বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন খুব কম দলই আছে, যাদের ইতিহাস ধর্ম, রাষ্ট্র, মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধাপরাধের বিচার, গণতান্ত্রিক আন্দোলন, জোটের রাজনীতি, নিষেধাজ্ঞা এবং নির্বাচনী উত্থানের সঙ্গে এত গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সেই বিরল রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর একটি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নেওয়া একটি ইসলামপন্থী দল থেকে ২০২৬ সালে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল হয়ে ওঠা—জামায়াতের এই দীর্ঘ যাত্রা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়।
জামায়াতের ইতিহাস অবশ্য বাংলাদেশের স্বাধীনতারও বহু আগের। ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামী রাজনৈতিক চিন্তাবিদ আবুল আ’লা মওদুদীর নেতৃত্বে ১৯৪১ সালে জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশভাগের পর সংগঠনটি ভারত ও পাকিস্তান—দুই অংশে আলাদা সাংগঠনিক কাঠামোয় কাজ করতে থাকে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানেও জামায়াত একটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সক্রিয় ছিল। তাদের রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল ইসলামকে ব্যক্তি ও সমাজজীবনের পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনার একটি ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার ধারণা।
কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে জামায়াতের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায় শুরু হয় ১৯৭১ সালে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াত বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে এবং পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নেয়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথি ও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে জামায়াতের তৎকালীন নেতৃত্বের সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতা করা বিভিন্ন সহযোগী বাহিনীর সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে। বিশেষ করে রাজাকার, আলবদর ও আলশামসের মতো বাহিনীর ভূমিকা ১৯৭১ সালের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কয়েকটি রায়ে জামায়াতের তৎকালীন নেতাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ১৯৭১ সালের অপরাধের দায় নিয়ে জামায়াতের নিজস্ব বক্তব্য ছিল ভিন্ন। দলটি দীর্ঘদিন ধরে বলে এসেছে যে দল হিসেবে তারা কোনো যুদ্ধাপরাধে জড়িত ছিল না এবং তাদের নেতাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। একই সঙ্গে তারা আন্তর্জাতিক অপরাধের অভিযোগের বিচার করার নীতিগত প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা ও ন্যায্যতা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। অর্থাৎ ১৯৭১ নিয়ে জামায়াতের নিজস্ব ব্যাখ্যা এবং বাংলাদেশের আদালতের বিভিন্ন রায়ের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে জামায়াতও রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ হয়ে যায়। পরে ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আসে। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে জামায়াত আবার প্রকাশ্য রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ পায়।
এরপর শুরু হয় জামায়াতের দ্বিতীয় রাজনৈতিক জীবন। তারা সরাসরি এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার পরিবর্তে ধীরে ধীরে সংগঠন বিস্তার, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, ছাত্র সংগঠন ও রাজনৈতিক জোটের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে থাকে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াত ১৮টি আসন পায়। কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় জামায়াতের সংসদীয় অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং তারা বিএনপিকে সরকার গঠনে সমর্থন দেয়।
১৯৯০-এর দশকে জামায়াতের রাজনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সঙ্গে তাদের সম্পর্কের পরিবর্তন। যে আওয়ামী লীগ একসময় জামায়াতের যুদ্ধকালীন ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করত, সেই আওয়ামী লীগই ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার আন্দোলনে জামায়াতের সঙ্গে একই রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেয়। সে সময় বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও জাতীয় পার্টির নেতাদের যৌথ আন্দোলন ও বৈঠকের নজির রয়েছে। জামায়াতের নিজস্ব নথিতেও এই রাজনৈতিক সহযোগিতার উল্লেখ রয়েছে।
২০০১ সালের নির্বাচন জামায়াতের রাজনৈতিক ইতিহাসে আরেকটি বড় বাঁক। বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট নির্বাচনে জয়ী হলে জামায়াত সরকারে অংশ নেয়। দলটির দুই নেতা মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান। এই সময় জামায়াত আর কেবল একটি ধর্মভিত্তিক বিরোধী দল ছিল না; তারা সরাসরি রাষ্ট্র পরিচালনার অংশ হয়ে যায়।
কিন্তু একই সঙ্গে ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হতে থাকে। আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু করে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের শীর্ষ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে মামলা হয়। আবদুল কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মতিউর রহমান নিজামী ও মীর কাসেম আলীসহ একাধিক শীর্ষ জামায়াত নেতা বিভিন্ন মামলায় দণ্ডিত হন; কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।
এই বিচারপর্ব জামায়াতের সাংগঠনিক কাঠামোকে বড় ধাক্কা দেয়। একই সময়ে ২০১৩ সালে হাইকোর্ট জামায়াতের রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধনকে অবৈধ ঘোষণা করে। এর ফলে দলটি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অধিকার হারায়। পরবর্তী সময়ে নির্বাচন কমিশন তাদের নিবন্ধন বাতিল করে। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে জামায়াত সরাসরি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি।
২০১৩ সালের পর জামায়াতকে ঘিরে আরেকটি বড় রাজনৈতিক অধ্যায় ছিল শাহবাগ আন্দোলন। যুদ্ধাপরাধের বিচারে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে গড়ে ওঠা সেই আন্দোলনে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবিও সামনে আসে। একই সময়ে জামায়াত ও তার ছাত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ ওঠে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। ফলে জামায়াতের রাজনীতি শুধু ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা আইনশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক সহিংসতা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিতর্কের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়ে।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি আবার দ্রুত বদলে যায়। সেই পরিবর্তনের পর জামায়াতের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাও তুলে নেওয়া হয়। তবে দলটির নির্বাচনী রাজনীতিতে পূর্ণ প্রত্যাবর্তনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল নিবন্ধন।
এই আইনি লড়াইয়ের ফল আসে ২০২৫ সালে। ১ জুন আপিল বিভাগ ২০১৩ সালের হাইকোর্টের রায় বাতিল করে জামায়াতের নিবন্ধন পুনর্বহালের পথ খুলে দেয়। এরপর নির্বাচন কমিশন জামায়াতের নিবন্ধন এবং ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক পুনর্বহাল করে। ২০২৫ সালের জুন-জুলাইয়ে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধের সময় কোনো দলের নেতাদের ভূমিকার ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন প্রত্যাখ্যান করার জন্য তৎকালীন Representation of the People Order-এ নির্দিষ্ট বিধান ছিল না। আদালত আইনি প্রশ্ন এবং ঐতিহাসিক বা আবেগগত আপত্তির মধ্যে পার্থক্যও তুলে ধরে।
এই আইনি প্রত্যাবর্তনের পর জামায়াত ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। দীর্ঘ সময় পর তারা সরাসরি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। শুধু অংশগ্রহণ নয়, ফলাফলও দলটির ইতিহাসে একটি বড় পরিবর্তন তৈরি করে।
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত এককভাবে ৬৮টি আসনে জয় পায়। নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত ফল অনুযায়ী বিএনপি ২০৯টি আসন এবং জামায়াত ৬৮টি আসন পায়। পরে নির্বাচন কমিশনের গেজেটেও জামায়াতকে ৬৮ আসন পাওয়া প্রধান বিরোধী দল হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
এই সংখ্যা জামায়াতের নির্বাচনী ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর আগে ১৯৯১ সালে দলটির সর্বোচ্চ আসন ছিল ১৮টি। অর্থাৎ ২০২৬ সালের ফলাফল ১৯৯১ সালের তুলনায় সংসদীয় শক্তির ক্ষেত্রে একেবারে ভিন্ন মাত্রা তৈরি করেছে।
শুধু আসনসংখ্যাই নয়, ভোটের পরিমাণও জামায়াতের নতুন অবস্থানকে বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। নির্বাচন কমিশনের দলভিত্তিক ভোটের হিসাবে জামায়াত ২ কোটি ৩৮ লাখের বেশি ভোট পেয়েছে। একই নির্বাচনে বিএনপি পেয়েছে ৩ কোটি ৭৪ লাখের বেশি ভোট।
জামায়াতের এই উত্থানের পেছনে কী কারণ কাজ করেছে—এ নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে একাধিক ব্যাখ্যা রয়েছে। কেউ মনে করেন দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা এবং আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনৈতিক পরিবেশ দলটিকে নতুন ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ দিয়েছে। কেউ আবার ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন ভোটারদের একটি অংশের মধ্যে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধির বিষয়টি সামনে এনেছেন। এসব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ; নির্বাচনের ফলাফল নিজেই কোনো একটি কারণকে নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে না।
বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের উপস্থিতি নিয়ে ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর আলোচনা বেড়েছে। বিভিন্ন বিশ্লেষণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ছাত্ররাজনীতি, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ের সংগঠনকে জামায়াতের শক্তির অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে। তবে এসব বিষয় কতটা এবং কোন মাত্রায় নির্বাচনী ফলকে প্রভাবিত করেছে, তা আলাদা করে পরিমাপ করা কঠিন।
জামায়াতের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান তাই ১৯৭১ সালের ইতিহাস থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়। বরং দলটির সামনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্নগুলোর একটি হলো—তারা অতীতের বিতর্কের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক নির্ধারণ করবে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় কীভাবে ব্যাখ্যা করবে।
একই সঙ্গে দলটির সামনে রয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনা ও সংসদীয় বিরোধী দলের দায়িত্ব। বিরোধী দল হিসেবে তাদের ভূমিকা কেবল সরকারের সমালোচনায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বিকল্প নীতি, বাজেট, আইন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিস্তারিত সংসদীয় অবস্থান তৈরি করবে—তা বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
জামায়াতের বর্তমান নেতৃত্বও দলটিকে একটি আধুনিক রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। অর্থনীতি, দুর্নীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসনিক সংস্কার ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে দলটির রাজনৈতিক বক্তব্য আগের তুলনায় বেশি বিস্তৃত। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ইসলামভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজের ধারণা এখনো রয়েছে। ফলে ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে দলটি কীভাবে ভারসাম্য তৈরি করবে, সেটিও ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
অন্যদিকে বাংলাদেশের সংবিধান ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমতার নীতি স্বীকার করে। ফলে জামায়াতের রাজনৈতিক উত্থান নিয়ে আলোচনায় শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর সমর্থন নয়, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার, নারী অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক বহুত্ববাদ নিয়েও প্রশ্ন আসে। এসব প্রশ্নের বাস্তব উত্তর দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও নীতিতে দেখা যাবে।
জামায়াতের ইতিহাসকে তাই একমাত্রিকভাবে দেখলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। এটি যেমন ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক অবস্থানের ইতিহাস, তেমনি ১৯৯১ সালের সংসদীয় উত্থানের ইতিহাস। এটি যেমন বিএনপির সঙ্গে জোট সরকারের অংশ হওয়ার ইতিহাস, তেমনি আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে একই কর্মসূচিতে থাকার ইতিহাস। এটি যেমন যুদ্ধাপরাধের মামলায় শীর্ষ নেতাদের দণ্ডিত হওয়ার ইতিহাস, তেমনি আদালতের মাধ্যমে নিবন্ধন ফিরে পাওয়ার ইতিহাস। আর ২০২৬ সালে এটি হয়ে উঠেছে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দলের ইতিহাস।
জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক যাত্রা তাই আসলে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজের পরিবর্তনেরও একটি আয়না। ধর্মীয় রাজনীতি থেকে নির্বাচনী রাজনীতি, যুদ্ধাপরাধের বিতর্ক থেকে বিচার, নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠন থেকে পুনঃনিবন্ধিত দল এবং শেষ পর্যন্ত সংসদের প্রধান বিরোধী শক্তি—প্রতিটি ধাপেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের ছাপ রয়েছে।
এখন সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই নতুন অবস্থান জামায়াত কীভাবে ব্যবহার করে। তারা কি সংসদে কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে, নাকি রাজনীতিকে আরও তীব্র আদর্শিক মেরুকরণের দিকে নিয়ে যাবে—তার উত্তর সময়ই দেবে। একইভাবে দলটি তাদের ১৯৭১ সালের ভূমিকা ও যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে অতীতের অবস্থানকে কীভাবে নতুন প্রজন্মের সামনে ব্যাখ্যা করবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
একটি রাজনৈতিক দলের ইতিহাস শুধু তার অতীত দিয়ে শেষ হয় না। বর্তমানের আচরণ এবং ভবিষ্যতের সিদ্ধান্তও সেই ইতিহাসের নতুন অধ্যায় তৈরি করে। জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রেও তাই ১৯৭১ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত পথচলা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার পরবর্তী পথও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ।
একসময় যে দল বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতা করেছিল, সেই দলই আজ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ৬৮টি আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী দল। এই পরিবর্তন শুধু জামায়াতের রাজনৈতিক যাত্রার গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্ম, ইতিহাস, গণতন্ত্র, নির্বাচন ও জনসমর্থনের পরিবর্তিত সম্পর্কেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
আপনার মতামত জানানঃ