রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় হঠাৎ কয়েক সেকেন্ডের জন্য দৃশ্যপটে আসে একদল মানুষ। হাতে রাজনৈতিক ব্যানার, মুখে স্লোগান। মুহূর্তের মধ্যেই বিস্ফোরণের শব্দ, মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ, এরপর যে যেদিকে পারে ছুটে গলির ভেতর মিলিয়ে যায়। পুরো ঘটনাটি শেষ হতে সময় লাগে এক মিনিটও নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে এমন ঘটনাগুলো এখন নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। মানবজমিনের এক প্রতিবেদনে গোয়েন্দা ও পুলিশ সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়েছে, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মী রাজধানীতে এমন ঝটিকা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে।
প্রতিবেদনটিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে ‘৩০ সেকেন্ডের মিশন’ নামে বর্ণিত একটি কৌশল। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি অনুযায়ী, একটি ঝটিকা মিছিলের পুরো কার্যক্রমকে কয়েকটি ছোট ধাপে ভাগ করা হচ্ছে। প্রথম কয়েক সেকেন্ডে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় লোকজন জড়ো হয়। এরপর স্লোগান দিয়ে দ্রুত ভিডিও ধারণ করা হয়। সবশেষে ব্যানার সরিয়ে বিভিন্ন গলি দিয়ে ছড়িয়ে পড়া হয়। ফলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাধারণ মানুষ কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি বুঝে ওঠার আগেই অংশগ্রহণকারীদের অনেকে সরে যেতে সক্ষম হয়।
প্রতিবেদনে এমন একটি ঘটনার উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে। শনিবার দুপুরে ধানমণ্ডি ২৭ নম্বর এলাকায় একটি রাজনৈতিক ব্যানার নিয়ে অর্ধশতাধিক মানুষের জড়ো হওয়ার কথা বলা হয়েছে। সেখানে অল্প সময়ের মধ্যে স্লোগান ও দুটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এরপর অংশগ্রহণকারীরা দ্রুত সরে যায়। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে কয়েকজনকে আটক করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু রাজনৈতিক মিছিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই বলে দাবি করা হয়েছে। গত এক সপ্তাহে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ, বাসে আগুন এবং ট্রেনে আগুন দেওয়ার চেষ্টার কথা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সুপ্রিম কোর্টের ফটক, শিল্পকলা একাডেমি, যাত্রাবাড়ী, মালিবাগ, আগারগাঁও, মহাখালী, নিউমার্কেট, বাবুবাজার, কমলাপুর, মগবাজার, মৎস্য ভবন, রামপুরা, কাফরুল, মিরপুর-১১, মধ্য বাড্ডা ও পল্লবীসহ বিভিন্ন এলাকার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, এসব ঘটনায় ৩২টি ককটেল বিস্ফোরণ এবং নয়টি বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। কমলাপুরে ট্রেনে আগুন দেওয়ার চেষ্টার কথাও বলা হয়েছে।
এসব ঘটনার পেছনে সাংগঠনিক কাঠামো কীভাবে কাজ করছে, তা নিয়েও প্রতিবেদনে গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে বেশ কিছু দাবি করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় সংশ্লিষ্টদের কার্যক্রম কয়েকটি স্তরে পরিচালিত হচ্ছে। প্রথম স্তরে মেস, ছাত্রাবাস ও ব্যাচেলর বাসায় অবস্থানকারী কর্মীদের কথা বলা হয়েছে। তাদের কেউ শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রত্যাশী বা ছোটখাটো চাকরিজীবীর পরিচয়ে অবস্থান করছে বলে গোয়েন্দাদের দাবি। মাঠপর্যায়ে লোক জড়ো করা, বিভিন্ন স্থানে উপস্থিত হওয়া এবং ঝটিকা কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার মতো কাজ তাদের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে ভাড়া করা বাসা বা ফ্ল্যাট। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মাঝারি সারির রাজনৈতিক নেতা, সাবেক কাউন্সিলর এবং বিভিন্ন পর্যায়ের সাবেক নেতারা এসব বাসা ব্যবহার করে কর্মকাণ্ড সমন্বয় করছেন। কোথায় মিছিল হবে, কারা সেখানে যাবে, কে ভিডিও করবে কিংবা কীভাবে দ্রুত সরে যাওয়া হবে—এ ধরনের পরিকল্পনা সেখানে করা হয় বলে গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে।
আরও একটি স্তরের কথা বলা হয়েছে, যেখানে অর্থদাতা ও সমন্বয়কারীদের অবস্থানের দাবি করা হয়েছে। রাজধানীর কিছু আবাসিক হোটেল, ফার্নিশড অ্যাপার্টমেন্ট ও অভিজাত এলাকার ফ্ল্যাট ব্যবহারের কথাও প্রতিবেদনে এসেছে। গোয়েন্দাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ঘন ঘন অবস্থান পরিবর্তন করায় তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এই নেটওয়ার্কে ডিজিটাল যোগাযোগের বিষয়টিও প্রতিবেদনে বিশেষভাবে এসেছে। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি অনুযায়ী, টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের গোপন গ্রুপ ব্যবহার করে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কাছে নির্দেশনা পৌঁছানো হচ্ছে। কোনো ঘটনার ভিডিও ধারণের পর সেটি নির্দিষ্ট গ্রুপে পাঠানোর ব্যবস্থাও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ভিডিও পাঠানোর বিনিময়ে অর্থ দেওয়ার দাবিও করা হয়েছে। তবে এসব তথ্য মূলত পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রের বক্তব্য হিসেবে প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে; স্বাধীনভাবে এসব দাবির সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অর্থের প্রবাহ নিয়েও প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। পুলিশের হাতে আটক একজনের জবানবন্দির বরাতে বলা হয়েছে, ককটেল বিস্ফোরণের ভিডিও বিদেশে থাকা একটি টেলিগ্রাম গ্রুপে পাঠানোর বিনিময়ে কয়েক হাজার টাকা দেওয়া হতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর পরিমাণ আরও বেশি হওয়ার দাবিও রয়েছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাতে কয়েক ডজন ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন খাতের ব্যক্তির অর্থায়নের অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
ঘটনাগুলোর সঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত রাজনৈতিক নেতাদের যোগাযোগের অভিযোগও এসেছে প্রতিবেদনে। কয়েকজন গ্রেপ্তার ব্যক্তির বক্তব্যের বরাতে বিদেশি নম্বর থেকে নির্দেশ পাওয়ার দাবি করা হয়েছে। একইভাবে বিদেশে অবস্থানরত কয়েকজন সাবেক নেতার সঙ্গে দেশের কর্মীদের যোগাযোগের অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, বিভিন্ন মেসেজিং ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সক্রিয় রাখার চেষ্টা চলছে।
তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—গ্রেপ্তার ব্যক্তির জবানবন্দি বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গোয়েন্দা তথ্য কোনো অভিযোগের চূড়ান্ত বিচারিক প্রমাণ নয়। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হতে আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া প্রয়োজন। ফলে রাজনৈতিক পরিচয় বা কোনো সংগঠনের সঙ্গে অতীতের সম্পৃক্ততার ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার আগে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি।
রাজধানীতে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে। কারণ দ্রুত সংঘটিত এসব কর্মকাণ্ডে ঘটনাস্থলে পুলিশ পৌঁছানোর আগেই অংশগ্রহণকারীরা সরে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ে ঘন ঘন বদলির কারণে স্থানীয় পর্যায়ের তথ্যভাণ্ডার ও সোর্স নেটওয়ার্কে দুর্বলতা তৈরি হয়েছে—এমন মতও সংশ্লিষ্টদের উদ্ধৃত করে তুলে ধরা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে পরিবর্তন আনার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে অপরাধ বিভাগ ও গোয়েন্দা বিভাগে কর্মকর্তাদের রদবদলের বিষয়টি সামনে এসেছে। নতুন কর্মকর্তাদের স্থানীয় অপরাধী ও রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে সময় প্রয়োজন হওয়ায় তাৎক্ষণিক গোয়েন্দা সক্ষমতায় প্রভাব পড়তে পারে বলেও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে বসে নেই, সেটিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। গত এক সপ্তাহে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কয়েক শতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তারের কথা বলা হয়েছে। বিভিন্ন ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে অভিযান চালানো হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রের দাবি। তবে গ্রেপ্তার মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়—মামলা, তদন্ত এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হওয়ার কথা।
রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে সহিংসতার যোগসূত্র তৈরি হলে এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। রাস্তার পাশে হঠাৎ বিস্ফোরণ, গণপরিবহনে আগুন, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার আশপাশে আতঙ্ক—এসব ঘটনা মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ও নিরাপত্তাবোধকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং সহিংস কর্মকাণ্ডের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক মতপ্রকাশ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হলেও বিস্ফোরক ব্যবহার, অগ্নিসংযোগ বা জননিরাপত্তা বিপন্ন করার মতো কর্মকাণ্ড আলাদা আইনি প্রশ্ন তৈরি করে।
‘৩০ সেকেন্ডের মিশন’ তাই শুধু একটি ঝটিকা রাজনৈতিক কর্মসূচির বর্ণনা নয়; এটি দ্রুত সংগঠিত হয়ে দ্রুত সরে যাওয়ার এমন একটি পদ্ধতির ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রচলিত নজরদারি ব্যবস্থার জন্য কঠিন হতে পারে। তবে এর প্রকৃত বিস্তার, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং ঘটনাগুলোর পেছনে কোনো সমন্বিত নেটওয়ার্ক আদৌ রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে তদন্ত ও আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণের ওপর।
রাজধানীর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো একই সঙ্গে আরেকটি বাস্তবতা সামনে আনছে। রাজনৈতিক উত্তেজনা যত বাড়বে, গুজব ও অসমর্থিত তথ্য ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও তত বাড়বে। একটি বিস্ফোরণ বা কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে বড় রাজনৈতিক দাবির ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। তাই কোনো ভিডিও, গ্রেপ্তার, গোয়েন্দা তথ্য কিংবা রাজনৈতিক অভিযোগ প্রকাশের ক্ষেত্রে উৎস যাচাই এবং প্রেক্ষাপট বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে, রাজধানীতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু পুলিশের নয়; রাজনৈতিক দল, কর্মী, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষেরও দায়িত্ব রয়েছে সহিংসতা প্রত্যাখ্যান করা এবং গুজব না ছড়ানো। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব হবে নিরপেক্ষভাবে তথ্য সংগ্রহ, অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া। একই সঙ্গে নিরপরাধ কাউকে হয়রানি না করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অল্প সময়ের একটি সহিংস ঘটনা যেমন বড় ধরনের আতঙ্ক তৈরি করতে পারে, তেমনি যাচাইহীন অভিযোগও দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ও রাজনৈতিক অবিশ্বাস বাড়াতে পারে। রাজধানীর বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই দ্রুত প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন নির্ভুল গোয়েন্দা তথ্য, স্বচ্ছ তদন্ত এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ।
আপনার মতামত জানানঃ