যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানে ব্যাপক সামরিক হামলা শুরু করেছিল, তখন ধারণা ছিল, আধুনিক যুদ্ধক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের জোরে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তেহরানের সামরিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকে ভেঙে দেওয়া সম্ভব হবে। যুদ্ধের প্রথম ২৪ ঘণ্টাতেই প্রায় এক হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়। এরপর ৩৭ দিনে আরও প্রায় ১২ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়। ইরানের সামরিক অবকাঠামোর বড় একটি অংশ ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) প্রধান নিহত হন।
কিন্তু যুদ্ধ যত গড়িয়েছে, বাস্তবতা ততই ভিন্ন চিত্র সামনে এনেছে। ছয় মাসেরও বেশি সময় পরও ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়েনি। বরং শীর্ষ পর্যায়ে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি সামলেও দেশটি দ্রুত নেতৃত্বের শূন্যস্থান পূরণ করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক অংশীদারদের বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে গেছে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সামরিক চাপ তৈরি করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। ফলে যুদ্ধটি শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার সংঘাত হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি আধুনিক যুদ্ধের প্রকৃতি নিয়েই নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে একটি ধারণা—‘প্রিসাইজ মাস’। সহজ ভাষায়, তুলনামূলক কম খরচে তৈরি করা বিপুলসংখ্যক নির্ভুল ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র একসঙ্গে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে চাপে ফেলা। প্রচলিত সামরিক ধারণায় উন্নত প্রযুক্তির অল্পসংখ্যক অত্যন্ত ব্যয়বহুল অস্ত্রকে যুদ্ধের মূল শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু ইরানের যুদ্ধকৌশল দেখিয়েছে, একই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিপুলসংখ্যক তুলনামূলক সস্তা অস্ত্র ব্যবহার করা হলে প্রতিপক্ষকে অন্য ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়।
আধুনিক সামরিক শক্তির বড় অংশ এখন অত্যন্ত ব্যয়বহুল যুদ্ধবিমান, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অন্যান্য উচ্চপ্রযুক্তির প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল। এসব অস্ত্র তৈরি করতে বিপুল অর্থ, সময় ও অবকাঠামোর প্রয়োজন হয়। এগুলো পরিচালনার জন্যও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ও জটিল সামরিক কাঠামো দরকার। ফলে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী হয়তো অল্পসংখ্যক অত্যন্ত কার্যকর অস্ত্র দিয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্য ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে হাজার হাজার তুলনামূলক সস্তা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের আক্রমণ ঠেকাতে গেলে হিসাবটি বদলে যায়।
এখানেই আক্রমণ ও প্রতিরক্ষার ব্যয়ের ব্যবধান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি আক্রমণকারী ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্রের দাম তুলনামূলক কম হতে পারে, কিন্তু সেটিকে আকাশে ধ্বংস করার জন্য ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টর অনেক বেশি ব্যয়বহুল। অর্থাৎ আক্রমণকারী পক্ষ একটি সস্তা অস্ত্র ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে অনেক বেশি দামের প্রতিরোধক অস্ত্র ব্যবহার করতে বাধ্য করতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে এমন পরিস্থিতি চললে প্রতিরক্ষাকারী দেশের অস্ত্রভান্ডারের ওপর বড় চাপ তৈরি হয়।
ইরানের দীর্ঘদিনের সামরিক প্রস্তুতি এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। উন্নত পশ্চিমা সামরিক প্রযুক্তি কেনার ক্ষেত্রে নানা নিষেধাজ্ঞা ও সীমাবদ্ধতার কারণে তেহরান প্রচলিত অর্থে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সঙ্গে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় যেতে পারেনি। পরিবর্তে তারা তুলনামূলক কম খরচে তৈরি করা দীর্ঘপাল্লার ড্রোন এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে। বছরের পর বছর ধরে এসব অস্ত্রের উৎপাদন, সংরক্ষণ ও ব্যবহারের জন্য দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে।
এর ফলে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিমান হামলা চালানো গেলেও দেশটির সামরিক সক্ষমতার সব উৎস একসঙ্গে ধ্বংস করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ভূগর্ভস্থ ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো এবং উৎপাদনকেন্দ্রগুলোকে সম্পূর্ণভাবে নিষ্ক্রিয় করা সহজ নয়। প্রচলিত বিমান হামলার কৌশলে একটি দেশের প্রধান সামরিক ঘাঁটি, অস্ত্রাগার ও কমান্ড সেন্টার ধ্বংস করে তার যুদ্ধক্ষমতা কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সামরিক অবকাঠামো যদি বিস্তৃত, বিকেন্দ্রীভূত এবং ভূগর্ভস্থ হয়, তাহলে সেই কৌশলের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।
ইরানের অভিজ্ঞতা এ কারণেই ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতার সঙ্গেও মিল খুঁজে দেয়। ইউক্রেন যুদ্ধ ইতিমধ্যে দেখিয়েছে, তুলনামূলক কম খরচে তৈরি ড্রোন কীভাবে বড় ও ব্যয়বহুল সামরিক প্ল্যাটফর্মকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। এখন ইরানের যুদ্ধ সেই বাস্তবতাকে আরও বড় পরিসরে সামনে নিয়ে এসেছে। আধুনিক যুদ্ধে শুধু একটি দেশের কাছে কত উন্নত অস্ত্র রয়েছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়; একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে সেই দেশ কত দ্রুত এবং কত বিপুল পরিমাণ অস্ত্র তৈরি ও ব্যবহার করতে পারে।
এখানে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অস্ত্রভান্ডারের অর্থনীতি। ইরানের সস্তা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রকে অত্যন্ত মূল্যবান ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করতে হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইরানের হামলা প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্র তার মজুত প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের প্রায় ৬৫ শতাংশ এবং থাড ইন্টারসেপ্টরের প্রায় ৩৫ শতাংশ ব্যবহার করেছে। এই হিসাব যদি দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের প্রেক্ষাপটে দেখা হয়, তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়—একটি দেশ কতদিন এমন ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে তুলনামূলক কম খরচের আক্রমণ ঠেকাতে পারবে?
এটি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সমস্যা নয়। বিশ্বের অনেক সামরিক বাহিনী একই ধরনের বাস্তবতার মুখোমুখি হতে পারে। একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে যে অস্ত্র ব্যবহার করা হয়, সেটির মূল্য যদি আক্রমণকারী ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি হয়, তাহলে বিপুলসংখ্যক আক্রমণের ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অর্থনৈতিকভাবে চাপের মুখে পড়বে। তাই ভবিষ্যতের যুদ্ধ শুধু কে বেশি শক্তিশালী অস্ত্র তৈরি করতে পারে, সেই প্রতিযোগিতা হবে না; কে কম খরচে বেশি অস্ত্র তৈরি করতে পারে এবং কে সস্তা আক্রমণ প্রতিহত করার সাশ্রয়ী ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভূমিকাও যুক্ত হচ্ছে। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য লক্ষ্য শনাক্ত করা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করার ক্ষেত্রে এআই ইতিমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো উন্নত ডেটা আর্কিটেকচার ও এআই-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত সহায়ক ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত সামরিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছে। তবে এর সঙ্গে ঝুঁকিও রয়েছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি যত বাড়বে, ভুল তথ্য বা ভুল বিশ্লেষণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার সম্ভাবনাও তত বাড়তে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রযুক্তি কেবল বিশ্বের ধনী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ওপেন-সোর্স এআই মডেল এবং তুলনামূলক সস্তা কম্পিউটিং অবকাঠামোর বিস্তারের ফলে বিভিন্ন দেশ নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত-সহায়ক প্রযুক্তি তৈরি করতে পারবে। ফলে সামরিক প্রযুক্তির কিছু ক্ষেত্রে শক্তিশালী ও অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্রের মধ্যে ব্যবধান আরও কমে আসতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে অত্যাধুনিক অস্ত্রের গুরুত্ব শেষ হয়ে যাচ্ছে। বরং ইরানের যুদ্ধ দেখিয়েছে, উচ্চপ্রযুক্তির অস্ত্র এবং বিপুলসংখ্যক সস্তা অস্ত্র—দুটিরই আলাদা ভূমিকা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ও গোয়েন্দা সক্ষমতা এখনো অত্যন্ত কার্যকর। একটি অত্যাধুনিক অস্ত্র একক আঘাতে যে ধরনের নির্ভুলতা ও ধ্বংসক্ষমতা দিতে পারে, সস্তা ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র সবসময় তা পারে না। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে বিপুলসংখ্যক সস্তা অস্ত্রের ধারাবাহিক ব্যবহার ব্যয়বহুল অস্ত্রনির্ভর বাহিনীর জন্য আলাদা চাপ তৈরি করে।
এই বাস্তবতা সামরিক পরিকল্পনার পুরোনো ধারণাগুলোকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের বড় সামরিক শক্তিগুলো অল্পসংখ্যক অত্যন্ত উন্নত অস্ত্রের ওপর নির্ভর করে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছে। কিন্তু এসব অস্ত্রের উৎপাদন ধীর এবং ব্যয়বহুল হওয়ায় বড় ধরনের যুদ্ধের সময় দ্রুত অস্ত্রের মজুত পূরণ করা কঠিন হতে পারে। বিপরীতে, তুলনামূলক কম প্রযুক্তিনির্ভর কিন্তু ব্যাপকভাবে উৎপাদনযোগ্য অস্ত্র দ্রুত মাঠে নামানো সম্ভব।
ফলে ভবিষ্যতের সামরিক শক্তির সংজ্ঞা হয়তো বদলে যাবে। শুধু একটি দেশের যুদ্ধবিমান কত উন্নত, তার ক্ষেপণাস্ত্র কত নিখুঁত কিংবা তার নৌবহর কত শক্তিশালী—এসবের পাশাপাশি হিসাব করতে হবে, সেই দেশ কত দ্রুত অস্ত্রের মজুত পুনর্গঠন করতে পারে, কত কম খরচে আক্রমণ প্রতিহত করতে পারে এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে তার শিল্প ও সরবরাহব্যবস্থা কতটা টিকে থাকতে পারে।
ইরানের যুদ্ধ তাই সামরিক প্রযুক্তির একটি বৃহত্তর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তুলনামূলক দুর্বল কোনো দেশ এখন আর কেবল উন্নত প্রযুক্তির অভাবের কারণে বড় শক্তির সামনে সম্পূর্ণ অসহায় থাকবে—এমন ধারণা আগের মতো কার্যকর নয়। সস্তা ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, বিকেন্দ্রীভূত অবকাঠামো এবং দ্রুত উৎপাদনক্ষমতা একটি রাষ্ট্রকে দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সুযোগ দিতে পারে।
বিশ্বের সামরিক শক্তিগুলো এখন সেই বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। ভবিষ্যতের যুদ্ধ হয়তো একদিকে অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা হবে, অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক সস্তা অস্ত্রের উৎপাদন ও ব্যবহারের প্রতিযোগিতাও হবে। অর্থাৎ যুদ্ধের মাঠে ‘সেরা অস্ত্র’ থাকা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার পাশাপাশি ‘যথেষ্ট অস্ত্র’ থাকা এবং সেগুলো দ্রুত পুনরায় উৎপাদন করার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ইরানের অভিজ্ঞতা শেষ পর্যন্ত যে বার্তাটি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে তা হলো—আধুনিক যুদ্ধে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব একাই যথেষ্ট নয়। একটি রাষ্ট্রের সামরিক শক্তি এখন তার অস্ত্রের মান, সংখ্যা, উৎপাদনক্ষমতা, সরবরাহব্যবস্থা, গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং প্রতিরক্ষার ব্যয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ‘প্রিসাইজ মাস’ সেই পরিবর্তনেরই একটি প্রতীক। আগামী দিনের যুদ্ধক্ষেত্রে অল্পসংখ্যক অত্যাধুনিক অস্ত্রের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক সস্তা কিন্তু নির্ভুল অস্ত্রের উপস্থিতি সামরিক ভারসাম্যকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ