বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা ও তারেক রহমান—দুটি নাম শুধু দুটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বকে বোঝায় না; তারা দেশের রাজনীতির দুই ভিন্ন সময়, দুই ভিন্ন রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং দুই ভিন্ন শাসন-দর্শনের প্রতীক। একজন দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো ও প্রশাসনের ওপর গভীর প্রভাব রেখেছেন। অন্যজন দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকার পর ২০২৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন এবং এখন তাকে পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাইরে নতুন ধরনের রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে।
তাই “হাসিনা নাকি তারেক—কে ভালো প্রধানমন্ত্রী?” প্রশ্নটির উত্তর এক লাইনে দেওয়া সহজ হলেও বাস্তবে বিষয়টি অনেক বেশি জটিল। কারণ একজনের সামনে রয়েছে দীর্ঘ শাসনের অর্জন ও বিতর্কের বিশাল রেকর্ড, আর অন্যজনের সামনে রয়েছে ভবিষ্যৎ কর্মদক্ষতা প্রমাণের সুযোগ ও কঠিন প্রত্যাশা।
শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের গড় বার্ষিক প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৬.৩ শতাংশ। একই সময়ে দারিদ্র্য ও চরম দারিদ্র্যের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছিল।
বিদ্যুৎ, সড়ক, সেতু, যোগাযোগ অবকাঠামো এবং ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণও হাসিনা সরকারের শাসনামলের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। ২০২৪ সালের শুরুতে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে দ্রুত অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছিল এবং বলেছিল, দেশের প্রায় সব শিশু স্কুলে যাচ্ছে এবং প্রায় প্রতিটি পরিবার বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে।
কিন্তু উন্নয়নের এই পরিসংখ্যানের পাশাপাশি অর্থনীতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্নও তৈরি হয়েছিল। ২০২৪ সালে মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বিনিয়োগের ধীরগতি এবং কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্বব্যাংক বলেছিল, ২০২৩ সালের ৫.৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পর ২০২৪ সালে প্রবৃদ্ধি আরও ধীর হয়ে ৫.২ শতাংশে নেমেছিল।
সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়ে। ২০২৪ সালের নির্বাচন বিএনপি বর্জন করেছিল এবং নির্বাচনের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিয়ে দেশি-বিদেশি পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছিল। একই বছরের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন শেষ পর্যন্ত হাসিনা সরকারের পতনের দিকে যায়। বিশ্বব্যাংকের নথিতে ওই সময়ের জনঅসন্তোষের সঙ্গে দুর্বল শাসনব্যবস্থা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি এবং কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতার মতো বিষয়গুলোর সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ হাসিনা সরকারের মূল্যায়নে একটি বিষয় স্পষ্ট: উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির একটি শক্তিশালী রেকর্ড রয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে রাজনৈতিক অধিকার, জবাবদিহি, প্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে বড় বিতর্কও রয়েছে।
তারেক রহমানের ক্ষেত্রে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে ছিলেন এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। ফলে তার সরকারকে বিচার করতে গেলে এখনো দীর্ঘমেয়াদি শাসনের রেকর্ড হাসিনা সরকারের মতো পাওয়া যায় না। বরং তার মূল্যায়নের প্রধান ভিত্তি হচ্ছে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, সরকারের প্রাথমিক পদক্ষেপ এবং সামনে বাস্তবায়নের অপেক্ষায় থাকা সংস্কার কর্মসূচি।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির নির্বাচনী কর্মসূচিতে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্প পুনরায় চালু করা, বিনিয়োগ বাড়ানো, আইসিটি খাতে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, মধ্যাহ্নভোজ কর্মসূচি এবং নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মতো উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। দলটি সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কথাও বলেছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম বাজেটেও নতুন সরকারের অগ্রাধিকারগুলোর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে এবং সরকার করব্যবস্থা, ব্যাংকিং ও সরকারি অর্থব্যবস্থায় সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ, রপ্তানি ও শিল্প পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যও সামনে রাখা হয়েছে।
তবে এখানেও বড় প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তব ফলাফল এক জিনিস নয়। একটি সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে যত বড় লক্ষ্যই ঘোষণা করুক, সেটি বাস্তবায়নের সক্ষমতা নির্ভর করে প্রশাসনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতার ওপর।
এই জায়গাতেই তারেক রহমান সরকারের সামনে কঠিন পরীক্ষা। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের এপ্রিলের মূল্যায়নে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ধীর প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বাড়তে থাকা দারিদ্র্য, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, কম রাজস্ব আদায় এবং কম বেসরকারি বিনিয়োগের মতো সমস্যার কথা বলা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক বলেছে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দ্রুত কাঠামোগত সংস্কার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সহায়ক হতে পারে।
অন্যদিকে হাসিনা সরকারের সঙ্গে তুলনা করতে গেলে সময়ের পার্থক্যটিও গুরুত্বপূর্ণ। হাসিনা যখন দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় ছিলেন, তখন বাংলাদেশ দ্রুত প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য হ্রাসের একটি দীর্ঘ পর্যায় পার করেছে। কিন্তু তার শেষ দিকের সময়ে অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট ও ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার সময় সেই সমস্যাগুলোই অনেকাংশে আরও কঠিন বাস্তবতা হিসেবে সামনে পেয়েছেন।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও দুই সময়ের তুলনা সরল নয়। হাসিনা সরকারের সময় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক ছিল। অন্যদিকে তারেক রহমানের সামনে এখন এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করার দায়িত্ব, যেখানে নির্বাচন, বিরোধী মত, সংবাদমাধ্যম, প্রশাসন এবং বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা নিয়ে জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করা যায়।
প্রধানমন্ত্রীর সাফল্য শুধু বড় প্রকল্প নির্মাণ দিয়ে মাপা যায় না। আবার শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতার আলোচনাতেও একটি সরকারের পূর্ণ মূল্যায়ন সম্ভব নয়। একজন প্রধানমন্ত্রীর কার্যকারিতা বিচার করতে হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক অধিকার—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে দেখতে হয়।
এই মানদণ্ডে হাসিনা সরকারের হাতে রয়েছে পরিমাপযোগ্য দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের বড় একটি রেকর্ড। তারেক রহমানের হাতে রয়েছে নতুন রাজনৈতিক ম্যান্ডেট এবং একটি নতুন প্রশাসনিক কর্মসূচি, যার বাস্তব ফলাফল এখনো তৈরি হওয়ার পথে।
সুতরাং প্রশ্নটি শুধু “হাসিনা নাকি তারেক?” নয়। আসল প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কোন ধরনের সরকার চায় এবং কোন মানদণ্ডে একজন প্রধানমন্ত্রীকে বিচার করবে?
যদি উন্নয়ন, অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে প্রধান মানদণ্ড ধরা হয়, তাহলে হাসিনা সরকারের সময়ের পরিসংখ্যান ও প্রকল্পগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যদি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, জবাবদিহি, প্রতিষ্ঠান সংস্কার ও নাগরিক স্বাধীনতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাহলে অন্য ধরনের তথ্য সামনে আসে। আবার যদি কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাত ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কেন্দ্রীয় মানদণ্ড করা হয়, তাহলে দুই সময়ের অর্থনৈতিক বাস্তবতা পাশাপাশি দেখতে হবে।
সবশেষে, তারেক রহমানের সরকারের মূল্যায়ন এখনই চূড়ান্ত করা কঠিন। কারণ তার সরকার ২০২৬ সালেই দায়িত্ব নিয়েছে। আগামী কয়েক বছরেই বোঝা যাবে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো কতটা বাস্তবায়িত হয়, অর্থনীতি কতটা স্থিতিশীল হয়, কর্মসংস্থান কতটা বাড়ে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক হয়।
আর শেখ হাসিনা সম্পর্কে ইতিহাসের বিচার হবে তার দীর্ঘ শাসনের দুই দিক—উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি যেমন বিবেচনায় থাকবে, তেমনি রাজনৈতিক পরিবেশ, প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহি ও শেষ পর্যায়ের অর্থনৈতিক সংকটও বিবেচনায় আসবে।
তাই “কে ভালো প্রধানমন্ত্রী”—এর উত্তর নির্ভর করে কোন বিষয়কে একজন নাগরিক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন তার ওপর। ইতিহাস ইতোমধ্যে শেখ হাসিনার শাসনের একটি বড় অংশের ফলাফল দেখেছে। তারেক রহমানের ক্ষেত্রে সেই ইতিহাস এখন লেখা শুরু হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষই দুই সময়ের ফলাফল, অভিজ্ঞতা ও পরিবর্তনকে পাশাপাশি রেখে নিজেদের মূল্যায়ন করবে।
আপনার মতামত জানানঃ