একটি সমৃদ্ধ, নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছে এ দেশের মানুষ বহুদিন ধরে। এই স্বপ্নের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং অসংখ্য মানুষের রক্তে লেখা ইতিহাস। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে ছিল নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা। মানুষ চেয়েছে বৈষম্যহীন সমাজ, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন। কিন্তু বারবার রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও সেই প্রত্যাশা পুরোপুরি বাস্তবে রূপ নেয়নি। বরং সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে যে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল, তা এখন নানা প্রশ্নের মুখে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক সহিংসতা, দখলবাজি, চাঁদাবাজি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা নাগরিকদের নিরাপত্তাবোধকে দুর্বল করছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যে নতুন সমাজব্যবস্থার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বাস্তবতার সঙ্গে তার দূরত্ব বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ফলে দেশের মানুষের একটি অংশের মধ্যে হতাশা, অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে দলবদ্ধ হামলা, ভাঙচুর ও দখলসংক্রান্ত অভিযোগ জননিরাপত্তার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রসহ বিভিন্ন স্থানে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা এ উদ্বেগের অন্যতম উদাহরণ। স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের মতো জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে হামলা শুধু অবকাঠামোগত ক্ষতি নয়, সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার অধিকারকেও বাধাগ্রস্ত করতে পারে। একই সঙ্গে এসব ঘটনা জনপরিসরে নিরাপত্তা এবং প্রশাসনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্মীয় অনুভূতি কিংবা সাংস্কৃতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ হামলার প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে মাজার, খানকাহ, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিগত স্থাপনায় হামলার খবর সামনে এসেছে। এসব ঘটনার পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের যুক্তি ও ব্যাখ্যা তুলে ধরার প্রবণতাও দেখা যায়। কোনো একটি গোষ্ঠীর বক্তব্য বা পরিচয়কে কেন্দ্র করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা সমাজে সহনশীলতা ও আইনের শাসনের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। মতের বিরোধ থাকতেই পারে, কিন্তু সেই বিরোধের সমাধান হামলা, ভাঙচুর কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে হতে পারে না।
অপরাধের পরিসংখ্যানও পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। প্রথম আলোয় প্রকাশিত আলতাফ পারভেজের কলামে উদ্ধৃত নিউ এজ-এর এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ মাসে নদ-নদী থেকে নৌ পুলিশ ৯ শতাধিক মরদেহ উদ্ধার করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উদ্ধার হওয়া মরদেহের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ঢাকা অঞ্চলের নদীগুলোতে। ২০২১ সাল থেকে হিসাব করলে এ সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের সংখ্যা বৃদ্ধি মানেই সব ক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ড বেড়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে প্রতিটি ঘটনার কারণ ও প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, ভোরের কাগজের প্রতিবেদনের বরাতে কলামটিতে বলা হয়েছে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে রাজধানীতে চাঁদাবাজির ৭২৩টি অভিযোগ বা মামলা হয়েছে। তদন্ত সম্পন্ন হওয়া অভিযোগগুলোর ৮৫ শতাংশের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব পরিসংখ্যান রাজধানীর অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করে। তবে পুলিশের কাছে আসা অভিযোগই অপরাধের পূর্ণ চিত্র নয়। অনেক ভুক্তভোগী হয়রানি, প্রতিশোধ কিংবা দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার আশঙ্কায় অভিযোগ করেন না। ফলে প্রকৃত অপরাধের পরিমাণ সরকারি পরিসংখ্যানের তুলনায় বেশি হতে পারে।
চাঁদাবাজি ও দখলবাজির মতো অপরাধের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় জমি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা দখলের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় জড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। কারণ, তখন অপরাধের তদন্ত ও বিচার নিয়ে রাজনৈতিক পক্ষপাতের আশঙ্কা তৈরি হয়। আইনের প্রয়োগ যদি সবার ক্ষেত্রে সমান না হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা কমে যেতে পারে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক কার্যালয় ও সভাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত বিরোধও বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। কলামটিতে জাসদের একটি সভা পণ্ড হওয়ার ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। লেখকের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রশাসনিক অনুমতি নিয়ে আয়োজিত ওই সভাকে আওয়ামী লীগের সভা হিসেবে প্রচার করে বাধা দেওয়া হয়েছিল। পরে আটক ব্যক্তিদের অধিকাংশকে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাও প্রশ্ন তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের অভিযোগ এবং ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রচার নিয়ে বিতর্কের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক সভা আয়োজনের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতার বিষয়গুলো সামনে এসেছে।
একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক মত প্রকাশ ও সংগঠিত হওয়ার অধিকার গুরুত্বপূর্ণ। কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড নিয়ে আপত্তি থাকলে তা আইনি ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে মোকাবিলা করা প্রয়োজন। কোনো সভা বা রাজনৈতিক কর্মসূচিকে বাধা দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনগত ভিত্তি, প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে অপমান, হয়রানি কিংবা বেআইনিভাবে আটক করার অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্তও প্রয়োজন।
এ পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে পুলিশ বাহিনী জনবল, মনোবল এবং প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার সংকটের মুখে পড়েছিল বলে বিভিন্ন আলোচনায় উঠে এসেছে। সেই সংকট থেকে বাহিনী কতটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশের সক্রিয়তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করাও অপরিহার্য। কোনো ঘটনা ঘটার পর কেবল কয়েকজন কর্মকর্তার বদলি বা প্রশাসনিক রদবদল দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন কার্যকর তদন্ত, জবাবদিহি এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্বও এ ক্ষেত্রে কম নয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা শুধু পুলিশের একার দায়িত্ব নয়; এর সঙ্গে সরকার, সংসদ, রাজনৈতিক দল এবং প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কার্যকর ভূমিকা জড়িত। রাজনৈতিক নেতারা যদি নিজেদের কর্মী-সমর্থকদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান না নেন, তাহলে অপরাধের সঙ্গে রাজনৈতিক সুরক্ষার সম্পর্ক আরও জটিল হতে পারে। একইভাবে বিরোধী দলগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে সহিংসতার বিরোধিতা, গণতান্ত্রিক চর্চা এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার, সম্পদের ন্যায্য বণ্টন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের প্রত্যাশা নতুন মাত্রা পেয়েছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে মানুষ বুঝতে পেরেছে, শুধু সরকার পরিবর্তন করলেই রাষ্ট্রের কাঠামোগত সমস্যাগুলো দূর হয় না। প্রশাসনের স্বচ্ছতা, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, মানবাধিকার রক্ষা এবং রাজনৈতিক জবাবদিহির মতো বিষয়গুলো নিশ্চিত করা না গেলে পরিবর্তনের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন।
মানবাধিকার কমিশন আইন, গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত আইন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাঠামো এবং সাইবার নিরাপত্তাসংক্রান্ত আইনের মতো বিষয়গুলো নিয়ে বিতর্ক রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নকে সামনে এনেছে। এসব ক্ষেত্রে আইনের ভাষা, প্রয়োগের সীমা এবং নাগরিক অধিকারের সুরক্ষা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন। কোনো আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্য যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, তার অস্পষ্ট ধারা কিংবা অপব্যবহারের সুযোগ নাগরিক স্বাধীনতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই আইন প্রণয়ন ও সংস্কারের ক্ষেত্রে জনমত, বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং সাংবিধানিক অধিকারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাওয়া জরুরি।
রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার প্রভাব শুধু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। একজন ব্যবসায়ী যখন নিজের দোকানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন, একজন শিক্ষক যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহিংসতার আশঙ্কা করেন, কিংবা একজন অভিভাবক যখন সন্তানের নিরাপদ চলাচল নিয়ে চিন্তিত থাকেন, তখন রাজনৈতিক সংকট ব্যক্তিগত জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। অনিশ্চয়তা মানুষের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, সামাজিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকেও প্রভাবিত করে।
এই পরিস্থিতিতে মানুষের মধ্যে এক ধরনের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় যে সম্মিলিত প্রত্যাশা ও ঐক্যের অনুভূতি তৈরি হয়েছিল, তা দুর্বল হয়ে পড়লে মানুষ ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও জীবনযাপনের মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ করে ফেলতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ, নাগরিক উদ্যোগ এবং সম্মিলিতভাবে সমস্যা সমাধানের আগ্রহ কমে গেলে সমাজের গণতান্ত্রিক শক্তিও দুর্বল হয়। একটি দেশের অগ্রগতির জন্য শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, মানুষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার পরিবেশও জরুরি।
জননিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিল্প ও পরিবহন খাতে তদারকি। গত ২০ সেপ্টেম্বর আশুলিয়ায় সিলিন্ডারভর্তি একটি লরিতে বিস্ফোরণে আটজনের মৃত্যুর ঘটনা এ ক্ষেত্রে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। কলামটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বিস্ফোরিত কিছু সিলিন্ডারে ২০২১ সালের পর ব্যবহার না করার সতর্কবার্তা লেখা ছিল। মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার পরিবহন এবং বিধিবহির্ভূত ব্যবস্থাপনার অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট তদারকি সংস্থাগুলোর দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নিয়মিত পরিদর্শন, নিরাপত্তা মান নিশ্চিত করা এবং নিয়ম লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
দুর্ঘটনার পর দায়ীদের শনাক্ত করা ও বিচার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ঘটনার পর মামলা হলেও তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা কিংবা দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ জনমনে অসন্তোষ তৈরি করতে পারে। নিরাপত্তাবিধি লঙ্ঘনের কারণে মানুষের প্রাণহানি ঘটলে সেটিকে নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করে দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। কারণ, প্রতিটি প্রাণহানির পেছনে একটি পরিবার, জীবিকা এবং ভবিষ্যতের গল্প থাকে।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো, অতীতের রাজনৈতিক চর্চা থেকে শিক্ষা নেওয়া হচ্ছে কি না। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন নেতৃত্বের সামনে পুরোনো পদ্ধতি পরিহার করে নতুন প্রতিষ্ঠান ও কার্যকর শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি, ক্ষমতার ব্যবহার এবং প্রশাসনিক আচরণে মৌলিক পরিবর্তন না এলে পুরোনো সংকট নতুন রূপে ফিরে আসতে পারে। এ কারণে শুধু রাজনৈতিক স্লোগান কিংবা ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, প্রয়োজন বাস্তব সংস্কার এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
একটি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গণমাধ্যমের দায়িত্ব হলো যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতে অনিয়ম ও অপরাধ তুলে ধরা। নাগরিক সমাজকে অধিকার, জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে সক্রিয় থাকতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধকে সহিংসতায় রূপ না দিয়ে আলোচনা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধানের সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের মানুষ বারবার নতুন স্বপ্ন দেখেছে। প্রতিটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তারা প্রত্যাশা করেছে, এবার হয়তো রাষ্ট্র আরও মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও নিরাপদ হবে। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ না হলে মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার যেমন মানুষের জীবনকে বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারে, তেমনি পুরোনো রাজনৈতিক পদ্ধতি ও জবাবদিহিহীন ক্ষমতার চর্চাও রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই বর্তমান সংকটের সমাধান শুধু তাৎক্ষণিক আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রয়োজন রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন, প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর সংস্কার এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার বাস্তব উদ্যোগ।
বাংলাদেশের সামনে এখন গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রত্যাশাকে কার্যকর রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পরিবর্তনে রূপ দেওয়া। মানুষ যেন ভয় ছাড়াই মত প্রকাশ করতে পারে, নিরাপদে চলাচল করতে পারে, ন্যায়বিচার পায় এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করতে পারে—সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম লক্ষ্য। অতীতের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্থিতিশীল দেশ গড়তে হলে রাজনীতিকে সময়ের বাস্তবতা ও মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। অন্যথায় রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটলেও মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।
আপনার মতামত জানানঃ