তিনি বাসায় ফিরে যান। পরদিন সকালে স্টুডিওর ক্ষয়ক্ষতির ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে এবং পরে পুলিশ মামলা নেয়।
এই ঘটনাগুলো শুধু দুটি নির্দিষ্ট হামলার বিষয় নয়; বরং অপরাধ সংঘটনের পর পুলিশের দায়িত্ব ঠিক কোথা থেকে শুরু হয়, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। কারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব কেবল কেউ থানায় এসে লিখিত অভিযোগ করবে—তারপর ব্যবস্থা নেওয়া—এমন সরল কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
বাংলাদেশে অপরাধের তদন্ত ও পুলিশের দায়িত্ব পরিচালনার ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ বা সিআরপিসি গুরুত্বপূর্ণ আইন। আইন বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আমলযোগ্য বা ধর্তব্য অপরাধের বিষয়ে পুলিশ কোনো তথ্য পেলে পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব তাদের রয়েছে। এসব অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশের তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আদালতের পূর্বানুমতি প্রয়োজন হয় না।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদের ভাষ্য অনুযায়ী, খুন, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, হামলা ও ভাঙচুরের মতো অপরাধ আমলযোগ্য অপরাধের আওতায় পড়তে পারে। এমন অপরাধ সম্পর্কে পুলিশ তথ্য পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, অপরাধ বন্ধ করা, প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ এবং তদন্তের ব্যবস্থা করতে পারে।
এখানেই ‘কেউ মামলা করেনি’ যুক্তিটির সীমাবদ্ধতা সামনে আসে। কারণ একটি অপরাধ ঘটেছে—এমন তথ্য যদি পুলিশের কাছে পৌঁছে যায়, তাহলে কেবল ভুক্তভোগী আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা করেছেন কি না, সেটিই পুলিশের একমাত্র বিবেচ্য বিষয় হওয়ার কথা নয়। আইন বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা হলো, ভুক্তভোগী আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দিতে না চাইলেও পুলিশ নিজ উদ্যোগে ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে।
ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৪ ধারায় আমলযোগ্য অপরাধের তথ্য লিখিতভাবে লিপিবদ্ধ করার বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। তথ্যদাতার বক্তব্য রেকর্ড করার পর তা পড়ে শোনানো এবং তথ্যদাতার স্বাক্ষর নেওয়ার বিধানও রয়েছে। কিন্তু কোনো কারণে ভুক্তভোগী বা তথ্যদাতা আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করতে না চাইলে তার অর্থ এই নয় যে অপরাধ সংঘটনের তথ্য পাওয়ার পর পুলিশের সব দায়িত্ব শেষ হয়ে গেল।
সাবেক আইজিপি নুরুল হুদাও বলেছেন, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার বিষয়ে পুলিশ তথ্য পেলে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ না থাকলেও তাদের বসে থাকার সুযোগ নেই। তার মতে, অভিযোগ বা মামলা হলে তদন্ত প্রক্রিয়া আরও সুসংগঠিতভাবে এগোনো সম্ভব হলেও অপরাধ সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার পর পুলিশকে নিজেদের দায়িত্ব অনুযায়ী কাজ চালিয়ে যেতে হবে।
এই ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাস্তবে অনেক সময় থানায় মামলা নেওয়া হয়েছে কি না—এটিকেই পুলিশের ভূমিকার প্রধান সূচক হিসেবে দেখা হয়। অথচ কোনো অপরাধ প্রতিরোধ করা, ঘটনাস্থলে পৌঁছানো, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা, আলামত সংরক্ষণ করা, অপরাধীদের শনাক্ত করার চেষ্টা করা এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমানো—এসব দায়িত্বও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজের অংশ।
রাড্ডা ক্লিনিকের ঘটনায় বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর স্বীকার করেছেন যে হামলা ও ভাঙচুর প্রতিরোধ করা পুলিশের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। পরে পুলিশি তদন্তে স্থানীয় থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দায়িত্বে গাফিলতির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা জানানো হয়। এরপর তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
তবে একটি কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করলেই সমস্যার সমাধান হবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ কোনো একটি ঘটনায় পুলিশের ব্যর্থতা থাকলে তার পেছনে ব্যক্তিগত গাফিলতি যেমন থাকতে পারে, তেমনি বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক চাপ, নিরাপত্তাহীনতা, জনবল ও সক্ষমতার ঘাটতি কিংবা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধার মতো বিষয়ও ভূমিকা রাখতে পারে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনায় দলবদ্ধ হামলা বা মব সহিংসতার ঘটনা নিয়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশ বাহিনী নিজেই বড় ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। বিভিন্ন থানায় হামলা, পুলিশ সদস্যদের ওপর আক্রমণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক পরিবর্তনের কারণে বাহিনীর স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছিল।
সাবেক আইজিপি নুরুল হুদার মতে, অতীতে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে পুলিশ ব্যবহারের অভিযোগ এবং জুলাইয়ের সময় পুলিশের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সংঘাত বাহিনীর নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করেছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সেই পরিস্থিতির প্রভাব পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে না পারায় পুলিশের মধ্যে এখনও ভয় কাজ করতে পারে এবং মবের মতো শক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধা দেখা দিতে পারে।
তবে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার ব্যাখ্যা হিসেবে শুধু ভয় বা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাকে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন রাড্ডা ক্লিনিকের ঘটনার প্রেক্ষাপটে স্থানীয় পুলিশ ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, কোথাও পুলিশ ভয়, কোথাও লাভের প্রত্যাশা, আবার কোথাও দায়িত্ব এড়ানোর কারণে নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে।
এ ধরনের অভিযোগ অবশ্য প্রমাণিত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই যতক্ষণ না নির্দিষ্ট তদন্তে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু অভিযোগগুলো যে পুলিশের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের প্রশ্নকে সামনে এনেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
সরকারের বক্তব্য অবশ্য ভিন্ন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে এবং রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা হবে এবং কোনো পুলিশ সদস্যের গাফিলতি প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারাও একই ধরনের অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য হলো, পুলিশের কাছে অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচ্য নয়; অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই দেখা হবে। দখল, বেআইনি কর্মকাণ্ড বা আইনবহির্ভূত কোনো কাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও তারা বলেছেন।
কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা দিয়ে এসব বক্তব্যের কার্যকারিতা যাচাই করা হয়। কোনো থানার সামনে হামলা হচ্ছে অথচ পুলিশ যাচ্ছে না, কোনো প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চলছে অথচ পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উপস্থিত হচ্ছে না, অথবা কোনো ভুক্তভোগী অভিযোগ করতে গিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে ফিরে আসছেন—এ ধরনের ঘটনা মানুষের মধ্যে পুলিশের ওপর আস্থা কমিয়ে দিতে পারে।
এখানেই ‘মামলা হয়নি’ যুক্তিটি আরও বড় প্রশ্ন তৈরি করে। কারণ একজন সাধারণ নাগরিক যখন কোনো অপরাধের শিকার হন, তখন থানায় গিয়ে মামলা করার প্রক্রিয়াটিও তার জন্য অনেক সময় ভীতিকর বা জটিল হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে অপরাধের সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী জড়িত থাকার অভিযোগ থাকলে ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশের দায়িত্ব শুধু অভিযোগ গ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা, অপরাধ প্রতিরোধ এবং ঘটনাটির প্রাথমিক তদন্ত নিশ্চিত করার দিকেও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে পুলিশের পক্ষ থেকেও একটি বাস্তব সমস্যা থাকে। প্রতিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট বা মৌখিক অভিযোগকে কীভাবে যাচাই করা হবে, কোন তথ্যের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করা হবে, এবং কোন পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক মামলা প্রয়োজন—এসব বিষয়েও সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া থাকা জরুরি। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে যথাযথ প্রমাণ সংগ্রহ এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তাই প্রশ্নটি আসলে শুধু ‘মামলা হয়েছে কি হয়নি’—এতটা সরল নয়। মূল প্রশ্ন হলো, পুলিশ কোনো অপরাধের তথ্য পাওয়ার পর কী করেছে। ঘটনাস্থলে গেছে কি না, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে কি না, ক্ষতিগ্রস্তদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে কি না, আলামত সংরক্ষণ করেছে কি না এবং অপরাধীদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে কি না—এসব বিষয় দিয়েই পুলিশের দায়িত্ব পালনের বাস্তব চিত্র বোঝা যায়।
রাড্ডা ক্লিনিক ও সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনাগুলো তাই একটি বৃহত্তর বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি ফেরায়। নাগরিক নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধু কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি মামলা করার পর শুরু হওয়ার কথা নয়। অপরাধ সংঘটনের তথ্য পুলিশের কাছে পৌঁছানো মাত্রই রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সক্রিয় হওয়ার কথা।
শেষ পর্যন্ত পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা নির্ভর করে শুধু কতটি মামলা হয়েছে তার ওপর নয়; বরং অপরাধের মুহূর্তে পুলিশ কত দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকরভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, তার ওপর। কোনো অপরাধের ঘটনায় ভুক্তভোগী মামলা করেননি—এই তথ্য হয়তো তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হতে পারে। কিন্তু সেটিকে অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে নিষ্ক্রিয় থাকার একমাত্র কারণ হিসেবে ব্যবহার করা হলে প্রশ্ন থেকেই যায়—আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বটি তাহলে ঠিক কার?
আপনার মতামত জানানঃ